Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক
  • নভেম্বর ৬, ২০২১

আমার ছেলেবেলা

নির্মলেন্দু গুণ
আমার ছেলেবেলা

চিত্র: সংগৃহীত ।

আমাদের গ্রামের দক্ষিণ-পূর্ব দিক ঘেঁষে একটা ছোট্ট নদী আছে। কংশ থেকে বেরিয়ে ওটা গিয়ে মিশেছে বিষ্ণাই নদীর সঙ্গে। এই নদীটার কোনো নাম নেই। নামহীন ঐ নদীটাকে আমরা নদী বলেই ডাকতাম। ঐ নদীর তীরে গাঁয়ের শ্মশান। কবরস্থানের মতো শ্মশানের জন্য বিস্তৃত জায়গার প্রয়োজন পড়ে না, কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষদের জমির অভাব ছিল না বলেই শ্মশানের জন্য তাঁরা অনেকটা জমি ছেড়ে দিয়েছিলেন। নদীর তীরের ঐ উদ্বৃত্ত জায়গাটাকে আমরা খেলার মাঠে পরিণত করেছিলাম। নদীতীরের উঁচু-মাঠটি কিছুটা ত্রিকোণাকৃতির হওয়ায় একটু অসুবিধা হলেও একসময় ঐ-আকৃতির মধ্যই আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। মাঠটি বেশ উঁচু ছিল, বