Advertisement
  • দে । শ
  • জুন ২২, ২০২৬

তামিলনাড়ুতে অ্যামোনিয়া বিপর্যয় : মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫, হাসপাতালে ভর্তি ৬৭ পরিযায়ী শ্রমিক, ঘটনার তদন্তে ৩ সদস্যের কমিটি

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
তামিলনাড়ুতে অ্যামোনিয়া বিপর্যয় : মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫, হাসপাতালে ভর্তি ৬৭ পরিযায়ী শ্রমিক, ঘটনার তদন্তে ৩ সদস্যের কমিটি

তামিলনাড়ুর তিরুভাল্লুর জেলায় সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় অ্যামোনিয়া গ্যাস লিকের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে পাঁচে পৌঁছল। রবিবার রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত আরও তিন জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন অন্তত ৬৭ জন। তাঁদের মধ্যে ৩১ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা হয়েছে। মৃত ও অসুস্থদের অধিকাংশই পরিযায়ী শ্রমিক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ওড়িশাঝাড়খণ্ডঅসম এবং পশ্চিমবঙ্গের বহু তরুণ-তরুণী।

সোমবার তামিলনাড়ুর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দফতরের প্রকাশিত মেডিক্যাল বুলেটিনে জানানো হয়েছেগ্যাস লিকের ঘটনায় মোট ৭৪ জন শ্রমিক আক্রান্ত হয়েছেন। রবিবার দুজনের মৃত্যু হয়েছিল। সোমবার সকাল ৭টা পর্যন্ত আরও তিন জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। ফলে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ। পেরিয়াপালায়মের কাছে কান্নিগাইপাইর-মানজাঙ্গারানাই এলাকায় অবস্থিত সেন্ট পিটার অ্যান্ড পল সি ফুডস এক্সপোর্টস নামে সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও রফতানি ইউনিটে রবিবার সকাল ১১টা নাগাদ এই দুর্ঘটনা ঘটে। প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছেকারখানার অ্যামোনিয়া প্ল্যান্ট থেকে বিষাক্ত গ্যাস বেরিয়ে দ্রুত আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। কারখানার মাত্র ৫০ মিটার দূরে থাকা শ্রমিক আবাসনেও পৌঁছে যায় প্রাণঘাতী গ্যাস।

দুর্ঘটনার সময় অধিকাংশ শ্রমিকই নিজদের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। আক্রান্তদের বেশির ভাগই ১৯ থেকে ২০ বছর বয়সি তরুণী। তাঁরা ওড়িশাঝাড়খণ্ডঅসমবিহার এবং পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে কাজের সন্ধানে তামিলনাড়ুতে এসেছিলেন। স্বাস্থ্য দফতরের বুলেটিন অনুযায়ীবর্তমানে চিকিৎসাধীন ৬৭ জনের মধ্যে ১৮ জন ভর্তি রয়েছেন ভেঙ্কটেশ্বর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে২৯ জন ভেলস মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে১০ জন সরকারি স্ট্যানলি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আরও ১০ জন রাজীব গান্ধী সরকারি সাধারণ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকদের পরামর্শে, আক্রান্তদের মধ্যে ৩১ জনকে  ভেন্টিলেটর সাপোর্ট’-এ রাখা হয়েছে। ১ জন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে অক্সিজেন সাপোর্ট’-এ রয়েছেন। বাকি ২৪ জনের শারীরিক অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য দফতর।

আক্রান্ত শ্রমিকদের মধ্যে শ্বাসকষ্টচোখে জ্বালাপোড়াশ্বাসনালিতে অস্বস্তিকাশিবুকে ব্যথা এবং বিভিন্ন মাত্রার শ্বাসজনিত জটিলতার উপসর্গ দেখা গিয়েছে। চিকিৎসকদের মতেঅ্যামোনিয়া গ্যাস শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করায় এই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। তামিলনাড়ুর স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে জি অরুণরাজ জানিয়েছেনবিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক রিপোর্টে কারখানার বাতাসে অ্যামোনিয়ার মাত্রা প্রায় ৩০০ পিপিএম পাওয়া গিয়েছে। এ মাত্রা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দুর্ঘটনার পরপরই জরুরি চিকিৎসক দলঅ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবাপুলিশদমকলউদ্ধারকারী বাহিনীজনস্বাস্থ্য আধিকারিক  জেলা প্রশাসনের কর্মীদের ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়। দ্রুত আক্রান্ত শ্রমিকদের উদ্ধার করে নিকটবর্তী সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

