- প্রচ্ছদ রচনা
- মে ২৬, ২০২২
গলির আঁধারে সূর্যোদয়। দেহ ব্যবসাকে স্বীকৃত পেশার স্বীকৃতি সুপ্রিম কোর্টের
দীর্ঘ লড়াইয়ের অবসান । যৌনকর্মীদের নিত্য দিনের ব্যবসাকে স্বীকৃত পেশার মর্যাদা জানাল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। এ এক অভূতপূর্ব আর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ যা পারেনি, ভারত সেখানে সফল। লেনিনের সোভিয়েত রাশিয়া আর মাও সেতুং-এর চিন কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর যৌন পেশাকে নিষিদ্ধ করে সামাজিকভাবে অবরুদ্ধ, উৎপীড়িত যৌনকর্মীদের পুঃণবাসনের ব্যবস্থা করেছিল । মহামতি লেনিন আর মাও সেতুং মাতৃজাতির অপমান সহ্য করতে পারতেন না। তাই যৌনপেশার দরজা বন্ধ করে দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের পুঃণবাসনের মাধ্যমে চাকরি ও অন্যান্য কাজ-কর্মের ব্যবস্থা করেছিলেন । কিন্তু প্রবল প্রতাপমর্ত্য দুই নেতাও যৌন ব্যবসাকে স্বাভাবিক পেশার মর্যাদা দিতে পারেন নি। ধনতান্ত্রিক পশ্চিম দুনিয়া এখনও ইস্যুটি নিয়ে লড়ছে। কোথাও যৌনকর্মীরা দেহকর্মীর স্বীকৃতি পেযেছেন, কোথাও মনোরঞ্জন কর্মীর মর্যাদাও অর্জন করেছেন । ভারতে দীর্ঘকাল ধরে লড়াই চলছে। উদারবাদের প্রবক্তা সমাজবিজ্ঞানীরা এখানে খানিকটা দ্বিধাবিভক্ত। একদলের দাবি, আদিমতম পেশাটিকে উচ্ছেদ করে সংশ্লিষ্ট যৌনকর্মীদের যথাযথ পুঃণবাসন দিতে হবে। তাঁদের চেয়েও উদার ভাবুকদের বিশ্বাস, পুঃণবাসন ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। নিগৃহীত মহিলাদের নিরাপত্তার জন্য মনোরঞ্জন কর্মী স্বীকৃতি দিতে হবে। এই নিয়ে স্মরজিৎ জানার মতো মহামতিরা আমৃত্যু লড়াই চালিয়ে আদালতে একাধিক মামলা দায়ের করেছেন । রাজ জাগা মা-বোনদের উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তা দূর করতে সরাসরি ময়দানে নেমে তাঁদের সংগঠিত করেছেন । ডক্টর জানার নেতৃত্বাধীন দুর্বার এক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য বিপ্লব । সাফল্য তার প্রশ্নাতীত। দুর্বারের ছত্রছায়ায় যৌনকর্মীদের সঞ্চয় বাড়াতে ‘আশা ব্যাঙ্ক’ তৈরি হয়েছে। ব্যাঙ্কের পরিধি কেবল কলকাতায় সীমাবদ্ধ নয়, তার সীমা অসীম হয়ে উঠেছে। রাজ্য ও রাজ্যের বাইরে নানা শাখা-প্রশাখার বিস্তারে। সুপ্রিম কোর্টের রায় সরাসরি না হলেও, মৃত্যুর পর ডক্টর জানার ত্যাগ আর নিষ্ঠাকে স্বীকৃতি জানাল ।
আইনি অধীকারের দাববিতে সোনাগাছিতে যৌনকর্মীদের মিছিল ।
