- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- অক্টোবর ২২, ২০২৫
মেহুল চোকসিকে ভারতে ফেরানোর ছাড়পত্র বেলজিয়াম শীর্ষ আদালতের
ভারতীয় ব্যাঙ্কিং ইতিহাসের অন্যতম বড়ো জালিয়াতি মামলার মূল অভিযুক্ত মেহুল চোকসিকে অবশেষে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার পথ প্রশস্ত করে দিল বেলজিয়ামের একটি আদালত। অ্যান্টওয়ার্প কোর্ট অফ আপিলস জানিয়ে দিয়েছে, চোকসিকে ভারতে প্রত্যর্পণে আর কোনো আইনি বা মানবাধিকার ভিত্তিক বাধা নেই। বেলজিয়াম আদালতের চার সদস্যের চেম্বার অফ অ্যাকিউজেশন তাঁদের রায়ে জানিয়েছে, ভারত সরকারের আবেদন আইনি দিক থেকে সবদিক থেকেই গ্রহণযোগ্য এবং ন্যায্য।
২০১৮ সালে দেশ ছাড়ার পর থেকে চোকসি ভারতের প্রত্যর্পণ এড়াতে একের পর এক কৌশল নিয়েছিলেন। প্রথমে তিনি ক্যারিবিয়ান দ্বীপ অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার নাগরিকত্ব নেন। পরে বেলজিয়ামের নাগরিকত্ব দাবি করেন। চোকসির স্ত্রীও বেলজিয়ামের নাগরিক বলে জানা যায়। তবে এদিন আদালত তার রায়ে জানিয়েছে, মেহুল চোকসি বেলজিয়ামের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক নন, একজন বিদেশি হিসেবে বিবেচিত, এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলি এতটাই গুরুতর যে তা থেকে তিনি কোনোভাবেই রেহাই পেতে পারেন না।
ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী ব্যুরো বা সিবিআই-এর আবেদনের ভিত্তিতে ভারতের একটি বিশেষ আদালত ২০১৮ সালের ২৩ মে এবং ২০২১ সালের ১৫ জুন চোকসির বিরুদ্ধে দু-দফায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। সে পরোয়ানাগুলিকে ‘বৈধ’ এবং ‘কার্যকরযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেছে বেলজিয়াম আদালত। তাদের মতে, চোকসির বিরুদ্ধে ফৌজদারি ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা, সরকারি অর্থ তছরুপ এবং দুর্নীতিমূলক আচরণের অভিযোগ রয়েছে। এ সব অপরাধ ভারত কিংবা বেলজিয়াম— উভয় দেশের আইনে কারাদণ্ডযোগ্য। শুধু ‘প্রমাণ নষ্ট করার’ অভিযোগটি বেলজিয়াম আইনে অপরাধ হিসেবে গণ্য না হওয়ায় ওই একটি অভিযোগই প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে বিবেচিত হয়নি।
চোকসির আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেছিলেন, ভারতে তাঁর ন্যায্য বিচার হবে না। তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হবেন, এমনকি জেলে নির্যাতিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাঁরা অতীতের একটি অভিযোগ তুলে ধরেন, যেখানে বলা হয়েছিল যে, ভারতীয় এজেন্সি তাঁকে ২০২১ সালে অ্যান্টিগুয়া থেকে অপহরণ করে ডোমিনিকায় নিয়ে যায়। তবে আদালত এ সমস্ত দাবিকে ভিত্তিহীন ও তথ্যহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। দিল্লির পক্ষ থেকে চোকসির সুরক্ষা ও অধিকার সংক্রান্ত নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি আদালতে তুলে ধরা হয়। বলা হয়, তাঁকে মুম্বইয়ের আর্থার রোড জেলের ব্যারাক নম্বর ১২-তে রাখা হবে, যেখানে রয়েছে ৪৬ বর্গমিটার আয়তনের একটি ঘর, দুটি সেল এবং একটি পৃথক শৌচাগার। পাশাপাশি জানানো হয়, অভিযুক্তকে কেবলমাত্র চিকিৎসা বা আদালতে হাজিরার জন্য জেল থেকে বাইরে আনা হবে। এ আশ্বাসগুলিও আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে।
চোকসির তরফে একটি অভিযোগ ছিল, ভারতের বিচারব্যবস্থা স্বাধীন নয় এবং সংবাদমাধ্যমের অতিরিক্ত প্রচারের কারণে তাঁর পক্ষে ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হবে। কিন্তু বেলজিয়াম আদালত এ আশঙ্কাকেও অযৌক্তিক বলে বিবেচিত করেছে। বিচারকরা তাঁদের রায়ে বলেছেন, চোকসির বিচার প্রক্রিয়া ভারতে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ীই সম্পন্ন হবে। শীর্ষ আদালতের এই রায়, বেলজিয়ামে মেহুল চোকসির আইনি লড়াইয়ের ইতি টানল। এতদিন পর্যন্ত বেলজিয়ামে তিনি মানবাধিকার, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং নাগরিক সুরক্ষার যুক্তি তুলে ভারতের হাতে প্রত্যর্পণ আটকানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আদালত সে সব যুক্তিকে খারিজ করে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আইনের চোখে তিনি একজন পলাতক আসামি এবং তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করা একান্ত প্রয়োজনীয়।
বেলজিয়াম আদালতের রায় ঘোষণার পর, পলাতক জালিয়াতকে দেশে ফিরিয়ে আইনের আওতায় আনবার ব্যপারে তৎপর দিল্লি। ইতিমধ্যেই তাঁর প্রত্যর্পণের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে সূত্রের খবর। বেলজিয়াম সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন মিললেই চোকসির ভারতে পুনর্গামন সময়ের অপেক্ষা। সূত্রের খবর, তাঁকে বিশেষ বিমানে করে মুম্বইয়ে এনে আদালতে তোলা হবে বলে। চোকসির প্রত্যর্পণের খবর সামনে আসতেই, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই-এর এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক বলেছেন, ‘এই রায় আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ব্যবস্থার উপর ভারত সরকারের আস্থাকে আররো জোরালো করল। চোকসিকে দেশে ফিরিয়ে আনা এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা।’
উল্লেখ্য, পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক কেলেঙ্কারিতে মেহুল চোকসির সঙ্গে নাম জড়ায় তাঁর ভাইপো নীরব মোদিরও। অভিযোগ, তাঁরা ব্যাঙ্কের কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিকের সঙ্গে মিলে ১৩,০০০ কোটিরও বেশি ঋণ তছরুপ করেছেন। ওই অর্থ পরে বিদেশে পাচার করা হয় বলেও অভিযোগ। বর্তমানে নীরব মোদি লন্ডনে বন্দি অবস্থায় রয়েছেন এবং তাঁর প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এখনো চলছে।
❤ Support Us







