Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • জানুয়ারি ৪, ২০২৬

ফুলডাঙায়, সুনীলদার বাড়িতে

কানাইলাল জানা
ফুলডাঙায়, সুনীলদার বাড়িতে

 
শান্তিনিকেতন প্রথম যাই ১৯৯৮ সালে। তখন বোলপুরের মহকুমাশাসক ছিলেন অমলেন্দু ভট্টাচার্য। পরিচিত কবি। স্থানীয় এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ জমানোর পর জিজ্ঞেস করি, ‘শান্তিনিকেতনের পরিবেশ এখন কেমন ?’  উত্তর এল: ‘এখন শান্তিনিকেতনকে বলতে পারেন প্রেমনগর। এখানকার বিশেষত্ব: ছেলেরা মেয়ে হয়ে যায় আর মেয়েরা ছেলে, বিশেষ করে আদবকায়দায়।’ এখানে যে ক’বার এসেছি, সেরকম কিছু প্রমাণ অবশ্য পাইনি। আড্ডা দিতে দিতে সন্ধ্যা, রাত্রিবাস এসডিও বাংলোয়।  সেদিন আর যাওয়া হল না ফুলডাঙায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘একা এবং কয়েকজন’ বাড়িতে। পরের দিন বিকেলে যখন যাই, সুনীলদার বাড়ির গেটের বাইরে স্বাতী বৌদি দল বেঁধে গল্প করছেন। একটু ডাইনে তুষার তালুকদারের স্ত্রী, তাঁর বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে ব্যস্ত, আরো ডাইনে আরেক দল অন্যরকম আড্ডায় মগ্ন। এ দৃশ্য এখন আর দেখা যাবে না। এ এলাকায় সর্বক্ষণ খাঁ খাঁ করছে নির্জনতা।

 
মনে পড়ে ৫০ বছর আগে গ্রামের রাস্তায় যত ল্যাম্পপোস্ট এবং টেলিগ্রাফ পোস্ট ছিল, তাতে ঝোলানো থাকত ইন্দিরা গাঁধির বাণী: ‘কথা কম কাজ বেশি’। ৪০ বছর আগে  ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় বাংলা বনধ নিয়ে লেখা তাত্ত্বিক কমিউনিস্ট নেতা ভবাণী সেনগুপ্তের একটি নিবন্ধর মূল বিষয় ছিল, ‘বাংলা তো এমনিতেই বন্ধ হয়ে আছে। আশু প্রয়োজন: তাকে সব দিক দিয়ে খুলে ধরা’। বিশ্বভারতীর প্রাক্তন উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তী কাজের থেকে কথা বেশি বলেছেন, খুলে ধরেননি কোনো কিছু। আদায় করতে পারেননি ৯৯ বছর আগে লিজে রাখা আশুতোষ সেনের অতিরিক্ত জমিটি। বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই ভালো। খোলা উত্তরায়ণ ও মিউজিয়াম। দুবছর হল আবার শুরু হয়েছে পৌষ মেলা।

 

সুনীলদার বাড়ির গেটের বাইরে স্বাতী বৌদি দল বেঁধে গল্প করছেন একটু ডাইনে তুষার তালুকদারের স্ত্রী, তাঁর বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে ব্যস্তআরো ডাইনে আরেক দল অন্যরকম আড্ডায় মগ্ন। এ দৃশ্য এখন আর দেখা যাবে না। এ এলাকায় সর্বক্ষণ খাঁ খাঁ করছে নির্জনতা।

 
কলাভবন চত্বরে রামকিঙ্কর বেইজের অনেকগুলি ভাস্কর্য ছড়িয়ে আছে। কিছুটা বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি, বেশ কিছুক্ষণ তাঁর বিখ্যাত মূর্তির সামনে, মা তার বাচ্চাকে পিঠে নিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে ছুটছেন, সন্তান আঁকড়ে ধরে আছে মায়ের আঁচল, পেছন ফিরে মাসি দেখছে পড়ে যাবে বা তো বোন-পো! শিল্পীর শেষ কাজ ‘পেছনে ধানের বিড়া নিয়ে ধান ঝাড়ানোর উদ্যম নিয়ে স্তম্ভিত এক গ্রাম্যরমণী’। মাঠে এখন মেশিন দিয়ে ধান ঝাড়ানো হচ্ছে,  আর অতীতকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে এ অনিঃশেষ ভাস্কর্য।

