Advertisement
  • দে । শ
  • জুন ২৪, ২০২৬

‘এল নিনো’-র প্রভাবে দেশজুড়ে বৃষ্টির ঘাটতি, খরিফ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা । কৃষি গবেষক, আবহাওয়াবিদদের সঙ্গে বৈঠক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘এল নিনো’-র প্রভাবে দেশজুড়ে বৃষ্টির ঘাটতি, খরিফ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা । কৃষি গবেষক, আবহাওয়াবিদদের সঙ্গে বৈঠক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর

দেশে বর্ষার আগমন ঘটেছে। বেশ কিছু রাজ্যে মেঘের আনাগোনা বেড়েছে। তবে বর্ষার শুরুতেই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বৃষ্টির ঘাটতি। জুন মাস শেষ হতে আর কয়েক দিন মাত্র বাকি। অথচ দেশের মোট বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় ৪৩ শতাংশ কম। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস বলছে, অন্তত জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতির সম্ভাবনা নেই। এমন পরিস্থিতিতে খরিফ চাষ ঘিরে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। আশঙ্কা উড়িয়ে দিতে পারছে না কেন্দ্রও। সে কারণেই দেশের ৩১৫টি জেলাকে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে আগাম প্রস্তুতি শুরু করেছে কেন্দ্রীয় কৃষি মন্ত্রক।

মঙ্গলবার বিভিন্ন রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী, জেলা প্রশাসক, কৃষি বিজ্ঞানী এবং আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের ভার্চুয়াল বৈঠকের পরে কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান জানান, ‘এল নিনো’-র প্রভাব ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বর্ষার অগ্রগতি এ বছর উল্লেখযোগ্য ভাবে বিলম্বিত হয়েছে। ফলে বৃষ্টিনির্ভর কৃষি অঞ্চলে খরিফ ফসলের উপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষি মন্ত্রকের হিসাবে, দেশের ৩১৫টি জেলা দুর্বল বর্ষার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর মধ্যে ১১১টি জেলাকে ‘হাই প্রায়রিটি’ বা উচ্চ অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা হয়েছে, যেখানে সেচের আওতা ২৫ শতাংশেরও কম। আরও ৭৬টি জেলা রয়েছে মধ্যম ঝুঁকির তালিকায়। বাকি ১২৮টি জেলায় তুলনামূলক ভাবে সেচব্যবস্থা ভালো হলেও সেখানেও সতর্ক নজর রাখা হচ্ছে।

মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, কর্নাটক, বিহার, ঝাড়খণ্ড, তেলঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা ও তামিলনাড়ুর বিস্তীর্ণ অংশ উদ্বেগ তালিকার অন্তর্ভুক্ত।

কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার অপেক্ষা না করে এখনই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই, কৃষকদের ক্ষতি যতটা সম্ভব কমানো।’ আবহাওয়া দফতর আগেই জানিয়েছিল, এ বছরের বর্ষাকালে দীর্ঘমেয়াদি গড় বৃষ্টিপাতের ৯০ শতাংশ বৃষ্টি হতে পারে। গত এক দশকের মধ্যে যা সবচেয়ে দুর্বল বর্ষাগুলির একটি হতে পারে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি আপাতত সে আশঙ্কাকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে। জুন মাসে ৯২ শতাংশ বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলেও মাসের শেষ সপ্তাহে এসে দেখা যাচ্ছে, দেশের ২৬টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বৃষ্টির ঘাটতি ২০ শতাংশের বেশি। তার মধ্যে ৯টি অঞ্চলে ঘাটতি ৬০ শতাংশেরও উপরে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, জুন মাস সাধারণত খরিফ চাষের প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ধান, ভুট্টা, সয়াবিন, তুলো ও ডালশস্যের বপনের সময় এটাই। কিন্তু পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় বহু এলাকায় চাষিরা এখনো জমিতে নামতে পারেননি। কোথাও আবার প্রাথমিক বপনের পরে মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা না থাকায় বীজ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জেলা ভিত্তিক বিকল্প কৃষি পরিকল্পনা বা ‘ডিস্ট্রিক্ট অ্যাগ্রিকালচার কনটিনজেন্সি প্ল্যান’ কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্র। ভারতীয় কৃষি গবেষণা পরিষদ (আইসিএআর) এবং সেন্ট্রাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর ড্রাইল্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার (সিআরআইডিএ) যৌথ ভাবে দেশের প্রতিটি জেলার জন্য আগাম পরিকল্পনা তৈরি করেছে। কোথায় কোন বিকল্প ফসল চাষ করা যাবে, কম বৃষ্টিতে কোন শস্য তুলনামূলক বেশি ফলন দেবে, কী ভাবে সীমিত জল ব্যবহার করে উৎপাদন ধরে রাখা সম্ভব— সবই সুপারিশ রয়েছে ওই পরিকল্পনায়।