করোনা পর্বে ডক্টর জানা নিগৃহীত মহিলাদের অঞ্চলেই থাকতেন । বাড়ি যেতেন না। তাঁর পরিবার তাঁকে কাজের অবাধ সুযোগ দিয়েছে। জানার চেষ্টায় খাবার পেয়েছেন এলাকার অন্নহীন মহিলারা। তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও তিনি করেছেন। করোনায় আক্রান্ত হয়েও নিজেকে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে নেননি । এরকম অবস্থাতেই মৃত্যুর শিকার হলেন । মূত্যুর পর তাঁর সংক্ষিপ্ত স্মরণসভা হয়েছে। তাঁর স্মরণে এলাকার রাস্তার নামাঙ্করণ করেছেন দুর্বারের কর্মীরা। সে অনুষ্ঠানে গৌতম ঘোষের মতো পরিচালকও অন্যান্য সামাজিকবৃন্দ যোগ দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, দেহ ব্যবসাকে স্বাভাবিক পেশার স্বীকৃতি দেওয়া হোক । তাঁদের উপর বাড়িয়ালি, দালাল, পাড়ার মস্তানসহ সব দুষ্কৃতীদের অনাচার বন্ধ হোক। সুপ্রিম কোর্টের রায় পরোক্ষভাবে সামাজিকতার ঐতিহ্য আর সামাজিক নাগরিকদের অভিপ্রায়কে সম্মান জানাল ।
দূর্বারের স্থপতি, আশা ব্যাঙ্কের রূপকার ।
সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশনাল বেঞ্চ মামলার রায় ঘোষণা করে বলেছে, যৌনকর্মীদের কোনওরকম হেনস্তা করা চলবে না। পেশার জন্য পুলিস তাঁদের নামে অপরাধমূলক মামলা করতে পারবে না। স্বেচ্ছায় কোনও মহিলা দেহ পরিষেবা জোগালে, তাঁকে অপরাধী বলা যাবে না ।বিচারপতি এল নাগেশ্বর রাও, বিচারপতি বিআর গভই এবং বিচারপতি এএস বোপান্নার ডিভিশন বেঞ্চ যৌনসেবকদের জন্য কয়েকটি নির্দেশিকা জারি করেছে। এক. কর্মক্ষেত্রে যৌনকর্মীরা হেনস্তার শিকার হলে, তাঁকে সবরকম আইনি সহায়তা দিতে হবে। দুই. কোন কারণে পুলিস যখন অভিযান চালাবে তখন দেহ পরিষেবার কর্মীদের পরিচয়ের গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে। তিন. সংশ্লিষ্ট পেশার কর্মীরা জন্মগত ভাবে যে সব অধিকার পাওয়ার যোগ্য সে সম্পর্কে তাঁদের সচেতন করতে হবে। চার. এসব মহিলার সন্তান-সন্ততিদের তাঁদের থেকে আলাদা করে রাখা চলব না। পাঁচ. যৌন ব্যবসায় জড়িত শিশুকর্মীদের রেডলাইট এলাকায় আসা মানেই তারা পাচারের শিকার হয়েছে, এটাও আইনি ব্যবস্থায় গ্রাহ্য হবে না।
শীর্ষ আদালতের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে প্রয়োগ করা হলে দেশের ৯ লক্ষ যৌনকর্মী উপকৃত হবেন। পেশার সঙ্গে যুক্তকর্মীদের প্রতি সমাজের বক্রদৃষ্টি আয়তন কমবে। আইনের আয়তনিক সচেতনতা বাড়বে। বিনোদন কর্মীরাও তাঁদের অধিকার খোঁজের চেষ্টা করবেন । যে রায় এরকম সিদ্ধান্ত চালু করার নির্দেশ দেয় এবং সমাজকে আরও মানবিক হয়ে ওঠার দাবি তোলে, সে সিদ্ধান্ত কালোত্তীর্ণ। দিগদিশারি এবং প্রশ্নহীনভাবেই ঐতিহাসিক । আইনের এরকম রায়ই সমাজের প্রচলিত বিশ্বাসকে গুড়িয়ে দিয়ে নতুন অভিমুখ, নতুন দৃষ্টি ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানায়। সমাজতত্ত্বের ইতিহাসে যৌনপেশা সংক্রান্ত সুপ্রিমকোর্টের রায়টি অক্ষয় হয়ে থাকবে। ভাবিযে তুলবে বিবেক, বুদ্ধি ও যুক্তিকে।
❤ Support Us









