Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • জানুয়ারি ১১, ২০২৬

ঋত্বিক ভুবন

কানাইলাল জানা
ঋত্বিক ভুবন

হিরণ মিত্রের রেখাচিত্রে ঋত্বিক ঘটক

 
২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে মহারাষ্ট্র বেড়াতে গিয়ে পুনেতে আছি, দুটি দারুণ খবর এল ফেসবুক ও হোয়াটসআপে। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট হয়েছেন এবং অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছেন। পুনে শহরে এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র আলোচনা নেই। মুম্বাই শহরেও তাই। ১৯৮৯ সালে যখন প্রথম বম্বে যাই, ‘ইন্ডিয়া’ বলে একটি আঞ্চলিক ইংরেজি কাগজে প্রতিদিন পশ্চিমবঙ্গের, বিশেষ করে কলকাতার থিয়েটার নিয়ে আলোচনা থাকত। সিনেমা নিয়েও। কাগজ পড়ে মনে হতো, মুম্বাইয়ে আছি না কলকাতায় ! তখন কলকাতার থিয়েটারের সব কিংবদন্তিরা সক্রিয়। গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়াতে ঝোলানো ফলকে শিবসেনা দলের দাবি: মুম্বা দেবীর নামে বোম্বের নামকরণ করতে হবে মুম্বাই, অন্যদিকে মেরিন ড্রাইভের নাম যে হয়েছে নেতাজি সুভাষ রোড, তা কেউ বলে না বলে বাঙালির প্রবল আফশোস। একটি খটকা লাগল, বহু সংখ্যক বিদেশি বোট থেকে এলিফ্যান্টা কেভে নামার সময় তাঁদের হাত ধরে নামিয়ে দেন শাড়ি পড়া কালো কুচকুচে মারাঠি মহিলারা। বিদেশিরা প্রত্যকের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন ১০০ টাকার নোট। মনে হয়েছিল মারাঠিরা তো এত অভাবী নন। পরে আর দেখা যায়নি এ দৃশ্য।
 

দীর্ঘদেহী উজ্জ্বল দুটো চোখ, এলোমেলো মাথার চুল, গায়ে পাজামা-পাঞ্জাবি, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। দেখলেই মনে হতো, এই বুঝি কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। সকলে তার সাক্ষী থাকবে। একবার বোম্বেতে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল গুলজার সাহেবের।

 
সন্ধেয় শ্যামাপ্রসাদ চকে কত রকমের খাবার। ২০ বছর পর গিয়ে দেখি সব বদলে গেছে। আইএসএল-এ প্রথম দিকে ‘মুম্বই সিটি’ দলে বাঙালি ছিল, এখন নেই। কলকাতার ক্লাবে আছেন একজন দুজন করে। আবার ওখানে মহিলা ক্রিকেট দলে ঝুলন গোস্বামীর ওপর আস্থা অটুট। প্রয়াত রাজীব গান্ধী যখন বলেছিলেন ‘কলকাতা একটি মুমূর্ষু নগরী’, আমাদের খুব রাগ অভিমান হয়েছিল। কিন্তু কলকাতা যে মৃত নগরী, তা প্রমাণিত হলো নানা ঘটনায়। বাম আমল থেকে আটগুণ বেশি বিদ্যুৎ বিল আদায় করে সঞ্জীব গোয়েঙ্কা লক্ষ্মৌতে দল গড়েছেন। প্রকট হলো অন্যান্য শহরের থেকে পিছিয়ে পড়া। আইপিএলে বাঙালি না থাকলেও অনেক যোগ্য মহিলা ক্রিকেটার ছিলেন, তখন সেরা অলরাউন্ডার দীপ্তি শর্মা খেলতেন বাংলার হয়ে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ থেকে বাঙালির বসবাস উঠে যাওয়া, এই পিছু হঠার আরও একটি দিক। তার মানে, সারাভারতে বাঙালির গ্রহণ যোগ্যতা যে কমে গেছে, এ জন্য বাঙালি নিজেরাই দায়ী। পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে আজও ঋত্বিক ঘটকের প্রভাব, গর্ব এবং মহিমা হাওয়ায় ভাসে রেণু রেণু। তিনি এখানে পড়াতেন, ১৯৬৫-৬৬ সাল নাগাদ। ভিপিও হয়েছিলেন এ প্রতিষ্ঠানের।
 
হিন্দি সিনেমা পরিচালক গুলজারের কথায়, ঋত্বিক ঘটককে দেখে মনে হত গ্রিক দার্শনিক। অ্যারিস্টটল বা সক্রেতিস যেমন। দীর্ঘদেহী উজ্জ্বল দুটো চোখ, এলোমেলো মাথার চুল, গায়ে পাজামা-পাঞ্জাবি, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। দেখলেই মনে হতো, এই বুঝি কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। সকলে তার সাক্ষী থাকবে। একবার বোম্বেতে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল গুলজার সাহেবের। ঋত্বিকের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে উঠতেই, গুলজারের গালে একটি হালকা থাপ্পড় দিয়ে তিনি বললেন: ‘হ্যাঁরে তুই কী এমন কাজ করেছিস যে তোর এত নামডাক?’ অস্বস্তি হলো গুলজারের, পরে ভাবলেন ঐ আজানুলম্বিত রাজকীয় হাতের হালকা চাঁটি তাঁর গাল যে সহ্য করতে পেরেছিল সেটাই বা কম কিসের! উনি তো যে সে কেউ নন। তাঁর হাতের ছোঁয়াও যেন কোনো একজন গ্রিক দার্শনিকের স্নেহের স্পর্শ! উনি তো ভারতীয় সিনেমার একজন দার্শনিকই বটে। যখন তিনি পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পড়াচ্ছেন, তখন ক্লাসে নিজের সিনেমা গুটিকয়েক ছাত্রকে দেখাতেন। পরে সব ছাত্রকে। শট ধরে ধরে সবার সঙ্গে আলোচনা করতেন।
 