কেন্দ্রের মতে, এ বার কৃষকদের বেশি করে স্বল্পমেয়াদি ও কম জলপ্রয়োজনীয় ফসলের দিকে ঝুঁকতে হতে পারে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ডালশস্য, মিলেট, ধান ও তৈলবীজ চাষে। পাশাপাশি আন্তঃফসল চাষ ও মিশ্র কৃষি ব্যবস্থার উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে একটি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কৃষকের আয়ের সব রাস্তা বন্ধ না হয়ে যায়। শুধু ফসল নয়, জলের সঙ্কট মোকাবিলাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে কেন্দ্র। কৃষিমন্ত্রীর নির্দেশ, পুকুর, জলাধার, খাল, চেক ড্যাম, স্টপ ড্যাম এবং কৃষি জলাধারগুলির দ্রুত সংস্কার করতে হবে। ‘মনরেগা’-সহ বিভিন্ন গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে জল সংরক্ষণ ও জলধারণ ক্ষমতা বাড়ানোর কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কোথাও পানীয় জলের সঙ্কট দেখা দিলে অন্য এলাকা থেকে জল সরবরাহের ব্যবস্থাও করতে বলা হয়েছে।

বীজ ও সারের জোগান নিয়ে আপাতত আশ্বস্ত কেন্দ্র। কৃষি মন্ত্রকের দাবি, খরিফ মরসুমের জন্য পর্যাপ্ত বীজ মজুত রয়েছে। সম্ভাব্য পুনর্বপনের প্রয়োজন হতে পারে ধরে অতিরিক্ত বীজও সংরক্ষণ করা হয়েছে।

ইউরিয়া, ডিএপি, এমওপি, এনপিকে, এসএসপি-সহ প্রধান সারগুলির সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগের কারণ নেই বলে জানিয়েছে সরকার। তবে কৃষকদের উদ্দেশে সতর্কবার্তাও দিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী। তাঁর পরামর্শ, হালকা বৃষ্টি হলেই বপন শুরু করা উচিত নয়। অন্তত ৭৫ থেকে ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টি এবং পর্যাপ্ত মাটির আর্দ্রতা নিশ্চিত হওয়ার পরেই বীজ বপন করা উচিত। অন্যথায় পুনর্বপনের ঝুঁকি বাড়বে। একই সঙ্গে কৃষকদের আর্থিক সুরক্ষার দিকেও জোর দিচ্ছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনা, কিষান ক্রেডিট কার্ড এবং পিএম-কিষাণ প্রকল্পের আওতা বাড়িয়ে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কেন্দ্রের আশা, তিন প্রকল্প একত্রে কৃষকদের জন্য সুরক্ষার বলয় তৈরি করবে।

দুর্বল বর্ষার উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে পশুপালন ক্ষেত্রেও। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে পশুখাদ্যের সঙ্কট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে কারণেই উদ্বৃত্ত অঞ্চল থেকে ঘাটতি এলাকায় পশুখাদ্য পাঠানোর পরিকল্পনা আগেভাগেই তৈরি করছে কেন্দ্র। কালোবাজারি ও মজুতদারি রুখতে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। ‘এল নিনো’-র সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় দিল্লিতে গড়ে তোলা হয়েছে ‘এল নিনো মনিটরিং সেল’ এবং ‘ক্রপ ওয়েদার ওয়াচ গ্রুপ’। রাজ্যগুলিকেও নিজস্ব ‘কন্ট্রোল রুম’ গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে সচিব পর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রতি মঙ্গলবার বিশেষ বৈঠকে পরিস্থিতির খোঁজ নিচ্ছে কেন্দ্র।

এদিনের বৈঠকে, কৃষিমন্ত্রী রাজ্যগুলিকে আশ্বস্ত করার সুরেই বলেছেন, ‘আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রস্তুতি ও সমন্বিত উদ্যোগই এখন সবচেয়ে জরুরি।’ তবে কৃষি বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আগামী দু-সপ্তাহ বর্ষার গতিপ্রকৃতিই ঠিক করে দেবে দেশের খরিফ মরসুম কতটা স্বাভাবিক থাকবে। কারণ ভারতের প্রায় অর্ধেক কৃষিজমি এখনো সরাসরি বর্ষার জলের উপর নির্ভরশীল। ফলে বৃষ্টির ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব শুধু মাঠে নয়, খাদ্যশস্য উৎপাদন, মূল্যবৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উপরও পড়তে পারে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!