- প্রচ্ছদ রচনা বি। দে । শ
- অক্টোবর ১০, ২০২৫
গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় সওয়াল, দুই দশকের লড়াইকে সম্মান রয়্যাল সুইডিশ একাডেমির । শান্তিতে নোবেল জয় ভেনিজুয়েলার বিরোধী কন্ঠ মারিয়া করিনা মাচাদোর
স্বৈরাচার যখন শাসনের মুখোশ পরে দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়, তখন কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা মুখ বন্ধ না করে অকুতোভয় দৃঢ়তায় সামনে এগিয়ে আসেন। শাসকের চোখে চোখ রেখে দাঁড়ান। মারিয়া কোরিনা মাচাদো ঠিক তেমনই এক নাম। একটি বিপর্যস্ত দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রতীক হয়ে এবার তিনি বিশ্বের ইতিহাসে স্থান পেলেন। ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের বিরোধী নেত্রী ও মানবাধিকার কর্মী মাচাদোকে ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করল নোবেল কমিটি।
পুরস্কার ঘোষণার সময় কমিটির চেয়ার ইয়রগেন ওয়াতনে ফ্রাইডনেস বলেন, ‘মারিয়া কোরিনা মাচাদো দেখিয়ে দিয়েছেন, শান্তির পথ ব্যালট দিয়েও তৈরি করা যায়। তিনি গণতন্ত্রের সেই আলোর বাহক, যাঁর জন্য একটি জাতি এখনো সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে।’ তাঁর ভাষায় ঝরে পড়েছে এ সময়ের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বার্তা— যেখানে অস্ত্রের ভাষা নয়, মানুষের ভোটই শেষ কথা। ভেনেজুয়েলা এক সময় ছিল দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু বিগত এক দশকে দেশটি অন্ধকারে তলিয়ে গেছে। অভিযোগ, বামপন্থী রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোর শাসনে তা রূপ নিয়েছে এক নির্মম স্বৈরতন্ত্রে। বিরোধী নেতাদের হয় জেলে পোরা হয়েছে, নয় তো দেশছাড়া করা হয়েছে। বাক স্বাধীনতা এবং ভোটাধিকার দুই-ই আজ প্রশ্নের মুখে। তার উপর রয়েছে মার্কিন অধিপত্যবাদের লাগাতার চেষ্টা। এমন পরিস্থিতিতেই দশকের পর দশক ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন নোবেল বিজয়ী মাচাদো।
২০২৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সরকার তাঁকে ‘রাজনৈতিক ভাবে অযোগ্য’ ঘোষণা করে। তারপরও তিনি পিছু হটেননি। বরং, বিরোধী শিবিরে ঐক্য গড়ে তুলে তিনি সমর্থন জানান এডমন্ড গঞ্জালেস উরুত্তিয়া নামের আর এক বিরোধী প্রার্থীকে। দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে দেন স্বেচ্ছাসেবকদের দল, যারা ভোটকেন্দ্রে পাহারা দিয়েছে, ভোটারদের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। এ কাজ অবশ্য সহজ ছিল না। মাচাদো বরাবরই সরকারের কু-নজরে ছিলেন। তাঁর উপর হামলার হুমকি আসে বারবার। রাষ্ট্র তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও ষড়যন্ত্রের মামলা চাপায়। সংসদ থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয় ২০১৪ সালে। কারণ তিনি রাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে মুখ খুলেছিলেন। তারপর থেকেই তাঁকে এক মুহূর্তের জন্য শান্তিতে থাকতে দেয়নি প্রশাসন। তবু তিনি দেশ ছাড়েননি। নিরাপত্তার কারণে ঠিক কোথায় আছেন, জানা না গেলেও তাঁর দল ‘ভেন্তে ভেনেজুয়েলা’ জানিয়েছে, তিনি আজও দেশের মাটিতেই রয়েছেন, জনগণের কাছে রয়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন, সংগঠিত করেছেন, জুগিয়েছেন ভরসা। এ এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
মারিয়া কোরিনা মাচাদোর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল নাগরিক অধিকার রক্ষার আন্দোলন দিয়ে। ২০০২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘সুমাতে’ নামের এক সংগঠন, যারা দেশে স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছিল। পরে গড়ে তোলেন ‘সয় ভেনেজুয়েলা’ নামে একটি জোট সংগঠন, যেটি রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থার দাবিতে সরব হয়। তাঁর পড়াশোনা ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে হলেও, রাজনীতিতে কাজ সুদূর প্রসারী— তাঁর মতে দেশ গঠনের প্রধান উপকরণ হলো স্বাধীনতা ও দায়িত্ববোধ। আন্তর্জাতিক মহলে ইতিমধ্যেই তাঁর নাম আলোচিত। তিনি ২০১৯ সালে লিবারেল ইন্টারন্যাশনাল ফ্রিডম প্রাইজ পেয়েছেন, ২০২৫ সালে টাইম ম্যাগাজিনের ‘বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তি’র তালিকাতেও স্থান পেয়েছেন। এবার তাঁর নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই নোবেল কমিটির দৃষ্টিভঙ্গিও আরও এক বার স্পষ্ট হল— শান্তি কেবল যুদ্ধ থামানোর নাম নয়। শান্তি মানে ন্যায়, গণতন্ত্র, মানবাধিকারের স্বীকৃতি। মাচাদোর এই পুরস্কার প্রাপ্তি সে বার্তা বহন করে। জানান দেয়, রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ের মাঝেও শান্তি এবং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো যায়, যদি মনোবল অটুট থাকে, যদি বিশ্বাস থাকে মানুষের অধিকারে।
এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে আন্তর্জাতিক জল্পনা ছিল প্রবল। বিশেষত মার্কিন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই কয়েকটি সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিলেন, গাজা যুদ্ধবিরতির পরিকল্পনা করে তিনি নোবেল পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু নরওয়েজিয়ান কমিটির দৃষ্টি ছিল আরো গভীরে। তারা চেয়েছে এমন একজনকে পুরস্কৃত করতে, যিনি শান্তির প্রকৃত মানে বোঝেন—একজন নারী, যিনি স্বৈরতন্ত্রের ভেতরে থেকেও জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। মাচাদো-কে ভেনেজুয়েলায় ‘আয়রন লেডি’ বলা হয়। কিন্তু তাঁর শক্তি লৌহ নয়, তাঁর শক্তি হল মানবিক দৃঢ়তা। সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে যিনি কখনো অস্ত্র তুলে নেননি, কিন্তু যাঁর কথায় আজ দেশের লক্ষ মানুষ আশ্রয় খুঁজে পাযন। আর নোবেল কমিটি বলেছে, মারিয়া কোরিনা মাচাদো প্রমাণ করেছেন, শান্তি কেবল যুদ্ধহীনতা নয়, শান্তি মানে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা। তাঁর এই পুরস্কার সেই সমস্ত মানুষের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য, যারা রাষ্ট্রের নিপীড়নের মুখে কখনো মাথা নত করেনি, যারা নিজেদের দেশের জন্য সাহসিকতার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন, বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন।
❤ Support Us






