- বি। দে । শ
- মে ২৫, ২০২৬
ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের প্রশ্নই নেই, অন্য শর্ত না-মানলে শান্তিচুক্তিও নয়, আমেরিকার উপর চাপ বাড়াল ইরান
পশ্চিম এশিয়ায় শান্তির সম্ভাবনা ঘিরে যত জল্পনা বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে— আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে দূরত্ব এখনো অনেকটাই। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, দুই দেশের মধ্যে শান্তিচুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। অন্য দিকে, তেহরান জানিয়ে দিল, একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ না-হলে কোনো ভাবেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে চূড়ান্ত বোঝাপড়ায় যাবে না তারা। ফলে পশ্চিম এশিয়ার অস্থির পরিস্থিতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ইরানের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতির পরিবেশ তৈরির সময় আমেরিকা আশ্বাস দিয়েছিল যে, দীর্ঘ দিন ধরে বাজেয়াপ্ত করে রাখা ইরানের সম্পদ ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। আর সে কারণেই ওয়াশিংটনের কথায় আস্থা রাখতে পারছে না তেহরান। ইরানের সংবাদসংস্থা-র দাবি, আমেরিকার ‘বার বার অবস্থান বদল’ নিয়েই ক্ষুব্ধ ইরান। তাই স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, বাজেয়াপ্ত সম্পদ ফেরত না-পেলে কোনো চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির পথে হাঁটবে না ইসলামিক প্রজাতন্ত্র।
তেহরানের দৃঢ় অবস্থানের কথা পাকিস্তান-সহ বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী দেশকেও জানানো হয়েছে বলে দাবি ইরানি সংবাদমাধ্যমের। সম্প্রতি ইসলামাবাদে দু–দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে দফায় দফায় আলোচনা হলেও এ পর্যন্ত কোনও সমাধানসূত্র মেলেনি। এমনকি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনীর-ও সম্প্রতি তেহরানে গিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছেন। কিন্তু তাতেও অচলাবস্থা কাটেনি।এ আবহেই শনিবার আচমকা আশাবাদী সুর শোনা গিয়েছিল ট্রাম্পের গলায়। তিনি দাবি করেছিলেন, আমেরিকা–ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তি কার্যত চূড়ান্ত। শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা। তিনি বলেন, ‘চুক্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা চলছে। শীঘ্রই ঘোষণা করা হবে।’ শুধু তা-ই নয়, ট্রাম্প আরও দাবি করেন, চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে চলেছে হরমুজ প্রণালী। সমঝোতার অংশ হিসাবেই ওই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ খুলে দেওয়া হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথ ঘিরেই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি টানাপড়েন। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত শুরুর পর থেকেই হরমুজ় প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইরান বিভিন্ন দেশের জাহাজ চলাচলের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েমের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ। আবার আমেরিকাও ইরানমুখী জাহাজ চলাচলের উপর চাপ বাড়িয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক তেলবাজারেও তার প্রভাব পড়েছে। কিন্তু শনিবারের সেই আশাবাদী বার্তার ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই সুর বদল করলেন ট্রাম্প। রবিবার তিনি জানান, মার্কিন প্রতিনিধিদলকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে— চুক্তি নিয়ে কোনো তাড়াহুড়ো করা যাবে না। তাঁর যুক্তি, বর্তমান পরিস্থিতি আমেরিকার পক্ষেই রয়েছে। তাই সময় নিয়ে, নিখুঁত ভাবে গোটা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে চাইছে ওয়াশিংটন। ট্রাম্পের মতে, ‘এখানে কোনও ভুল করার অবকাশ নেই। ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক এখন অনেক বেশি পেশাদার এবং গঠনমূলক।’
এর পরেই সোশ্যাল মডিয়ায় আরও একটি পোস্ট করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সেখানে তিনি জানান, চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর থাকবে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, তাঁর প্রশাসনের সম্ভাব্য চুক্তি কখনওই প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা-র আমলের পরমাণু চুক্তির মতো হবে না। ট্রাম্পের অভিযোগ, ওবামা প্রশাসনের সে চুক্তিই ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথ খুলে দিয়েছিল। এদিকে, মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ওয়াশিংটনের শর্ত মেনেই ইরান তাদের উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার হস্তান্তরে রাজি হয়েছে। আগামী ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যেই সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে বলেও দাবি করা হয়। যদিও সে খবর সরাসরি খারিজ করে দিয়েছে তেহরান। ইরানের এক শীর্ষ আধিকারিক স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার হস্তান্তরের কোনো প্রশ্নই নেই। তাঁর দাবি, আমেরিকার সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনায় পরমাণু কর্মসূচির বিষয়টিই ছিল না। চূড়ান্ত চুক্তির সময় সে ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান–ও রবিবার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, তেহরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না। কিন্তু দেশের সম্মান এবং মর্যাদার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। একই সঙ্গে তিনি জানান, সুপ্রিম নেতা মোজতবা খামেইনি-র অনুমোদন ছাড়া আমেরিকার সঙ্গে কোনো চুক্তি কার্যকর হবে না।
অন্যদিকে, ভারত সফরে এসে মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও ইঙ্গিত দিয়েছেন, খুব দ্রুতই বড়ো ঘোষণা হতে পারে। দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বলেন, ‘সম্ভবত কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশ্ব একটি ভালো খবর পেতে চলেছে।’ তাঁর মতে, এই চুক্তি কার্যকর হলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিশ্বের উদ্বেগ অনেকটাই কমবে।তবে একই সঙ্গে জ্বালানি সঙ্কটের জন্য ইরানকে দায়ী করেন রুবিয়ো। তার পাল্টা জবাবে ভারতে অবস্থিত ইরানের দূতাবাস দাবি করেছে, পশ্চিম এশিয়ার বাস্তব পরিস্থিতিকে বিকৃত করার চেষ্টা করছে আমেরিকা এবং ইজরায়েল। তেহরানের বক্তব্য, ইরানের তেল রপ্তানির উপর ‘বেআইনি’ নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েই বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলেছে ওয়াশিংটন।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা এবং ইজরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই। তার পর থেকেই পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত ভয়াবহ আকার নেয়। ইরান পাল্টা ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে আমেরিকার মিত্র দেশগুলির উপর। বর্তমানে সংঘর্ষবিরতি কার্যকর থাকলেও পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত স্পর্শকাতর। আর সেই আবহেই শান্তিচুক্তি নিয়ে জল্পনার মাঝেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে— আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে অবিশ্বাসের প্রাচীর এখনো অটুট।
❤ Support Us








