- বৈষয়িক
- মার্চ ৪, ২০২৬
যুদ্ধের জেরে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা, টাকার দামে ঐতিহাসিক পতন। তেলের ধাক্কায় বাড়ছে অর্থনৈতিক ঝুঁকি
পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে । এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মুদ্রায়, বিশেষ করে ভারতের টাকার ওপর। বুধবার ভারতীয় টাকার দাম মার্কিন ডলারের সাপেক্ষে ৯২.১৭-এ নেমে গিয়ে ইতিহাসে প্রথমবার ৯২-এর নিচে (ডলারপ্রতি) লেনদেন হয় । এটি জানুয়ারিতে ছোঁয়া আগের সর্বনিম্ন ৯১.৯৮৭৫-এর রেকর্ডও অতিক্রম করেছে। দিনভিত্তিক হিসেবে টাকার দামের পতন প্রায় ০.৭% ।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি আরও অবনতি ঠেকাতে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিসার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ করতে পারে ।
পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে । ইসরায়েল-এর সামরিক অভিযানের পর ইরান পাল্টা হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো ও ট্যাংকার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। একইসঙ্গে লেবানন-এও হামলার খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রও ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বিত সামরিক তৎপরতায় যুক্ত রয়েছে ।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী, যেখান দিয়ে বিশ্বে মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়, সেই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ।
সংঘাত শুরুর পর থেকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১৩% এর বেশি বেড়েছে, যা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের হার কমানোর সম্ভাবনাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। এশিয়ার শেয়ারবাজারেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে ।
ভারত তার মোট অপরিশোধিত তেলের চাহিদার ৮০% এর বেশি আমদানি করে। ফলে তেলের দাম বাড়লে— আমদানি বিল বৃদ্ধি পাবে, চলতি হিসাব ঘাটতি বা Current Account Deficit প্রসারিত হবে, মুদ্রাস্ফীতি ত্বরান্বিত হবে, মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে।
ভারতীয় টাকা দীর্ঘদিন ধরে চাপে ছিল। চলতি বছরে টাকা ২% এর বেশি অবমূল্যায়িত হয়েছে এবং ২০২৫ সালে প্রায় ৫% পতনের পর উদীয়মান বাজারগুলোর মধ্যে অন্যতম দুর্বল মুদ্রায় পরিণত হয়েছে ।
ঝুঁকিবিমুখ মনোভাব বাড়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে অর্থ তুলে নিচ্ছেন । পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে সেখানে কর্মরত ভারতীয়দের রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব পড়তে পারে ।
ব্যাঙ্কের বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত হলে ভারতের সামষ্টিক অর্থনৈতিক চিত্র দুর্বল হতে পারে, চলতি হিসাব ঘাটতি বৃদ্ধি, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, টাকার তীব্র অবমূল্যায়ন এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাসের মাধ্যমে ।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন, উচ্চ তেলের দামের প্রভাব বহির্বাণিজ্য ঘাটতিতে পুরোপুরি প্রতিফলিত হওয়ার আগেই টাকার বিনিময় হারে তা দৃশ্যমান হবে ।
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তা এখন পেছনের সারিতে চলে গেছে। বাজার অংশগ্রহণকারীরা আশা করেছিলেন, শুল্ক হ্রাস ও রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে এমন চুক্তি টাকাকে সহায়তা করতে পারত।
এছাড়া কিছু ব্যাঙ্ক সতর্ক করেছে যে, যদি আঞ্চলিক যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং হরমুজ প্রণালীতে তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হয়, তাহলে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন মুদ্রাস্ফীতির ঢেউ সৃষ্টি করবে ।
এই পরিস্থিতি শুধু ভারতের জন্য নয়, বরং সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। উচ্চ জ্বালানি মূল্য, বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝোঁক, উদীয়মান বাজার থেকে মূলধন বহিঃপ্রবাহ এবং সুদের হার কমানোর পরিকল্পনায় বিলম্ব, সব মিলিয়ে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে ।
বিশ্ববাজার এখন নজর রাখছে—সংঘাত সীমিত থাকবে, নাকি এটি দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে, যার প্রভাব তেল, মুদ্রা ও শেয়ারবাজার হয়ে বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে পৌঁছে যাবে ।
❤ Support Us








