- দে । শ
- মে ৩০, ২০২৬
হামলার ক্ষত শুকায়নি এখনো, আতঙ্ক আর আশার সন্ধিক্ষণে পহেলগাঁও
এক বছর আগে এ সময় পহেলগাঁওয়ের নাম উচ্চারিত হয়েছিল আতঙ্কের অভিঘাতে। সবুজ তৃণভূমি, পাইনবনে মোড়া উপত্যকা আর বরফঢাকা পাহাড়ের জন্য পরিচিত কাশ্মীরের এই পাহাড়ি জনপদ রাতারাতি পরিণত হয়েছিল শোকের প্রতীকে। বাইসারণ উপত্যকায় জঙ্গি হামলায় ২৬ জন পর্যটকের মৃত্যু কাঁপিয়ে দিয়েছিল গোটা দেশকে। টেলিভিশনের পর্দায় বারবার ভেসে উঠেছিল গুলিবিদ্ধ মানুষের আর্তনাদ, আতঙ্কে ছুটে পালানো পর্যটকদের ছবি। তার পর কেটে গিয়েছে এক বছর। তবু পহেলগাঁওয়ের রাস্তাঘাট, বাজার, হোটেল কিংবা ঘোড়সওয়ারদের চোখেমুখে এখনো রয়ে গিয়েছে ভয়ংকর সেই দিনের ছায়া।
তবু জীবন থেমে থাকে না। ধীরে ধীরে ফিরছেন পর্যটকেরা। লিডার নদীর কলকল ধ্বনি, বেটাব ভ্যালির সবুজ ঢাল, চন্দনওয়াড়ির বরফগলা জল আর আরু উপত্যকার নিস্তব্ধতা আবার টানছে ভ্রমণপিপাসুদের। যদিও স্থানীয়দের কথায়, ‘মানুষ ফিরছেন ঠিকই, কিন্তু আগের সেই নির্ভার আনন্দ এখনো ফেরেনি। চাপা আতঙ্ক এখনো রয়ে গিয়েছে পর্যটকদের মনে।’ শ্রীনগর থেকে পহেলগাঁওয়ের দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সড়কপথে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার যাত্রা। পথের দু–ধারে আপেলবাগান, চিনার গাছ, দূরে তুষারাবৃত পর্বতশ্রেণি— প্রকৃতি নিজেই সাজিয়ে রেখেছে স্বর্গীয় চিত্রপট। পথে পড়ে পাম্পোর, জাফরানের জন্য বিখ্যাত। পড়ে সঙ্গম, যেখানে উইলো কাঠের স্তূপ দূর থেকে দেখতে ছোটো ছোটো কুটিরের মতো।
এই মনোরম পথ গত এক বছরে বহু পর্যটকের কাছে ভয় আর সংশয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল বাইসারণ উপত্যকায় জঙ্গি হামলার খবর পৌঁছতেই জম্মু-কাশ্মীর জুড়ে নেমে এসেছিল আতঙ্ক। স্থানীয় গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আহমদ শাহ এখনো সে দিনের কথা ভুলতে পারেন না। ‘দুপুরে পাহাড়ের দিক থেকে গুলির শব্দ শুনেছিলাম। আমরা সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পেরেছিলাম বড়ো কিছু ঘটেছে। তখনই বাইসারণের দিকে ছুটে যাই। পাশাপাশি আরু, বেটাব আর চন্দনওয়াড়ির মতো পর্যটনকেন্দ্র থেকেও মানুষকে সরানোর চেষ্টা করি। এমন দিন আর কখনো দেখতে চাই না’— বলছিলেন তিনি। স্থানীয়দের দাবি, জঙ্গিবাদের অন্ধকার সময়ে কাশ্মীরের বহু অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পাহেলগাঁও বরাবরই তুলনামূলক নিরাপদ বলে বিবেচিত হতো। সে বিশ্বাসেই ধাক্কা দিয়েছে গত বছরের হামলা।
