Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • মে ৩০, ২০২৬

প্রাথমিকে কর্মরত শিক্ষকদেরও টেট বাধ্যতামূলকই, শীর্ষ আদালতের রায়ে অনিশ্চিত লক্ষাধিক শিক্ষকের চাকরি

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
প্রাথমিকে কর্মরত শিক্ষকদেরও টেট বাধ্যতামূলকই, শীর্ষ আদালতের রায়ে অনিশ্চিত লক্ষাধিক শিক্ষকের চাকরি

প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি রক্ষার চেয়ে শিশুদের শিক্ষার মান রক্ষা করা অনেকবেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই স্পষ্ট বার্তা দিয়ে  কর্মরত  প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য টিচার এলিজিবিলিটি টেস্ট (টেট) বাধ্যতামূলক বলে জানিয়ে দিল সুপ্রিম কোর্ট। তবে এক ধাপ স্বস্তি দিয়ে টেট উত্তীর্ণ হওয়ার সময়সীমা এক বছর বাড়িয়ে ২০২৮ সালের ৩১ অগস্ট পর্যন্ত করেছে শীর্ষ আদালত। ফলে শিক্ষার অধিকার (আরটিই) আইন কার্যকর হওয়ার আগেই যাঁরা প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানোর জন্য নিয়োগ পেয়েছিলেনতাঁদেরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টেট পাশ করতেই হবে। তা না হলে চাকরি থাকবে না।

শুক্রবার, শীর্ষ আদালতে বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত  বিচারপতি মনমোহনের বেঞ্চ প্রায় ৭০টি পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করে ১৭ পাতার রায়ে জানিয়ে দেয়টেট কেবল একটি প্রশাসনিক যোগ্যতার মানদণ্ড নয়বরং সংবিধানের ২১এ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত শিশুদের গুণগত শিক্ষার অধিকারের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। আদালতের পর্যবেক্ষণ, ‘শিক্ষকদের চাকরি শিশুদের শিক্ষাগত ভবিষ্যতের বিনিময়ে হতে পারে না।’ সে কারণেই ২০২৫ সালের ঐতিহাসিক রায়ে নির্ধারিত নীতিগত অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো কারণ তাঁরা খুঁজে পায়নি।

গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর অঞ্জুমান ইশাআত-ই-তালিম ট্রাস্ট বনাম মহারাষ্ট্র সরকার’ মামলায় ১১০ পাতার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করেছিলসহায়তাপ্রাপ্ত হোক বা অসহায়তাপ্রাপ্ত— সব ধরনের সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও ‘শিক্ষার অধিকার আইন প্রযোজ্য। একই সঙ্গে আদালত বলেছিল, ‘আরটিই আইন কার্যকর হওয়ার আগে নিয়োগপ্রাপ্ত  অবসরের আগে যাঁদের পাঁচ বছরের বেশি চাকরি বাকি রয়েছেতাঁদের ২০২৭ সালের ৩১ অগস্টের মধ্যে টেট পাশ করতে হবে। অন্যথায় তাঁরা আর চাকরিতে বহাল থাকতে পারবেন না। পাশাপাশিচাকরির মেয়াদ যতই অবশিষ্ট থাকুক না কেনপদোন্নতি পেতে চাওয়া যে কোনো শিক্ষককেই টেট উত্তীর্ণ হতে হবে।

এ রায়ের পরই বিভিন্ন রাজ্য সরকারশিক্ষক সংগঠন এবং পৃথক শিক্ষকদের পক্ষ থেকে প্রায় ৭০টি পুনর্বিবেচনার আবেদন দায়ের করা হয়। আবেদনকারীদের দাবি ছিলদীর্ঘদিন ধরে কর্মরত বহু শিক্ষক নিয়োগের সময় প্রচলিত সমস্ত নিয়ম মেনেই চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। সে সময়ে টেট পাশের কোনও বাধ্যবাধকতা ছিল না। এখন তাঁদের উপর নতুন শর্ত চাপিয়ে দেওয়া অন্যায্য। পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক শিক্ষক টেট উত্তীর্ণ হতে না পারলে স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক সঙ্কট দেখা দিতে পারে  তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ছাত্রছাত্রীদের উপরও। কিন্তু  যুক্তি গ্রহণ করেনি শীর্ষ আদালত। বেঞ্চের মতে, ‘আরটিই আইন কার্যকর হওয়ার পর ইতিমধ্যেই দেড় দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। ২০১৭ সালের সংশোধনী আইনের পরও প্রায় এক দশক কেটে গিয়েছে। টেটের মতো ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জনের জন্য এ সময় যথেষ্টেরও বেশি।

২০২৫ সালের মূল রায়ে আদালত সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে অতিরিক্ত দুবছর সময় দিয়েছিল। পুনর্বিবেচনার আবেদনের শুনানিতে সময়সীমা আরও এক বছর বাড়িয়ে ২০২৮ সালের ৩১ অগস্ট করা হয়েছে। আদালতের বক্তব্যএটিই শিক্ষকদের জন্য দেওয়া রিলিফ’ বা স্বস্তি। তবে তার বেশি ছাড় দেওয়া সম্ভব নয়। রায়ে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেপাঁচ বছরের বেশি চাকরি বাকি রয়েছে এমন সমস্ত কর্মরত প্রাথমিক শিক্ষকের জন্য টেট পাশ ন্যূনতম যোগ্যতা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই যোগ্যতা অর্জন করতে না পারলে চাকরি হারাতে হবে। অন্য দিকেযাঁদের চাকরির মেয়াদ পাঁচ বছরের কমতাঁদের ক্ষেত্রে চাকরিতে বহাল থাকার শর্ত হিসেবে টেট বাধ্যতামূলক না হলেও পদোন্নতির জন্য টেট পাশ আবশ্যিক থাকবে।

