- এই মুহূর্তে দে । শ
- অক্টোবর ৯, ২০২৫
রাজ্যজুড়ে ভর্তি প্রক্রিয়ার সংকট ! স্নাতকস্তরে ৭০ শতাংশের বেশি আসন খালি সরকারি কলেজে, দুশোরও বেশি আসন ফাঁকা রাজ্যের একমাত্র কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে
কলজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভরতির মরশুম শেষের পথে। অথচ রাজ্যের সরকারি ও সরকার পোষিত কলেজগুলিতে অনার্স স্তরে ছাত্রভর্তি কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। ভর্তির দুটি দফা শেষ হলেও এখনো খালি পড়ে রয়েছে ৭০ শতাংশেরও বেশি আসন। উচ্চশিক্ষার এই হতশ্রী ছবিতে উদ্বিগ্ন শিক্ষামহল। বিশ্বভারতীর মতো কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানেও খালি পড়ে রয়েছে ২০০-রও বেশি আসন। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে বহু বিভাগে পড়ুয়া আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। আর তাতেই উদ্বিগ্ন আশ্রমিক থেকে প্রাক্তনী, শিক্ষাবিদ থেকে প্রশাসনের একাংশ।
বিশ্বভারতী সূত্রে জানা গিয়েছে, সেখানে চলতি শিক্ষাবর্ষে স্নাতক স্তরে মোট আসন ছিল প্রায় ১,৭৪০, এবং স্নাতকোত্তর স্তরে প্রায় ৬০০। অথচ হিন্দি ভবনে এখনও ২০টি আসন খালি পড়ে রয়েছে। সংস্কৃত বিভাগে ২৮টি, ওড়িয়া বিভাগে ১৫টি, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব বিভাগে ৪৫টি, অর্থনীতি বিভাগে ১৫টি, দর্শনে ৩১টি আসনে কেউ ভর্তি হয়নি। স্নাতকোত্তর স্তরের পাঁচ বছর মেয়াদি সমন্বিত বিজ্ঞান বিভাগে ১২টি, যোগ বিভাগে ২৫টি এবং এম.এড কোর্সে ২৭টি আসন ফাঁকা। এমনকি বিশ্বভারতীর অন্যতম ঐতিহ্য, সঙ্গীত ভবনেও পর্যাপ্ত পড়ুয়া মেলেনি। চিনা ও জাপানি ভাষার কোর্সেও একই ছবি। একটা সময় ছিল, যখন বিশ্বভারতীতে ভর্তি হওয়া মানে গর্ব, সম্মান ও সুযোগ। একুশ শতকের প্রথম দুই দশকেও দেশ-বিদেশ থেকে ছাত্রছাত্রীরা শান্তিনিকেতনের দিকে ছুটে আসত। আজ সেখানে শূন্য ক্লাসরুম, নীরব ভবন। বিশ্বভারতীর প্রবীণ আশ্রমিক অপর্ণা দাস মহাপাত্র বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এক দর্শনের প্রতীক। রবীন্দ্রনাথ যে চেতনার আলোয় এই আশ্রম গড়ে তুলেছিলেন, আজ সেই আলো যেন ম্লান হয়ে এসেছে। ছাত্রছাত্রীর অনাগ্রহ শুধু সংখ্যা নয়, এটা দেশের সাংস্কৃতিক পরিসরের হতাশার প্রতিচ্ছবি।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত জনসংযোগ আধিকারিক অতিগ ঘোষ অবশ্য জানান, বিভিন্ন কারণে আসন শূন্য রয়েছে ঠিকই, তবে নতুন করে ভর্তি প্রক্রিয়ায় জোর দেওয়া হচ্ছে। অধ্যক্ষ ও বিভাগীয় প্রধানদের বলা হয়েছে যাতে তাঁরা সক্রিয়ভাবে পড়ুয়া আকর্ষণের উদ্যোগ নেন। তাঁর মতে, এখন বহু পড়ুয়া মূলধারার বাইরের বিকল্প শিক্ষার দিকে ঝুঁকছে। সেটা বিশ্বভারতী নয়, দেশের সব জায়গায়ই দেখা যাচ্ছে।
তবে শিক্ষাবিদদের একাংশ বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁদের মতে, জাতীয় র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বভারতীর ধারাবাহিক পতনই ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ কমার বড়ো কারণ। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউশনাল র্যাঙ্কিং ফ্রেমওয়ার্ক-এ গত কয়েক বছরে বিশ্বভারতীর স্থান ক্রমাগত নীচে নেমেছে। তাতে পড়ুয়াদের মধ্যে এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আগ্রহে ভাঁটা পড়েছে। সেই সঙ্গে বারবার প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা, কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ, পড়ুয়া-শিক্ষক সম্পর্কের টানাপড়েন এবং সৃজনশীল শিক্ষার জায়গায় নিয়ন্ত্রণমূলক মনোভাব— সব মিলিয়ে বিশ্বভারতীর আবেদন হারাচ্ছে বলেই মত অনেকের। বিশ্বভারতীর প্রাক্তনীদের অনেকেই এ নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভও জানিয়েছেন। কারও মতে, শুধু ইউনেস্কোর তকমা থাকলেই চলে না, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত মজবুত করতে হয় শিক্ষার গুণমান দিয়ে। রবীন্দ্রনাথের বিশ্ববিদ্যালয় যে শিকড়ে সংস্কৃতি, মনন ও মুক্তচিন্তার অনুশীলন— আজ সেই শিকড়েই