- দে । শ
- জুলাই ১৪, ২০২৬
অনশনের ১৭ দিন ! শারীরিক অবস্থার অবনতির মাঝেও অনড় সোনম ওয়াংচুক
নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিকে কেন্দ্র করে যে ক্ষোভ দেশের ছাত্রসমাজের মধ্যে দানা বেঁধেছিল, তা এখন ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নে পরিণত হচ্ছে। সে আবহেই দিল্লির যন্তরমন্তরে অনির্দিষ্টকালের অনশনের ১৭তম দিনে পৌঁছে কেন্দ্র সরকারের উদ্দেশে সরাসরি বার্তা দিয়েছেন আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠা শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি তাঁর আবেদন, ‘জনগণের কণ্ঠস্বর শুনুন। সংবেদনশীল হোন, অনমনীয় নন। গণতন্ত্র চলে সহমর্মিতা ও মানবিকতার ভিত্তিতে।’ দীর্ঘ অনশনের ফলে সোনমের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলেও আন্দোলন থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেননি তিনি। বরং তাঁর দাবি, পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক, আন্দোলনের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি অনড় থাকবেন।
আন্দোলনের উদ্যোক্তা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র তরফে সোমবার জানানো হয়েছে, অনশন শুরু হওয়ার পর থেকে ওয়াংচুকের ওজন ৮ কেজিরও বেশি কমেছে। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নেমে এসেছে প্রতি ডেসিলিটারে ৬৭ মিলিগ্রামে। নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষায় চিকিৎসকেরা তাঁর শারীরিক অবস্থার উপর নজর রাখছেন। সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, তাঁর রক্তচাপ ছিল ১০৭/৭০। চিকিৎসকদের মতে, এত দীর্ঘ সময় খাদ্য গ্রহণ না করলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপর গুরুতর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তবু আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, শারীরিক দুর্বলতা সত্ত্বেও ওয়াংচুকের মানসিক দৃঢ়তায় কোনো ভাটা পড়েনি।
নিট-সংক্রান্ত বিতর্কের সূত্র ধরে গত ২০ জুন যন্তরমন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষায় অনিয়ম এবং লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার অভিযোগ তুলে শুরু থেকেই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে আসছে সংগঠনটি। আন্দোলনের একেবারে গোড়া থেকেই তাদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছিলেন সোনম। পরে তিনি ঘোষণা করেন, ২৭ জুনের মধ্যে কেন্দ্র যদি কোনও সন্তোষজনক জবাব না দেয়, তা হলে তিনি অনশনে বসবেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকারের তরফে কোনো প্রতিক্রিয়া না মেলায় ২৮ জুন থেকে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন লাদাখের সমাজকর্মী।
গত কয়েক দিনে অনশন মঞ্চ থেকেই বারবার কেন্দ্র সরকারের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন ওয়াংচুক। তাঁর বক্তব্য, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়; সেটি কেবল জবাবদিহির সূচনা। তাঁর মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এ পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত জনগণের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে বৃহত্তর সংস্কারের পথে হাঁটা। তবে মোদি সরকারের তরফে এ পর্যন্ত কোনোরকম যোগাযোগ না হওয়ায় আন্দোলনকারীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে সোমবার সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টে লেখেন, ‘সোনম ওয়াংচুকের অনশনের ১৬তম দিন। আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, এটিকে যেন অহংকারের লড়াইয়ে পরিণত না করা হয়। এখানে একটি মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে।’ তাঁর আরও বক্তব্য, ‘ভুল স্বীকার করা দুর্বলতার লক্ষণ নয়। বরং তা ভুল শুধরে নেওয়ার সদিচ্ছার পরিচয়। আমরা শুধু জবাবদিহি চাই।’
এদিন, অনশন মঞ্চ থেকে নিজের সমর্থকদের উদ্দেশেও বার্তা দিয়েছেন ওয়াংচুক। তিনি বলেন, ‘আমি গান্ধী নই, নায়কও নই। আমি একজন সাধারণ মানুষ। প্রত্যেকে নিজের নিজের নায়ক হোন। নাগরিক হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করুন।’ একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, দেশের নানা প্রান্তের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যে সমর্থন পাচ্ছেন, সেটিই তাঁকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগাচ্ছে। গত কয়েক দিনে যন্তরমন্তরের আন্দোলনের মঞ্চে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির সক্রিয় উপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও শুরু হয়েছে। বিরোধীদের একাংশের দাবি, আন্দোলন ক্রমশ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মঞ্চে পরিণত হচ্ছে। সে অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন ওয়াংচুক। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, ‘এ মঞ্চের কোনো রাজনৈতিক রং নেই। আমরা বিজেপিকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছি। আমি চাই সব রাজনৈতিক দলের নেতারা আসুন। যদি তাঁরা না আসেন, তা হলে তা তাঁদের সংকীর্ণতার পরিচয় দেবে।’ তিনি আরও বলেন, দেশের যুবসমাজের ভবিষ্যতের প্রশ্নে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে একত্র হওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে, ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতির খবর সামনে আসার পর তাঁর পাশে দাঁড়াতে শুরু করেছেন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বেরা। ‘থ্রি ইডিয়টস’-এ চতুর চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেতা ওমি বৈদ্য সম্প্রতি এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘আমি চাই না ফুনসুখ ওয়াংডু মারা যাক।’ জনপ্রিয় ছবিটির ফুনসুখ ওয়াংডু চরিত্রটি যে বাস্তবে সোনম ওয়াংচুককে অবলম্বন করেই নির্মিত, সে কথাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। ওমির বক্তব্য, ‘আপনি তাঁর সঙ্গে একমত হোন বা না হোন, তিনি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত সবার।’ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন বজায় রেখেও অনশনকারীদের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অরুন্ধতী রায়, নাসিরুদ্দিন শাহ, রত্না পাঠক শাহ, জয়তী ঘোষ-সহ একাধিক বিশিষ্ট নাগরিক। যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা লিখেছেন, ‘আপনাদের সাহস, দৃঢ়তা এবং আত্মত্যাগের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু এই লড়াই দীর্ঘ পথের। এটি কোনও স্বল্পমেয়াদি সংগ্রাম নয়। আগামী দিনের বৃহত্তর লড়াইয়ের জন্য আপনাদের সুস্থ থাকা প্রয়োজন।’ তাঁদের বক্তব্য, সরকারের তরফে এখনো কোনো ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় অনশনকারীদের স্বাস্থ্য আরও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তাই তাঁরা অনুরোধ জানিয়েছেন, আন্দোলনের বৃহত্তর স্বার্থে অনশন প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করতে।
শুধু সাংস্কৃতিক জগত নয়, রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে নড়াচড়া শুরু হয়েছে। বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-র নেতারা ওয়াংচুকের অনশনের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন। সূত্রের খবর, সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিন ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চের একটি প্রতিনিধিদল যন্তরমন্তরে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করবে। তাঁকে অনশন ভঙ্গ করার অনুরোধ জানানো হবে। একই সঙ্গে আন্দোলনের দাবিগুলিকে সংসদের ভিতরে ও বাইরে আরও জোরালো ভাবে তুলে ধরার আশ্বাস দেওয়া হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিনিধিদলটি ওয়াংচুকের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সেখান থেকে মিছিল করে সংসদ ভবনের দিকে যাবে। এদিকে আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। সংগঠনের তরফে ঘোষণা করা হয়েছে, আগামী ২০ জুলাই, সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার দিন, দিল্লিতে সংসদ অভিমুখে একটি বৃহৎ পদযাত্রার আয়োজন করা হবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সে কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
❤ Support Us





