- এই মুহূর্তে ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- জুলাই ৩১, ২০২৬
প্রায় দু-দশক পর কলকাতায় তসলিমা নাসরিন
প্রায় দু-দশকের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। বিতর্ক, নির্বাসন, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং অসংখ্য ব্যর্থ প্রত্যাবর্তনের চেষ্টার পরে শুক্রবার দুপুরে আবার কলকাতার মাটিতে পা রাখলেন বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। এদিন, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামতেই তাঁর মুখে ধরা পড়ল স্বস্তি আর আবেগের মিশেল। হাসিমুখে সাংবাদিকদের উদ্দেশে তাঁর সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া, ‘খুবই ভালো লাগছে।’
শুক্রবার দুপুর প্রায় ১২টা ৫০ মিনিটে কলকাতা বিমানবন্দরে পৌঁছয় তসলিমাকে নিয়ে আসা বিমান। বিমানবন্দরে তাঁর জন্য ছিল কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা। উপস্থিত ছিলেন ‘সেকুলার মিশন’ এবং ‘পশ্চিমবঙ্গের জন্য’ সংগঠনের প্রতিনিধিরা। স্বাগত জানাতে সেখানে ছিলেন সংগঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা ওসমান মল্লিক, মোহিত রায়, এনসিপি-র শিউলি সাহা ও লেখিকার বহু অনুরাগী। বিমানবন্দর থেকে দক্ষিণ কলকাতার আলিপুর সংলগ্ন একটি পাঁচতারা হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে।
তসলিমার এই সফর ঘিরে শহরের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক মহলে তৈরি হয়েছে আলাদা কৌতূহল। শনিবার রবীন্দ্র সদনে তাঁকে সংবর্ধনা জানানোর কর্মসূচি রয়েছে। ‘সেকুলার মিশন’ এবং ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাইটার্স ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে ধর্মনিরপেক্ষতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মৌলবাদের বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘ লড়াইকে সম্মান জানানো হবে। ওই অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং বিশিষ্ট সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়েরও উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। রবিবার বাংলা আকাদেমিতেও একটি সাহিত্য-আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে নাসরিনের।
কলকাতায় রওনা হওয়ার আগেই সামাজিক মাধ্যমে নিজের উচ্ছ্বাস ভাগ করে নিয়েছিলেন তসলিমা। লালপাড় সাদা শাড়ি, চোখে সানগ্লাস— বাঙালি সাজে নিজের একটি ছবি পোস্ট করে তিনি লেখেন, ‘আজি এ প্রভাতে কলিকাতা অভিমুখে যাত্রা করিলাম।’ সেই পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সমাজমাধ্যমে। একাধিক পোস্টে তিনি কলকাতাকে নিজের হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের শহর বলে উল্লেখ করেছেন। সফরের আগে এক সাক্ষাৎকারে তাঁর মন্তব্য, ‘কলকাতায় ফিরতে পারা মানে যেন নিজের দেশেই ফিরে যাওয়া।’
তসলিমার এই প্রত্যাবর্তনের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক ইতিহাস। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত ‘লজ্জা’ উপন্যাস তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। কিন্তু ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে তাঁর স্পষ্ট অবস্থান এবং লেখালেখির জেরে বাংলাদেশে ফতোয়ার মুখে পড়ে ১৯৯৪ সালে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। দীর্ঘ নির্বাসনজীবনের এক পর্যায়ে কলকাতায় এসে বসবাস শুরু করেছিলেন। বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি এবং সাহিত্যচর্চার আবহে শহরটিকেই তিনি নিজের ‘ঘর’ বলে মনে করতেন। কিন্তু ২০০৭ সালে তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘দ্বিখণ্ডিত’-কে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। কলকাতার রাজপথে বিক্ষোভ, অশান্তি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পর তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে তাঁকে শহর ছাড়তে হয়। পরে দিল্লিতে দীর্ঘমেয়াদি আবাসনের অনুমতি নিয়ে বসবাস করলেও কলকাতায় ফেরার একাধিক উদ্যোগ নিরাপত্তাজনিত কারণে ভেস্তে যায়। ফলে প্রায় উনিশ- বিশ বছর ধরে তাঁর কলকাতা-ফেরা অধরাই থেকে গিয়েছিল।
দীর্ঘ এ বিরতির পরে তাঁর ‘ফেরা’-কে কেবল সাহিত্যিক সফর হিসেবে দেখছেন না অনেকেই। সাহিত্য, সংস্কৃতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনীতির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে তসলিমার কলকাতায় ফেরা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাংস্কৃতিক মহলের একাংশের মতে, লেখিকার এ সফর এক অর্থে ইতিহাসের অসমাপ্ত অধ্যায়ের নতুন পর্ব। তবে তসলিমা নিজে আপাতত রাজনীতি নয়, আবেগের কথাই বলতে চাইছেন। বিমানবন্দরে নেমে তাঁর সংক্ষিপ্ত মন্তব্যেই যেন ধরা পড়েছে সে অনুভূতি— বহু প্রতীক্ষার পর অবশেষে আবার কলকাতা, সেই শহর, যাকে তিনি বহুবার নিজের সবচেয়ে প্রিয় আশ্রয় বলে বর্ণনা করেছেন।
❤ Support Us






