Advertisement
  • ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
  • মার্চ ১৪, ২০২৬

‘রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য’ উপাধিতে সম্মানিত অধ্যাপক উষারঞ্জন ভট্টাচার্য

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য’ উপাধিতে সম্মানিত অধ্যাপক উষারঞ্জন ভট্টাচার্য

রবীন্দ্রচর্চার দুর্গম-সবল পর্বতের প্রতিটা খাঁজে, খড়স্রোতা আর ক্ষীণধারার পথে, পূর্বসূরী আর সহযোদ্ধাদের চিহ্ন বুকে নিয়ে, নিরলস সাধনাগবেষণা ও সাংস্কৃতিক অনুসন্ধানের উপর ভর করে আজীবন নিরলস হেঁটে চলা। শৃঙ্গজয়ের লোভ নয়, চিন্তা আর মননের খোঁজে এ কেবল পথ চলাতেই আনন্দ। যার কাছে হাজার মণিমুক্তের গৌরবও ম্লান হয়ে যায়। প্রাপ্তিতে জুড়ে যায়, নতুন উদ্যমের সূর্য। এমনই এক বিদগ্ধ পণ্ডিত উষারঞ্জন ভট্টাচার্য। দীর্ঘ গবেষণাঅধ্যাপনা এবং সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি হিসেবে রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য’ উপাধিতে সম্মানিত হচ্ছেন তিনি। আগামী ২২ মার্চ কলকাতার টেগর রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর বার্ষিক সমাবর্তন উৎসবে তাঁকে ঘিরেই জ্বলে উঠবে হাজারো আলোর দীপ্তি।

প্রায় ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যদর্শন ও ভাবনার নানা স্তর অনুসন্ধানে ব্রতী উষারঞ্জন ভট্টাচার্যের পরিচয় বহুমাত্রিক। সর্ববৃহৎ পরিচয় নিবেদিত রবীন্দ্র-গবেষক। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনেগবেষণার অন্যতম বৈশিষ্ট্য, তিনি রবীন্দ্রনাথকে কেবল বাংলা সাহিত্যিক পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। বরং বৃহত্তর ভারতীয় সাংস্কৃতিক ভূগোলের মধ্যে খুঁজে নিয়েছেন প্রাণসখাকে। বিশেষত উত্তর-পূর্ব ভারতের জনপদে রবীন্দ্রচর্চার ইতিহাস ও প্রভাব নিয়ে অবিস্মরণীয় দলিল সাহিত্যের ইতিহাসে ধ্রুবতারাসম। সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারে তিনি বহমান ভগীরথ। তাঁর এই সম্মানপ্রাপ্তি কেবল ব্যক্তিগত কৃতিত্বের স্বীকৃতি নয়বরং এক দীর্ঘ বৌদ্ধিক সাধনার ইতিহাসের প্রতি সর্বোচ্চ নিবেদন।

উষারঞ্জন ভট্টাচার্যের জন্ম বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। পূর্ব ভারতের সাংস্কৃতিক পরিবেশে  শৈশব কাটে। ছাত্রজীবন থেকেই বাংলা সাহিত্যবিশেষত রবীন্দ্র জীবন, সাহিত্য ও দর্শনে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ, দীর্ঘকাল গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। হয়েছেন বিভাগীয় প্রধান, আর্টস ফ্যাকাল্টির ডিন। শিক্ষক হিসেবে ছাত্র বৎসল, অনুসন্ধিৎসু। আর এ সব কিছুর মাঝে নিবিড় অক্লেশে জুড়ে থেকেছেন রবীন্দ্রনাথ। গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে অসমত্রিপুরা এবং সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে কবিগুরুর স্পর্শের কথা, যোগাযোগের ইতিহাস। আবিষ্কার করেছেন, রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দর্শন ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি কেবল বাংলাতেই সীমাবদ্ধ নয়, তাঁর অভিঘাত আরও সূদূর পর্যন্ত। বহু প্রান্তিক অঞ্চলেও নতুন চিন্তার দিশা।

