- এই মুহূর্তে দে । শ
- জানুয়ারি ৩, ২০২৬
উত্তরপ্রদেশের পর রাজস্থান, পাঠাভ্যাসে জোর দিতে স্কুলে বাধ্যতামূলক খবরের কাগজ পাঠ । বাংলায় কবে?
শিশু-কিশোর পড়ুয়াদের সার্বিক মেধা-মনন বিকাশে কেবল পাঠ্যপুস্তক বা শিক্ষকদের সস্নেহ পাঠদান নয়, বিশ্বায়নের দ্রুতগামী দুনিয়ায় প্রয়োজন দিন-দুনিয়ার তথ্যের সম্যক ধারণা। ভাষা, শব্দ, বাক্যগঠন শিক্ষা, হাতেকলমে উদাহরণে মগজে স্থায়ী গেঁথে যাওয়া; এ প্রক্রিয়া যে কতখানি সহায়ক, তা বোধকরী কারোরই অজানা নয়। এ লক্ষ্যেই উত্তরপ্রদেশের পর এ বার রাজস্থানেও সরকারি স্কুলগুলিতে দৈনিক খবরের কাগজ পড়া বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। পড়ুয়াদের পাঠাভ্যাসে ফের জোর দিতে এবং শ্রেণিকক্ষকে সমসাময়িক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করতেই এই পদক্ষেপ বলে জানিয়েছে সে রাজ্যের শিক্ষা দফতর। কয়েক দিন আগে উত্তরপ্রদেশ সরকার একই ধরনের নির্দেশিকা জারি করেছিল। তার পরেই রাজস্থান সরকারও সে পথ অনুসরণ করে ৩১ ডিসেম্বর বিস্তৃত নির্দেশিকা জারি করেছে।
নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, রাজ্যের প্রতিটি সরকারি স্কুলে নিয়মিত খবরের কাগজ রাখা ও পড়ানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতিদিন স্কুল শুরুর আগে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের যে প্রার্থনাসভা বা সমাবেশ হয়, সেখানে অন্তত ১০ মিনিট সময় বরাদ্দ রাখতে হবে সংবাদপত্র পাঠের জন্য। শুধু চুপচাপ পড়া নয়, খবর পড়ে শোনানো এবং গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে আলোচনা করার উপরও জোর দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা দফতরের মতে, এর মাধ্যমে পড়ুয়ারা শুধু খবর জানতে শিখবে না, বরং তা বোঝা ও বিশ্লেষণ করার অভ্যাসও তৈরি করবে। নির্দেশিকায় স্কুলভেদে সংবাদপত্র রাখার বিষয়টি স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। সরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্কুলগুলিকে অবশ্যই একটি হিন্দি ও একটি ইংরেজি দৈনিক কিনতে হবে। সরকারি উচ্চ প্রাথমিক স্কুলে অন্তত ২ টি হিন্দি দৈনিক রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইংরেজি-মাধ্যম সরকারি স্কুলগুলির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম কার্যকর হবে। সংবাদপত্র কেনার জন্য স্কুলগুলিকে আলাদা করে আর্থিক চাপ বহন করতে হবে না। এই খরচ বহন করবে রাজস্থান স্কুলশিক্ষা সংসদ।
অভূতপূর্ব এ উদ্যোগের নেপথ্যে রাজস্থান সরকারের একাধিক লক্ষ্য রয়েছে। শিক্ষা দফতর জানিয়েছে, পড়ুয়াদের শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ করা, নিয়মিত পড়ার অভ্যাস তৈরি করা এবং চারপাশের দেশ-দুনিয়ার ঘটনাবলি সম্পর্কে সচেতন করে তোলাই সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য। পাশাপাশি, সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান বাড়িয়ে ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য ছাত্রছাত্রীদের মানসিক প্রস্তুতি গড়ে তোলাও এই সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্দেশিকায় ভাষাচর্চার দিকটিও তাই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রতিদিনের সংবাদপত্র থেকে অন্তত ৫টি নতুন শব্দ বেছে নিতে হবে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের। পরে সেই শব্দগুলির অর্থ ছাত্রছাত্রীদের বোঝাতে হবে, যাতে তাদের ভাষাগত দক্ষতা ও প্রকাশক্ষমতা উন্নত হয়। শুধু রাজনৈতিক বা দৈনন্দিন খবরেই সীমাবদ্ধ না থেকে ক্রীড়া সংবাদ ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির প্রতিও নজর রাখতে বলা হয়েছে। বয়সে একটু বড়ো পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে সম্পাদকীয় পাতার লেখা পড়া ও তা নিয়ে আলোচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যে ছাত্রছাত্রীরা দিনের খবর পড়ার দায়িত্ব পাবে, তাদের স্কুলে ৩০ মিনিট আগে এসে