শিষ্য কুমার সাহানি তাঁর সিনেমায় সঙ্গীতপরিচালক ভাস্কর চন্দ্রভারকরের মাধ্যমে জারিন দারুওয়ালাকে দিয়ে যে মল্লার বাজিয়ে ছিলেন, তা ঋত্বিকের সঙ্গীতপরিচালনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই। বোম্বের ফিল্ম ক্লাবে ‘সুবর্ণরেখা’ দেখে কুমার সাহানি মন্তব্য করেছিলেন, এরকম ছবি ইতিপূর্বে তিনি আর দেখেননি।

 
তাঁর প্রিয় ছাত্ররা টিএস জন, আসরানি, আদুর গোপালকৃষ্ণন, মণি কাউল, কুমার সাহানি-রা যখন সত্যজিৎ রায়, দে সিকা-র গীতিমূলক বাস্তবতার অনুরাগী হয়ে পড়ছেন, ঋত্বিক সে বাস্তবতাকে একেবারে ভেঙেচুরে দিলেন। তাঁরা ইতালির নানারকমের ছবিও দেখতেন। ফ্যাসিবাদের পতনের পর ইতালিতে শুরু হয় নব্য বাস্তবতা, এমনও হয়েছে মুসোলিনির সংস্কৃতিমনস্ক ছেলের জন্য রোসেলিনিকেও সিনেমা নির্মাণ করতে হয়েছে।
 
পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ‘কোমল গান্ধার’ দেখে মণি কাউল সরাসরি ঋত্বিককে বলেছিলেন: আপনি ছবিগুলোকে এত উচ্চগ্রামে নিয়ে যান কেন? আসলে ‘কোমল গান্ধার’ দেখে কমিউনিস্ট দল এবং কলকাতার দর্শক ভালো আচরণ করেননি ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে। ফিল্মের ছাত্ররা স্বীকার করেছেন ‘কোমল গান্ধার’ একটি মাস্টার পিস। যে সময় পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটের উজ্জ্বল ছাত্ররা ফিওদর দস্তয়েভস্কি, আন্দ্রেই তারকোভস্কি, অঁরি মাতিস, রবের ব্রেসঁ, পল সেজানদের নিয়ে মাতোয়ারা, সে সময় ঋত্বিক ঘটক প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের মন নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিলেন।
 

‘মেঘে ঢাকা তারা’-র নীতা পাহাড়ের পটভূমিতে নিজেকে স্বাধীন ভাবতে চেয়েছিল, কিন্তু ‘সুবর্ণরেখা’য় সীতা সামাজিক লজ্জায় স্বীকার করতে পারে না। প্রকৃতির সান্নিধ্য তার আশ্রয়। বাস্তবের থেকেও পরিচালকের মননের প্রাবল্য আমাদের বিস্মিত করে দেয়।

 
ঋত্বিকের অন্যতম প্রধান শিষ্য কুমার সাহানি তাঁর সিনেমায় সঙ্গীতপরিচালক ভাস্কর চন্দ্রভারকরের মাধ্যমে জারিন দারুওয়ালাকে দিয়ে যে মল্লার বাজিয়ে ছিলেন, তা ঋত্বিকের সঙ্গীতপরিচালনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই। বোম্বের ফিল্ম ক্লাবে ‘সুবর্ণরেখা’ দেখে কুমার সাহানি মন্তব্য করেছিলেন, এরকম ছবি ইতিপূর্বে তিনি আর দেখেননি। দেশে বিদেশে কোথাও তখন এরকম ছবি হচ্ছে কিনা তাঁর জানা নেই। এই ছবি দেখার প্রভাব সাংঘাতিক। ছবির সর্বত্র ছড়িয়ে আছে দেশজ ভাবাবেগ। এটাই আমাদের অনুসরণ যোগ্য ঐতিহ্য। মহাকাব্যিক ‘সুবর্ণরেখা’ কুমার সাহানিকে প্রবল আলোড়িত করে, উত্তরাধিকার বোধে ছেয়ে যায় তাঁর ভাবনা-চিন্তা। সঞ্চার করেছিল উত্তরাধিকারবোধ। ‘মেঘে ঢাকা তারা’-র নীতা পাহাড়ের পটভূমিতে নিজেকে স্বাধীন ভাবতে চেয়েছিল, কিন্তু ‘সুবর্ণরেখা’য় সীতা সামাজিক লজ্জায় স্বীকার করতে পারে না। প্রকৃতির সান্নিধ্য তার আশ্রয়। বাস্তবের থেকেও পরিচালকের মননের প্রাবল্য আমাদের বিস্মিত করে দেয়।
 
‘সুবর্ণরেখা’য় বহুরূপীর উপস্থিতি রামায়ণ কাহিনির যে সন্দর্ভ রচনা করে, তা পুরাণগাথার মতোই অপরূপ সুন্দর এক সৃষ্টি। পৌরাণিক বিষয় মহাকাব্যিক রূপের চেয়েও অনেক বেশি মনোহর, কারণ তা সুষমামন্ডিত, স্পষ্ট। এসব কারণে ঋত্বিককে বিশ্ব বড়ো আসন দেবেই দেবে….
 

♦♦•♦♦♦♦•♦♦♦♦•♦♦

ফুলডাঙায়, সুনীলদার বাড়িতে


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!