Advertisement
  • প্রচ্ছদ রচনা স্মৃ | তি | প | ট
  • ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬

প্রয়াত কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক শংকর। ‘চৌরঙ্গী’, ‘জন অরণ্য’-র স্রষ্টার প্রয়াণে শোকস্তব্ধ সাহিত্যজগৎ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
প্রয়াত কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক শংকর। ‘চৌরঙ্গী’, ‘জন অরণ্য’-র স্রষ্টার প্রয়াণে শোকস্তব্ধ সাহিত্যজগৎ

বাংলা সাহিত্যের আকাশে নক্ষত্রপতন। প্রয়াত জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায়যিনি পাঠকমহলে পরিচিত ছিলেন শংকর’ নামে। চৌরঙ্গীর স্রষ্টা, ‘জন অরণ্যর নির্মম শহরচিত্রকার, ‘কত অজানারের আত্মজৈবনিক কথক শুক্রবার দুপুর ১টা ১২ মিনিট নাগাদ শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৯৩। দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন তিনি। সম্প্রতি ব্রেন টিউমারের সমস্যাও ধরা পড়েছিল। কয়েক দিন ধরেই বাইপাস সংলগ্ন এক বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অবশেষে জীবনযুদ্ধ থেমে গেল এক অনির্বচনীয় অজানার সামনে। তাঁর প্রয়াণে শোকের ছায়া সর্বত্র।

১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর অধুনা বাংলাদেশের যশোহর জেলার বনগ্রামে জন্ম। বাবা হরিপদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন পেশায় আইনজীবী। শৈশব-কৈশোর কেটেছে হাওড়ায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধদেশভাগপিতৃবিয়োগ— ছোট বয়সেই জীবনের কঠোর অভিঘাতের মুখোমুখি হয়েছেন। জীবিকার তাগিদে কখনো শিক্ষকতাকখনো কেরানির কাজকখনো হাইকোর্ট পাড়ায় চাকরিসংগ্রামই ছিল তাঁর প্রথম পাঠশালা। সেসব অভিজ্ঞতারই রূপান্তর ঘটে সাহিত্যে। কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ব্রিটিশ ব্যারিস্টার ফ্রেডরিক বারওয়েলের অধীনে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয় তাঁর প্রথম সাড়া জাগানো উপন্যাস কত অজানারে। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত সে বই তাঁকে এনে দেয় বিপুল পরিচিতি। শুরু হয় এক দীপ্ত সাহিত্যযাত্রা

এর পর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। চৌরঙ্গী’ প্রকাশের পর তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালি পাঠকের হৃদয়ের আপনজন। সদ্য স্বাধীন দেশে, মহানগর কলকাতার হোটেল-জীবনের আলো-ছায়াউচ্চাকাঙ্ক্ষা ও পতনের গল্পে নির্মিত সে উপন্যাস কালজয়ী। ২০১২ সাল পর্যন্ত বইটির ১১১টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে বিরল কৃতিত্ব। পরবর্তীতে সীমাবদ্ধ’ ও জন অরণ্য’ উপন্যাসে উঠে আসে  কর্পোরেট দুনিয়া ও শহুরে মধ্যবিত্তের নৈতিক সঙ্কট। এই দুই কাহিনি অবলম্বনে কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেন স্মরণীয় চলচ্চিত্র। চৌরঙ্গী’ উপন্যাস থেকেও তৈরি হয় জনপ্রিয় সিনেমাযেখানে স্যাটা বোস চরিত্রে অভিনয় করেন মহানায়ক উত্তম কুমার। শংকর নিজেই একবার বলেছিলেন, ‘সত্যজিৎই আমাকে সবার কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন।’

সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর ব্যাপ্তি কেবল উপন্যাসে সীমাবদ্ধ ছিল না। কিশোর সাহিত্যে পিকলুর কলকাতাভ্রমণ’ বা পরে খারাপ লোকের খপ্পরে’ নামেও তাঁর লেখনী সমান জনপ্রিয়তা পায়। স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর গবেষণাধর্মী গ্রন্থগুলিও দীর্ঘদিন বেস্টসেলার তালিকায় ছিল। সত্তর-আশির দশকে প্রকাশিত তাঁর স্বর্গ-মর্ত-পাতাল’ ট্রিলজি—‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন অরণ্য’ ও আশা আকাঙ্ক্ষা’ সে প্রজন্মের পাঠাভ্যাসে এক বিশেষ ছাপ রেখেছিল।  ২০১৪ সালে একা একা একাশি’ উপন্যাসের জন্য পান  সাহিত্য অকাডেমি পুরস্কার। যদিও অনেকের মতেতাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি আরও আগেই আসা উচিত ছিল। তবু মূলধারার পুরস্কারের চেয়ে পাঠকের অকুণ্ঠ ভালোবাসাকেই তিনি জীবনের আসল প্রাপ্তি বলে মনে করতেন।শংকরের প্রয়াণে প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এক বার্তায় তিনি লেখেন, ‘বাংলা সাহিত্য এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে হারাল। তাঁর সৃষ্টি প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠককে মুগ্ধ করেছে।’

৫ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা ভাষার ভেতর দিয়ে শংকর নির্মাণ করেছেন এক সর্বভারতীয় পাঠভুবন। শহরের অন্তর্লোকঅফিসকক্ষের নিঃসঙ্গতামানুষের উচ্চাশা ও ভাঙনের গল্প— সব মিলিয়ে শংকর ছিলেন এক নির্ভীক কথক। আজ তাঁর প্রস্থান কয়েক যুগের অবসান। তাঁর প্রস্থান বাঙালি পাঠকের কাছে নিঃসন্দেহে এক অপূরণীয় ক্ষতি। সাহিত্যজগৎ আজ শোকস্তব্ধ। কলকাতার চৌরঙ্গীর আলো-ছায়া যেন আরও কিছুটা ম্লান।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!