প্রস্তুতি নিতে হবে। এ ছাড়াও ‘নো ব্যাগ ডে’-তে সমসাময়িক বিষয় এবং সরকারি কার্যকলাপ নিয়ে বৃহৎ আকারে আলোচনা সভার আয়োজন করার কথা বলা হয়েছে, যাতে ছাত্রছাত্রীরা মত প্রকাশের সুযোগ পায় এবং যুক্তি দিয়ে কথা বলার অভ্যাস গড়ে ওঠে। রাজস্থানের শিক্ষা দফতরের সচিব কৃষ্ণ কুণাল জানিয়েছেন, এই উদ্যোগের ফলে পড়ুয়াদের মধ্যে খবরের কাগজ পড়ার আগ্রহ বাড়বে, তাদের সাধারণ জ্ঞান ও সামাজিক সচেতনতা প্রসারিত হবে এবং ভাষা ও প্রকাশভঙ্গির দক্ষতায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তাঁর মতে, সচেতন, চিন্তাশীল ও আত্মবিশ্বাসী নাগরিক গড়ে তুলতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল মাধ্যমের দাপটে যখন নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে বই ও সংবাদপত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তখন শিক্ষা মহলের একাংশের মতে, এই সিদ্ধান্ত স্কুলের পাঠক্রমে ফের খবরের কাগজকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে দিতে পারে। উত্তরপ্রদেশের পর রাজস্থানের এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে অন্য রাজ্যগুলিকেও একই পথে হাঁটতে উৎসাহিত করবে কি না, সে দিকেই এখন নজর শিক্ষামহলের। উত্তরপ্রদেশ ও রাজস্থানে সরকারি স্কুলে খবরের কাগজ পড়া বাধ্যতামূলক হওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, পশ্চিমবঙ্গে কি এমন কোনো ব্যবস্থা আছে? উত্তর, আপাতত নেই। রাজ্যের সরকারি বা সরকার-পোষিত স্কুলগুলিতে দৈনিক সংবাদপত্র পাঠকে বাধ্যতামূলক করে এ পর্যন্ত রাজ্যব্যাপী নির্দেশিকা জারি হয়নি। রাজ্য সরকার মাতৃভাষা শিক্ষার উপর, বাঙালি অস্মিতা নিয়ে ধারাবাহিক রাজনৈতিক প্রচার চালালেও, স্কুল শিক্ষার বুনিয়াদী স্তরে তা নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয় নি। বরং রাজ্যের বেসরকারী স্কুলগুলোতে ইংরেজি ও হিন্দি মাধ্যমে পড়াশোনাই অগ্রাধিকার পেয়েছে, কোণঠাসা হয়েছে বাংলা ভাষা। যদিও পাঠাভ্যাস বাড়ানোর কথা রাজ্য সরকার বারবার বলেছে। সে সূত্র ধরেই স্কুল লাইব্রেরি উন্নয়নের জন্য একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে গত কয়েক বছরে। সরকারি স্কুলগুলিতে বই কেনার জন্য অনুদান দেওয়া হয়েছে, নির্দিষ্ট তালিকা অনুযায়ী বই রাখার নির্দেশও এসেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। বহু স্কুলে লাইব্রেরি থাকলেও তা নিয়মিত খোলা থাকে না, কোথাও আবার বই থাকলেও পাঠচর্চা কার্যত বন্ধ।
বাংলার সরকারি স্কুলের পাঠাগারে বই পড়ার অভ্যাসের ক্ষেত্রে আরো একটি বড়ো সমস্যা গ্রন্থাগারিকের অভাব। রাজ্যের বহু সরকারি স্কুলে পূর্ণ সময়ের লাইব্রেরিয়ান নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন গ্রন্থাগারিককে একাধিক স্কুলের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। ফলে লাইব্রেরি পরিচালনা, বই ইস্যু, পড়ুয়াদের উৎসাহ দেওয়া, এসব নিয়মিত ভাবে সম্ভব হয় না। শিক্ষকদের একাংশের মতে, লাইব্রেরি থাকলেও তা অনেক সময় ‘স্কুলের শোভা’ হয়েই থেকে যাচ্ছে। যদিও, খবরের কাগজ পড়ার বিষয়টি অনেকটাই নির্ভর করছে স্কুল বা শিক্ষকের নিজস্ব উদ্যোগের উপর। কিছু স্কুলে শিক্ষকরা নিজেরাই সংবাদপত্র এনে ছাত্রছাত্রীদের খবর পড়তে উৎসাহিত করেন বটে, কোথাও আবার বিশেষ দিনে আলোচনা সভাও হয়। কিন্তু রাজস্থান বা উত্তরপ্রদেশের মতো বাধ্যতামূলক, নিয়মিত ও কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থা বাংলায় এখনো গড়ে ওঠেনি। শিক্ষা মহলের একাংশের মত, ডিজিটাল পর্দার দাপটে যখন নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে দীর্ঘ পাঠ থেকে সরে যাচ্ছে, তখন স্কুলের মধ্যেই খবরের কাগজ ও লাইব্রেরিকে পাঠচর্চার কেন্দ্রবিন্দু করা জরুরি। শুধু পাঠ্যবই নয়, সমসাময়িক ঘটনা, সম্পাদকীয় ভাবনা, ভাষার ব্যবহার, এসবের সঙ্গে পরিচয় না হলে পড়ুয়াদের সামগ্রিক শিক্ষাও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
❤ Support Us