উদ্ধারকাজে নামানো হয় জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীরকে। আরাক্কোনমে অবস্থিত সদর দফতর থেকে বিশেষ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এনডিআরএফ জানিয়েছেকারখানা থেকে নির্গত গ্যাস শ্রমিকদের আবাসন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় বহু শ্রমিক শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন। কারখানার প্রায় ১৩০ জন শ্রমিকযাঁরা গ্যাস লিকের ঘটনায় প্রভাবিত হননিতাঁদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কান্নিগাইপাইরের গোবিন্দ ভবনম ম্যারেজ হলে তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রশাসনের তরফে সেখানে খাবার এবং পানীয় জলের বন্দোবস্ত করা হয়েছে।  মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৫ এবং ১২৫(ক) ধারায় মামলা দায়ের করেছে। কারখানার মালিক মোহন এবং জোসেফকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গ্যাস লিকের প্রকৃত কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখছে।

এ পর্যন্ত মৃত দুই শ্রমিকের পরিচয় প্রকাশ করেছে প্রশাসন। তাঁদের নাম ১৯ বছর বয়সি জুমানি জুয়াং এবং মালোথি। দুজনেই ওড়িশার বাসিন্দা। তিরুভাল্লুর সরকারি হাসপাতালে তাঁদের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য রাখা হয়েছে। রাজ্য সরকার জানিয়েছেমৃতদের মরদেহ তাঁদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। নিহতদের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। তামিলনাড়ুর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাতথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল পরিষেবা মন্ত্রী আর কুমার জানিয়েছেনআক্রান্তদের মধ্যে ৬০ জন মহিলা এবং চার জন পুরুষ রয়েছেন। শিল্প কারখানার শীতলীকরণ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হচ্ছিল অ্যামোনিয়া। এই ঘটনাকে অত্যন্ত মর্মান্তিক’ বলে উল্লেখ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী সি জোসেফ বিজয়। তিনি মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশিআহতদের চিকিৎসায় কোনো রকম গাফিলতি না করার নির্দেশও দিয়েছেন।

ঘটনার তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে তামিলনাড়ু সরকার। শিল্প সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য দফতরের পরিচালকতামিলনাড়ু  দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের সদস্য-সচিব এবং জনস্বাস্থ্য দফতরের অতিরিক্ত পরিচালককে নিয়ে গঠিত এ কমিটিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তর্বর্তী রিপোর্ট এবং তিন দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দফতর জানিয়েছেক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলির সঙ্গে সমন্বয় রেখে চিকিৎসানজরদারি এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা পরিচালনা করা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের তরফে আক্রান্ত শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসযন্ত্রজনিত জটিলতা পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশিদুর্ঘটনাস্থলের পরিবেশগত পর্যবেক্ষণশিল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রোটোকল পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করা হয়েছে। তিরুভাল্লুর জেলার অন্যান্য অনুরূপ শিল্প ইউনিটগুলোতে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিরীক্ষা চালানোর সুপারিশ করেছে স্বাস্থ্য দফতর।

মর্মান্তিক এ ঘটনায় রবিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শোকপ্রকাশ করে বলেনতিরুভাল্লুরের দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় তিনি গভীরভাবে মর্মাহত। মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন তিনি। তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আর্লেকরও গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। তিরুভাল্লুরের এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা বিধিপরিযায়ী শ্রমিকদের আবাসন ব্যবস্থা এবং বিপজ্জনক রাসায়নিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নজরদারি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। শ্রমিকদের আবাসন কারখানার অ্যামোনিয়া প্ল্যান্টের এত কাছে কেন ছিলনিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা হয়েছিল কি না, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল কি নাতা নিয়ে জোরালো বিতর্ক শুরু হয়েছে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের দিকেই এখন তাকিয়ে প্রশাসনশিল্পমহল  ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলি। 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!