ফাটল। প্রশাসনের মনোভাব, পাঠক্রমের অপ্রাসঙ্গিকতা এবং অব্যবস্থাপনা, সব মিলিয়ে ছাত্রছাত্রীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে শান্তিনিকেতন থেকে। উল্লেখ্য, সংস্কৃত ভাষার প্রসারে ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার খরচ করেছে প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকা। অথচ, বিশ্বভারতীর সংস্কৃত বিভাগেই পড়ুয়ার অভাবে আসন খালি পড়ে আছে। একই ছবি দেখা যাচ্ছে দর্শন, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের মতো শাখায়ও। প্রশ্ন উঠছে, খরচ তো হচ্ছে, কিন্তু শিক্ষার আসল প্রসারে কি আদৌ কাজ হচ্ছে? বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ অবশ্য আশাবাদী। এখনও কিছু দফায় ভর্তি প্রক্রিয়া চালু আছে। দুর্গাপুজোর পর ভর্তি বাড়তে পারে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ। তবে শুধু দেরিতে ভর্তি শুরু করে বা ছাত্র ধরার উদ্যোগে সমস্যার মূলে হাত দেওয়া যাবে না বলেই মত শিক্ষা মহলের।
তবে শিক্ষাবিদদের একাংশ বলছেন, বিশ্বভারতীর এই সংকট নিছক বিশ্ববিদ্যালয়ের একক সমস্যা নয়— এটি একটি সাংস্কৃতিক, মননশীল ও নীতিগত অবক্ষয়ের প্রতীক। পাশাপাশি পড়ুয়াদের একটা বড়ো অংশ এখন প্রযুক্তিনির্ভর বা পেশাভিত্তিক শিক্ষার দিকে ঝুঁকছে। বাংলা, ইতিহাস, দর্শনের মতো বিষয়গুলির প্রতি আগ্রহ কমছে।সরকারি চাকরি পরীক্ষা না হওয়া, দুর্নীতি, অনিশ্চয়তা, গবেষণা ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযোগীতা ইত্যাদি নানা কারণ রয়েছে সাধারণ অনার্স বিষয় থেকে ছাত্রছাত্রীদের মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার পেছনে। বুনিয়াদী শিক্ষা কি তবে নিঃশব্দে নিজের ভিত্তি হারাচ্ছে? আর তার প্রথম ঝাপটা লেগেছে শান্তিনিকেতনের আঙিনায়? লেডি ব্রাবোর্ন কলেজের অধ্যক্ষা সিউলি সরকার বলেন, ‘ইকনমিক্স, স্ট্যাটিস্টিক্সের মতো বিষয়েও অনেক আসন ফাঁকা পড়ে রয়েছে। এর আগে এমনটা দেখিনি। ভর্তি প্রক্রিয়ায় দেরি, ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে বিভ্রান্তি এবং পোর্টালের জটিলতা অনেককেই অন্যত্র পাড়ি দিতে বাধ্য করেছে।’ রাজ্যের সরকারি ও সরকার পোষিত প্রায় সব কলেজগুলিতে ছাত্রভর্তি প্রক্রিয়া তথৈবচ। উচ্চশিক্ষা দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যে অনার্স স্তরের আসন সংখ্যা ৯ লক্ষ ৩৬ হাজারের কাছাকাছি। কিন্তু কেন্দ্রীয় অনলাইন পোর্টালে নাম নথিভুক্ত করেছেন মাত্র ৪ লক্ষ ২১ হাজারের সামান্য বেশি ছাত্রছাত্রী। তার মধ্যে ভর্তি হয়েছেন মাত্র ২ লক্ষ ৬৯ হাজার ৭৭৭ জন। অর্থাৎ ভর্তি হার ৩০ শতাংশেরও নিচে। গত বছর এই সময়ে ভর্তি হয়েছিল প্রায় ৪ লক্ষ ৪৪ হাজার পড়ুয়া। তুলনায় এ বছর সে সংখ্যা এক ধাক্কায় নেমে এসেছে প্রায় ১.৭৪ লক্ষে। একই অবস্থা যাদবপুর, প্রেসিডেন্সির মতো সনামধণ্য প্রতিষ্ঠানেও। বেশ কয়েকটি বিভাগে বহু আসন ফাঁকা পড়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। শুধু কারিগরি অসুবিধাই নয়, গোটা ব্যবস্থার ওপর আঙুল তুলেছেন পশ্চিমবঙ্গ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সদস্য শুভদয় দাশগুপ্ত। তাঁর অভিযোগ, ‘কেন্দ্র ও রাজ্য দুই সরকারই এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার ফলে সরকারি কলেজগুলিতে মানুষের আস্থা ধাক্কা খেয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা, পরিকাঠামোগত দুর্বলতা, নিরাপত্তাহীনতা, সব মিলিয়ে সরকারি কলেজ থেকে মুখ ফিরিয়েছেন অনেকেই।’ তিনি মনে করিয়ে দেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে ড্রপআউট বেড়েছে, বেকারত্বও তুঙ্গে। তার উপর কলেজে ভর্তি নিয়ে বিভ্রান্তি পড়ুয়াদের আরও হতাশ করেছে। প্রসঙ্গত, রাজ্য সরকারের ওবিসি তালিকা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের রায় ও পরবর্তী সুপ্রিম কোর্টের স্থগিতাদেশের জেরে, প্রায় আগস্টের শেষ থেকে শুরু হয় ভর্তি। তত দিনে বহু ছাত্রছাত্রী বেসরকারি কলেজ বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে যান।
❤ Support Us