শীর্ষ আদালত আরও জানিয়েছেকোনো বিজ্ঞপ্তি বা অধস্তন আইন মূল আইনের ঊর্ধ্বে হতে পারে না। পুনর্বিবেচনার আবেদনকারীরা ২০১০ সালের ২৩ অগস্ট ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর টিচার এডুকেশন (এনসিটিই)-এর একটি বিজ্ঞপ্তির উল্লেখ করে দাবি করেছিলেনওই বিজ্ঞপ্তিতে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণির জন্য আগে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের টেটের শর্ত থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আদালতের বক্তব্যযদি কোনো ধরনের ছাড় থেকেও থাকেতা মূল আইনের উদ্দেশ্যকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। রায়ে আরও বলা হয়েছে২০০৯ সালের আরটিই আইনের কর্মরত শিক্ষকদেরও নির্ধারিত ন্যূনতম যোগ্যতার আওতায় আনার পরিকল্পনা ছিল। ২০১৭ সালের সংশোধনী সে আইনগত কাঠামোকে আরও সুদৃঢ় করেছে মাত্র। আদালতের মতেএখানে কোনো পূর্বপ্রযোজ্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অতীতের নিয়োগ বাতিল করা হয়নি কিংবা কাউকে তাৎক্ষণিক ভাবে অযোগ্যও ঘোষণা করা হয়নি। বরং বিদ্যমান শিক্ষকদের পর্যাপ্ত সময় দিয়ে ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, পুনর্বিবেচনার আবেদনকারীদের অন্যতম যুক্তি ছিল২০১০ সালের ১ এপ্রিল কার্যকর হওয়া শিক্ষার অধিকার আইন এবং ২০১৭ সালের সংশোধনী আইনকে তার আগের নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের উপর প্রয়োগ করা যায় না। কিন্তু আদালত জানিয়ে দিয়েছেআইনের উদ্দেশ্য অতীতের নিয়োগকে বাতিল করা নয়বরং প্রাথমিক শিক্ষার মান বজায় রাখতে সময়সীমাবদ্ধ উপায়ে ন্যূনতম যোগ্যতা নিশ্চিত করা। সুপ্রিম এই রায়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে পশ্চিমবঙ্গে। শিক্ষা মহলের একাংশের আশঙ্কারাজ্যের লক্ষাধিক কর্মরত প্রাথমিক শিক্ষক এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়বেন। সারা দেশে প্রভাব পড়তে পারে প্রায় ৩০ লক্ষ শিক্ষকের উপর।

এই মামলায় পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষকদের স্বার্থে সংযুক্ত হয়েছিল ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্রেইনড টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন (ওল্ড)। সংগঠনের অধিকাংশ সদস্যই ২০১০ সালের আগে নিয়োগপ্রাপ্ত। তাঁদের দাবিতৎকালীন সমস্ত নিয়ম মেনেই তাঁরা চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। পিটিটিআইদুবছরের ডিপ্লোমা ইন এলিমেন্টারি এডুকেশন কোর্স এবং উচ্চমাধ্যমিকে ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নম্বরের মতো শর্ত পূরণ করেই নিয়োগ পেয়েছিলেন তাঁরা। ফলে নতুন করে টেট বাধ্যতামূলক করা ন্যায়সঙ্গত নয়। রায় ঘোষণার পর সংগঠনের সভাপতি অশোক রুদ্র প্রশ্ন তোলেন, ‘যে সময়ে আইনই ছিল নাসে সময়ে যাঁরা চাকরি পেয়েছেনতাঁদের উপর কোন যুক্তিতে পরবর্তী আইন কার্যকর করা হচ্ছেবিধানসভা নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান মধ্যপন্থার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কেন্দ্র চাইলে অধ্যাদেশ এনে সুপ্রিম কোর্টে কর্মরত টেটহীন লক্ষাধিক শিক্ষকের পক্ষে সওয়াল করতে পারত। তা করা হল না কেন?’

তবে শিক্ষকদের এ উদ্বেগকে গুরুত্ব দিলেও শীর্ষ আদালত শেষ পর্যন্ত অবস্থান বদলায়নি। রায়ের শেষাংশে বিচারপতিরা লিখেছেনপুনর্বিবেচনার আবেদনকারী শিক্ষকদের প্রতি তাঁদের সহানুভূতি রয়েছে, তাঁরা যে বাস্তব সমস্যার কথা তুলে ধরেছেনতা আদালত উপলব্ধি করছে। কিন্তু সম্ভাব্য অনিশ্চয়তা বা নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা কোনো রায় পুনর্বিবেচনার যথেষ্ট কারণ হতে পারে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার মান রক্ষাই এই ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ফলে স্পষ্ট, অতিরিক্ত সময় পেলেও টেট থেকে রেহাই মিলছে না কর্মরত শিক্ষকদের


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!