অনুসরণযোগ্য পথ যেখানে নেই, সেখানে একক অভিযাত্রীর মতোই, ভাবনা আর অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নিয়েছে একের পর এক গবেষণাগ্রন্থ; ‘উত্তর-পূর্ব ভারতে রবীন্দ্রচর্চা’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও অসম’ নীল-সোনালির বাণী: রবীন্দ্র-অসম সম্পর্ক’, রবীন্দ্রনাথ ও কুইনী’ এবং অন্যান্য, ‘মালবিকা চাকমার রবীন্দ্রনাথ এবং অন্যান্য’, ‘সিলেটে রবীন্দ্রনাথ ১৯১৯’ কবি-প্রণাম (সম্পাদিত) ইত্যাদি। ভিন্নমাত্রায় আবিষ্কৃত হলেন রবীন্দ্রনাথ, যেন নবারুণের নতুনতর অভ্যুদয়। ছড়িয়ে পড়ল জ্ঞানপ্রভার ছাপ, ‘শ্রীহট্ট সাহিত্য-পরিষৎ ও পত্রিকা’ এবং ‘শ্রীহট্ট-কাছাড় মনীষী মনীষা ও অনান্য’ বাংলা সাহিত্য ধারায় অন্যতম চিন্তা সংযোগন হয়ে রইল। ‘স্যিকক্যাল ইয়াফরিকা’, ‘নীল সমুদ্রের পাণ্ডুলিপি’, ‘যে যাত্রার শেষ নেই’, ‘সবুজ উপনিবেশ’ ‘উফ মশা’, ‘আর্নেস্টো চে গুয়েভারা’ ‘স্মরি বিস্ময়ে’ বাঙালি পাঠকের কাছে খুলে দিল কাছে-দূরের অনন্ত দিগন্ত।

বিপুল কাজের স্বীকৃতি এসেছে আঞ্চলিক আর জাতীয় স্তরে। টেগোর রিসার্চ ইনন্সিটিউট-প্রদত্ত দেবজ্যোতি দত্তমজুমদার স্মৃতি পুরস্কার [১৯৯৯], সাহিত্য সেতু পুরস্কার [২০০২ ], বরাক-উপত্যকা বঙ্গসাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের অচ্যুৎচরণ তত্ত্বনিধি সম্মান [২০০৫] এবং বীরেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্যের জ্ঞানপীঠ বিজয়ী অসমিয়া উপন্যাস ‘মৃত্যুঞ্জয়’ অনুবাদ করে উষারঞ্জন ভট্টাচার্য সাহিত্য অকাদেমি অনুবাদ পুরস্কার [২০০২] পান। মহীশূরের সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস তাঁকে সম্মানিত করেছে ভাষা-ভারতী সম্মানে [২০০৭]। ২০১৮ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি তাঁকে প্রদান করে প্রফেসর সুকুমার সেন স্মারক স্বর্ণপদক। এছাড়াও ২০১২ সালে তিনি যুগশঙ্খ সাহিত্য পুরস্কার’-এ সম্মানিত হয়েছেন

এবার বৌদ্ধিক কূলের বহুপ্রতীক্ষিত খেতাবে ভূষিত হবেন উষারঞ্জন ভট্টাচার্য। রবীন্দ্রতত্ত্বের ক্ষেত্রে এ সম্মান বিশেষ ধারার উত্তরাধিকার। যার সাথে জুড়ে আছে প্রবাদপ্রতিম মনীষীদের নাম। আচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার সেন, প্রমথনাশ বিশী, শিশিরকুমার দাশ, আবু সৈয়দ আইয়ূব, শঙ্খ ঘোষ, জগদীশ ভট্টাচার্য, কৃষ্ণ কৃপালনি, অ্যান্ড্রু রবিনসন, ইউলিয়ম রাদিজে, অরুণকুমার বসু, অশ্রুকুমার শিকদার প্রমুখ মান্যজনের উত্তরসূরী উষারঞ্জন।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!