 
প্রতিদিন বিকেলে ঘুরতে ঘুরতে সোনাঝুরি হাটে। আমার কাছে হাটবিহীন সোনাঝুরি বেশি আকর্ষণীয়, তবে হাটের ভিড় এবং কেনাকাটাকে অস্বীকার করা যায় না। হাট থেকে ফেরার পথে প্রতিদিন বল্লভপুর মোড়ে মেনকা বাগদির হাতের তৈরি কুসুমবীজ দিয়ে গরম গরম চপ। দুশ টাকার তেলেভাজা খেয়ে ট্যুরের আয়োজক রুদ্রনীল মেনকাকে দিল পাঁচশ টাকা, কারণ তেমন চলে না এ দোকান: পাঁচ বছর আগে এখানে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চপ ভেজেছিলেন, বলে ভাঙচুর হয়, মারধরও খেতে হয় মেনকাকে। এই হচ্ছে বাঙালির কান্ডজ্ঞান ! কোথায় মুখ্যমন্ত্রী চপ ভাজবেন তার জন্য দায়ী কি অভাগী অভাবী মেনকা? আরো এক কান্ডজ্ঞানের কথা পাড়ি: সকলে মিলে কংকালীতলা যাব। ভিড় আগের থেকে বহুগুন বেশি। সাংসদ অসিত মাল বিরাট জায়গা করে দিয়েছেন মেলার জন্য। সব জায়গার মতো এখানেও চলছে সাঁওতালি নাচ এবং তাদের সঙ্গে ছবি তোলা। হঠাৎ দেখি আমার মেয়ে ময়ূরাক্ষী হাউহাউ করে কাঁদছে। জানা গেল, মন্দিরের সামনে একটি ছাগল বাঁধা, মেয়ে চায় ছাগলের দাম দেবে, যেন বলি না দেওয়া হয়, শুনে পুরোহিত বললেন: ‘সে কী সম্ভব? এক দম্পতির সন্তান হচ্ছে না, গনৎকার বলেছে, কংকালীতলায় ছাগ বলি দিলে সন্তান হবে’। এই হচ্ছে বাংলায় বিজ্ঞানমনস্কতার অগ্রগতি !

 

ব্রহ্মচর্য আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষারম্ভের প্রথম থেকেই ভগিনী নিবেদিতাকে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু বিবেকানন্দের অমতে তাঁকে পাওয়া সম্ভব হয়নি। পেয়েছিলেন ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়কে

 
বিভিন্ন সময় ভুরিভোজ খাওয়া হয়েছে ‘আয়োজন’, ‘মাড হাউস’, ‘রাম-শ্যাম’, ‘পঞ্চচুল্লী রান্নাঘর’ ইত্যাদি রেস্তোরাঁয়। রাম-শ্যামের ব্যবসা ও প্রতিপত্তি দেখবার মতো। সুরুলের জমিদার বাড়ি খুবই যত্ন করে সংরক্ষিত। কোপাইয়ের সবুজ জলের পাড়ে খেজুর গাছের সারি। গলায় রসের হাঁড়ি। কোপাই-র এ পাড় বালি দিয়ে বোজানো। পাড়ে সাজানো নানা বিপণি। রাস্তার দু’ধারে খেজুর গুড় বিক্রির বহু অস্থায়ী আস্তানা। সবথেকে ফর্সা দেখতে পাটালিতে থাকে সবথেকে বেশি চিনি। বিকোচ্ছে কেজি দেড়শো টাকায় যেটা কলকাতায় একশ। আমাদের হোমস্টের কাছ থেকে মেয়ে কিনেছে তিনশ টাকায়, কিছুটা ভাল কিন্তু মেয়ে তো সে স্বাদ পায়নি: গ্রামে আমাদের পাড়ায় শিউলি ভোরভোর রসের হাঁড়ি নামানোর পর আমরা পাল্টা হাঁড়ি ঝুলিয়ে বাসিরস সংগ্রহ করে যে চিটেগুড় বানাতাম। আঃ সে গুড়ের কী স্বাদ !

