Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • জুন ২২, ২০২৬

জনপ্রিয়তার ধস, দলীয় চাপ! ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা কিয়ের স্টার্মারের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
জনপ্রিয়তার ধস, দলীয় চাপ! ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা কিয়ের স্টার্মারের

দুবছরেরও কম সময় আগে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন তিনি। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেনদীর্ঘ ১৪ বছরের ‘গোঁড়া’ শাসনের অবসান ঘটিয়ে অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনবেনজনপরিষেবা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করবেনক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের বোঝা থেকে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেবেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর একের পর এক রাজনৈতিক বিতর্কনীতিগত অবস্থান বদলজনপ্রিয়তার ক্রমাগত পতনের ফলে দলের অন্তরেই চাপে পড়েছিলেন ক্রমাগত। শেষ পর্যন্ত সব জল্পনাকে সত্যি করে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টার্মার সোমবার ইস্তফার ঘোষণা করলেন। প্রধানমন্ত্রীর পদের পাশাপাশি লেবার পার্টির নেতৃত্বও ছেড়ে দিলেন তিনি। ফলে এক দশকের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পেতে চলেছে ব্রিটেন।

সোমবার সকালে লন্ডনের ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান স্টার্মারএদিন তাঁর পাশে ছিলেন স্ত্রী ভিক্টোরিয়া। বক্তব্য রাখতে গিয়ে একাধিক বার আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তিনি। পরে বক্তব্য শেষ করে স্ত্রীকে আলিঙ্গন করে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে ফিরে যান। ৬৩ বছর বয়সি স্টার্মার জানানতিনি ইতিমধ্যেই ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লসকে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। সোমবার সকালে ফোনে রাজাকে ইস্তফার বিষয়টি জানান তিনি।

দলীয় সহকর্মীদের অসন্তোষের কথাও অকপটে স্বীকার করে নেন স্টার্মার। তিনি জানান, ‘আমার দল এখন প্রশ্ন করছেআগামী সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টিকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমি সঠিক অবস্থানে রয়েছি কি না। এ প্রশ্নে আমার পার্লামেন্টারি পার্টির উত্তর আমি শুনেছি এবং তা সসম্মানে মেনে নিয়েছি। আমি যে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিতা আমার প্রিয় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যদেশের স্বার্থকে সবার আগে রাখার জন্য। সে কারণেই আমি লেবার পার্টির নেতার পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি।’ তিনি আরও জানানজুলাই মাসেই লেবার পার্টির নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। আগামী ৯ জুলাই থেকে মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং ১৬ জুলাই পর্যন্ত মনোনয়ন জমা দেওয়া যাবে। দলের লক্ষ্যসেপ্টেম্বরে সংসদের পরবর্তী অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই নতুন নেতা নির্বাচিত করা। নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে বহাল থাকবেন।

যদিও রাজনৈতিক মহলে জল্পনা ছিলনেতৃত্বের প্রতিযোগিতা হলে স্টার্মার নিজেই লড়াইয়ে নামতে পারেন। অতীতে তিনি জানিয়েছিলেনকোনো পরিস্থিতিতেই তিনি সরে দাঁড়াবেন না। তবে সোমবারের ঘোষণায় স্পষ্ট করে দেনদলের সিদ্ধান্তকেই তিনি প্রাধান্য দিচ্ছেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঋষি সুনকের নেতৃত্বাধীন কনজারভেটিভ পার্টিকে বিপুল ব্যবধানে হারিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল লেবার পার্টি। দীর্ঘ ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন স্টার্মার। সেসময় তাঁকে ঘিরে ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর থেকে একের পর এক সমস্যার মুখে পড়ে তাঁর সরকার। প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে ব্যর্থতাজীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির লাগাম টানতে না পারাজনপরিষেবা ব্যবস্থার উন্নয়নে ধীরগতি এবং অভিবাসন নীতি নিয়ে জনঅসন্তোষ— সব মিলিয়ে ক্রমশ কমতে থাকে তাঁর জনপ্রিয়তা।

এর পাশাপাশিসরকারের একাধিক নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন  রাজনৈতিক বিতর্কও তাঁর ভাবমূর্তিকে ধাক্কা দেয়। বিশেষ করেজেফ্রি এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত বিতর্কিত রাজনীতিক পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়তে হয় তাঁকে। লেবার পার্টি সূত্রে জানা গিয়েছেগত কয়েক মাস ধরে স্টার্মারের নেতৃত্ব নিয়ে দলের অন্দরে ক্ষোভ বাড়ছিল। আগামী নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে ঝুঁকি নিতে চাইছিলেন না দলের বহু সাংসদ। সপ্তাহান্তে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তাভাবনা করতেই ছুটিতে গিয়েছিলেন স্টার্মার। ছুটি কাটিয়ে ফিরে সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসেই ইস্তফার ঘোষণা করলেন তিনি।

প্রশ্ন উঠছে এর পর ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর কুরসিতে কে বসতে চলেছেন? গত সপ্তাহে মেকারফিল্ডের উপনির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর থেকেই গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে স্টারমারের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিং অব দ্য নর্থ’ নামে পরিচিত বার্নহ্যাম সোমবার সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিতে পারেন। তবে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লেবার পার্টির নেতৃত্ব পাবেন কি নাতা এখনো স্পষ্ট নয়। গত মাসে স্টার্মারের নেতৃত্বের প্রতিবাদে স্বাস্থ্যসচিবের পদ ছেড়ে দেওয়া ওয়েস স্ট্রিটিংও নেতৃত্বের দৌড়ে নামার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

এদিকেস্টারমারের ইস্তফা নিয়ে জল্পনা এতটাই তীব্র হয়েছিল যেরবিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেনব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করতে চলেছেন। যদিও ব্রিটিশ সরকারের এক আধিকারিক জানিয়েছেনএ বিষয়ে ট্রাম্পকে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি ট্রাম্পের সঙ্গে স্টার্মারের এ নিয়ে কোনো কথাও হয়নি।

স্টারমারের পদত্যাগের প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লাইয়েন তাঁর নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন। সামাজিক মাধ্যমমে তিনি লিখেছেন, ‘অনেক নেতার রাষ্ট্রনায়ক হয়ে উঠতে বহু বছর সময় লাগে। আপনি মাত্র দুবছরেই সেই উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছেন। ইউরোপ ও ইউক্রেনের নিরাপত্তা আপনার জন্য আরও শক্তিশালী হয়েছে।’ এদিকে, স্টারমারের বিদায়ে ব্রিটিশ রাজনীতিতে ফের অনিশ্চয়তার আবহ তৈরি হয়েছে। আগামী ২৩ জুন ব্রিটেনে  ব্রেক্সিট’  গণভোটের দশম বর্ষপূর্তি পালিত হতে চলেছে। এমন এক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী পদে ইস্তফা দিলেও এখনই সরকার বদলাচ্ছে না ব্রিটেনে। সে দেশের সাংবিধানিক প্রথা অনুযায়ীজনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসা লেবার পার্টিই তাদের নতুন নেতা নির্বাচন করবে। নির্বাচিত সে নেতাই দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্টার্মারই অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব সামলাবেন।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!