- দে । শ
- জানুয়ারি ১৯, ২০২৬
শিক্ষাঙ্গনেও নিয়মিত নিতে হবে মনের খবর, খসড়া নীতিতে সিলমোহর ইউজিসি
দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে আত্মঘাতী প্রবণতা, হতাশা, মানসিক সমস্যা। এবার পড়ুয়াদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপের পথে ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন (ইউজিসি)। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুসরণ করে ইউজিসি একটি খসড়া ‘ইউনিফর্ম পলিসি অন মেন্টাল হেল্থ অ্যান্ড ওয়েল-বিয়িং ফর হায়ার এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশনস’ প্রকাশ করেছে। এই নীতির আওতায় দেশের প্রতিটি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক ভাবে মানসিক স্বাস্থ্য ও কল্যাণ কেন্দ্র, ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন, প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর, সহযোগিতা ব্যবস্থা এবং নজরদারি কমিটি গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। খসড়া নীতির উপর জনমত নেওয়া হবে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত।
ইউজিসির খসড়া অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে একটি পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্য ও কল্যাণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। সেখানে গোপনীয়তার সঙ্গে পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে। বহৎ প্রতিষ্ঠানে প্রতি ৫০০ জন পড়ুয়ার জন্য অন্তত একজন করে কাউন্সেলর নিয়োগ বা দায়িত্বপ্রাপ্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি পড়ুয়াদের মধ্য থেকেই প্রশিক্ষিত ‘পিয়ার সাপোর্টার’ বেছে নেওয়া হবে, প্রতি ১০০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন করে, যারা মানসিক অবসাদের প্রাথমিক লক্ষণ চিহ্নিত করতে সাহায্য করবেন। খসড়া নীতিতে আরো বলা হয়েছে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একটি মানসিক স্বাস্থ্য ও কল্যাণ নজরদারি কমিটি গঠন করা বাধ্যতামূলক। কমিটির সদস্যদের নাম, পদবি ও যোগাযোগের তথ্য প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি ক্যাম্পাস জুড়ে এবং ডিজিটাল মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও হেল্পলাইনের নম্বর প্রদর্শন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইউজিসির এ উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ। ‘সুখদেব সাহা বনাম অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য’ মামলায় ২০২৫ সালের জুলাই মাসে শীর্ষ আদালত ছাত্র আত্মহত্যার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। শিক্ষাজনিত চাপ, প্রতিযোগিতা আর পর্যাপ্ত মানসিক সহায়তার অভাবকে সামনে রেখে আদালত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য একটি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কাঠামো তৈরির নির্দেশ দেয়। সে নির্দেশের ভিত্তিতেই ইউজিসি এই নীতি প্রণয়ন করেছে। নীতির খসড়ায় পরিসংখ্যান তুলে ধরে সমস্যার গভীরতাও দেখানো হয়েছে। ভারতে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জন মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যায় ভোগেন। ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সি যুবকদের মধ্যে ৭.৩ শতাংশ গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত। জাতীয় অপরাধ নথি ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে যত আত্মহত্যা হয়, তার ৭.৬ শতাংশই ঘটে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে।
ইউজিসির উদ্যোগকে ঘিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া মিলেছে শিক্ষামহলে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক রাজীব কুমারের মতে, ইউজিসির নির্দেশিকা বাস্তবে খুব একটা কার্যকর হবে না। তাঁর বক্তব্য, ‘এগুলি অনেকটাই আনুষ্ঠানিক। শিক্ষাক্ষেত্রে মানসিক সমস্যার সূক্ষ্ম দিকগুলি ইউজিসির আমলারা বোঝেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পড়ুয়াদের মানসিক সমস্যার মূলে থাকে অ্যাকাডেমিক ব্যর্থতা, ভবিষ্যত জীবনের অনিশ্চয়তা। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষক বা কোর্স ইনস্ট্রাক্টরের নজরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ অন্যদিকে, আইআইটি কানপুরের প্রাক্তনী ও বৈচিত্র্য অধিকার কর্মী ধীরাজ সিং এই নীতিকে ‘বহুদিনের প্রতীক্ষিত পদক্ষেপ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘এতদিনে সঠিক কাঠামো তৈরি করেছে। তবে আসল পরীক্ষাটা হবে বাস্তবায়নে। স্বাধীন নজরদারি ও নিয়ম না মানলে শাস্তির ব্যবস্থা না থাকলে এ নীতি কাগজেই রয়ে যাবে।’ আইনজীবী রবি ভরদ্বাজও এই উদ্যোগকে ঐতিহাসিক বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, ‘মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তাকে ঐচ্ছিক বিষয় থেকে বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বে পরিণত করা হয়েছে। এর ফলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির ‘ডিউটি অফ কেয়ার’ আইনি ভাবে আরো স্পষ্ট হলো।’
খসড়া নীতিতে বলা হয়েছে, ইউজিসি নিজে একটি বিশেষ পোর্টাল, ‘মানস সেতু’-এর মাধ্যমে সমস্ত প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি নজরদারি করবে। বার্ষিক রিপোর্ট, পড়ুয়াদের প্রতিক্রিয়া এবং পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা হবে, এ ব্যবস্থার ফলে আদৌ মানসিক সুস্থতা বাড়ছে কি না, কমছে কি না ছাত্র আত্মহত্যা ও পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা। ইউজিসির নয়া খসড়া নীতি উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যকে মূল স্রোতে নিয়ে আসার এক গুরুত্বপূর্ণ চেষ্টা। তব, এ উদ্যোগ কেবল নীতির পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, না কি বাস্তবে পড়ুয়াদের জীবনে স্বস্তি এনে দেবে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনে এর কার্যকরী প্রয়োগের উপরই।
❤ Support Us