জঙ্গি হামলার সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব প্রভাব পড়েছে কাশ্মীরের পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে। পহেলগাঁওয়ে এক সময় পর্যটকদের ভিড়ে হাঁটাচলাই কঠিন হয়ে উঠত, সেখানে গত বছরের বেশ কয়েক মাস অদ্ভূত নীরবতা। স্থানীয়রা বলছেন, ‘এ সময়টায় আগে তিল ধারণের জায়গা থাকত না। গত বছর বাজার প্রায় ফাঁকা ছিল। তবে এ বছর আবার কিছুটা ভিড় দেখা যাচ্ছে। সেটাই আশা জাগাচ্ছে।’ তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও আতঙ্ক পুরোপুরি কাটেনি। বাইসারণ এখনো বন্ধ। নিরাপত্তার কারণে কয়েকটি ট্রেকিং রুটেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে পর্যটকেরা আসছেন, ঘুরছেন, ছবি তুলছেন, কিন্তু অনেকেই এ অঞ্চলে রাত কাটাতে চাইছেন না। ‘পাহেলগাঁও হোটেলস অ্যান্ড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর সভাপতি জাভেদ বুর্জার বলেন, ‘হোটেলগুলিতে এখন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ভর্তি হচ্ছে। আগের তুলনায় অনেক কম। আমরা ঘরের ভাড়াও কমিয়েছি। কিন্তু মানুষের মনে যে ভয় তৈরি হয়েছে, সেটা কাটতে সময় লাগবে।’
অভিঘাত স্পষ্ট ব্যবসায়ও। কাশ্মীরি হস্তশিল্প ব্যবসায়ী লতিফ আহমদ জানান, আগে এ সময় পর্যটকদের ভিড়ে দোকানে পা ফেলার জায়গা থাকত না। এখন মানুষ আসে, দেখে, ছবি তোলে, কিন্তু কেনাকাটা আগের মতো আর হয় না। একই ছবি রেস্তরাঁ ব্যবসাতেও। স্থানীয় রেস্তরাঁ-মালিক হিলাল আহমদের জানিয়েছেন, ‘এক সময়ে দিনে ৩৫-৫০ হাজার টাকা বিক্রি হতো। এখন অনেক দিনই ৫-৮ হাজার টাকার মধ্যেই বেচাকেনা সীমাবদ্ধ থাকে।’ তবে, পরিস্থিতির সবচেয়ে কঠিন আঘাত নেমেছে ঘোড়সওয়ার ও পোনিওয়ালাদের (টাট্টু ঘোড়া চালক) উপর। এ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ তৃণভূমি আর দুর্গম পথ ঘুরে দেখার জন্য বহু পর্যটক তাঁদের উপর নির্ভর করেন। হামলার দিন উদ্ধারকাজেও তাঁরা প্রথম সারিতে ছিলেন। তবু সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে তাঁদেরই। পোনিওয়ালা শাবির মালিকের আক্ষেপ, ‘হামলার পরে ছ–মাস ধরে আমাদের দিনে দু-বার করে থানায় হাজিরা দিতে হয়েছে। এক পর্যটক মজা করে বলেছিলেন, ‘আমাকে কোথাও নিয়ে গিয়ে গুলি করবেন না তো?’ শুনে খারাপ লেগেছিল। আমরা তো শুধু আমাদের কাজটাই করি।’
তবে এই অন্ধকার সময়ের মধ্যেও রয়েছে অন্য গল্প। স্থানীয়দের আতিথেয়তা, আন্তরিকতা আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা অনেক পর্যটকের ধারণা বদলে দিয়েছে। মুম্বইয়ের এক তরুণী পর্যটক বলছিলেন, ‘বন্ধুরা মজা করে বলছিল, কাশ্মীরে গেলে সাবধানে থাকতে। আমিও কিছুটা ভয় নিয়েই এসেছিলাম। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম, সবাই অত্যন্ত আন্তরিক। এতে ‘আমরা’ আর ‘ওরা’— এই বিভাজনের ধারণাটাই বদলে গিয়েছে।’ রাজ্যের পরিসংখ্যানও জানাচ্ছে, ধীরে ধীরে ফিরছে আস্থা। কাশ্মীর প্রশাসনের দাবি, উপত্যকার অধিকাংশ পর্যটনকেন্দ্রে আবার ভিড় বাড়ছে। যদিও পাহেলগাঁওয়ে গতি এখনো ধীর। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত এখানে পর্যটকের সংখ্যা প্রায় আড়াই লক্ষ। হামলার আগে একই সময়ে সেই সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে চার লক্ষ।
❤ Support Us