 
শান্তিনিকেতনের অপূর্ব পরিবেশ এবং রবীন্দ্রনাথের সঙ্গ পাওয়া সত্ত্বেও কেউ কেউ চলে গেছেন সবকিছু ছেড়ে । ব্রহ্মচর্য আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষারম্ভের প্রথম থেকেই ভগিনী নিবেদিতাকে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু বিবেকানন্দের অমতে তাঁকে পাওয়া সম্ভব হয়নি। পেয়েছিলেন ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়কে। যিনি রবীন্দ্রনাথকে ‘কবিগুরু’ উপাধি দিয়েছিলেন।

 
শান্তিনিকেতনের চেয়ে দেশের ডাক হয়তো তাঁর কাছে বেশি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতায় ফিরে ‘সন্ধ্যা’ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। প্রবল ইংরেজ বিরোধী লেখা প্রকাশ করার জন্য তাঁর জেল হয়। জেলে থাকাকালীন একটি ভুল অপারেশনের জন্য মৃত্যু ঘটে ১৯০৭ সালে। কবিগুরুর সকল গানের ভাণ্ডারী ছিলেন নাতি দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। যিনি বলেছিলেন রবিদার অনুপস্থিতিতে এখানে থাকা অসম্ভব, সেই দিনু ঠাকুরও সব ছেড়ে জোড়াসাঁকোয় ফিরেছিলেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর আগেই চলে গেলেন তিনি।

 

ল্যাবরেটরি থেকে কঙ্কাল বের করে কোটরে ও চোয়ালে ফসফরাস ঘষে রাতে ভয় দেখাতেন চন্ডী ঠাকুরকে। ফসফরাসও বের করেছিলেন একই জায়গা থেকে। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, শিক্ষক জগদানন্দ রায় ধরতে পারবেন না, কারণ ফসফরাস কিছুটা হাওয়ায় উবে যায়।

 
প্রথম যুগে এই শান্তিনিকেতনে আনন্দের প্রাচুর্য এতো বেশি ছিল যে ছুটি পড়লে অনেক ছাত্র বাড়ি যেতেন না। যেমন, সুধীরঞ্জন দাস। ল্যাবরেটরি থেকে কঙ্কাল বের করে কোটরে ও চোয়ালে ফসফরাস ঘষে রাতে ভয় দেখাতেন চন্ডী ঠাকুরকে। ফসফরাসও বের করেছিলেন একই জায়গা থেকে। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, শিক্ষক জগদানন্দ রায় ধরতে পারবেন না, কারণ ফসফরাস কিছুটা হাওয়ায় উবে যায়। সুধীরঞ্জন দিনুবাবুর কাছে গান শিখলেন: ‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার / পরানসখা বন্ধু হে আমার।’ বারবার সুধীরঞ্জনের মুখে শুনে মাস্টার মশাই নগেন আইচ গাইতে লাগলেন রাত বাড়লে। তিনি থাকতেন দিনু ঠাকুরের জানলার বিপরীতে। এক রাতে যেই-না নগেনবাবু গুনগুনিয়ে উঠেছেন, অমনি দিনু ঠাকুর এসরাজ নিয়ে গান জুড়লেন— ‘গভীর রাতে তোমার অত্যাচার / নগেন আইচ শত্রু হে আমার।’ মজা আর মজা। গান রচনায় আগে সুর দিতেন কবিগুরু, তারপর সুরে বসাতেন কথা। এ বিষয়ে ভাগ্নী সরলা অনেক এগিয়ে। মহীশূর থাকাকালীন সরলা যে যে সুর আনলেন, তাতে কথা বসিয়ে গান হল: ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’,  ‘এ কি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ’ ইত্যাদি, বোটের মাঝির থেকে যে যে বাউল সুর আনলেন তাতে কথা বসিয়ে গান হল: ‘কোন্ আলোকে প্রাণের প্রদীপ’,  ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’, ‘আমার সোনার বাংলা’ ইত্যাদি।

 
এবারের ৭  পৌষ, রেডিওতে সুভাষিত-তে ছিল বলেন্দ্রনাথ। বলেন্দ্রনাথের রচনা শোনা মানে মধুগন্ধে ভরে যায় মনপ্রাণ। পরে দূরদর্শনে দেখি, বিশ্বভারতীর এখনকার উপাচার্য প্রবীর কুমার ঘোষের পৌষমেলা উপলক্ষে উপাষণার মাঠে ভাষ্যপাঠ। আন্তরিক অনুষ্ঠান। ভিড়ও তেমনি। তবুও ভাবি যদি শুরু করা যেত ‘হলকর্ষণ’!  আমরা আজকাল থাইল্যান্ডের উন্নতমানের ফলগাছ লাগাই, সেখানে হলকর্ষণ অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী স্বয়ং উপস্থিত থেকে গোরুকে ৬টি শস্যসহ জল খেতে দেন। যে যে শস্যে মুখ দেয় গোরু, মনে করা হয় সে শস্যগুলির ভাল ফলন হবে সে বছর। আর জল খেলে ধরা হয় ভাল বৃষ্টি হবে।

♦♦•♦♦♦♦•♦♦♦♦•♦♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!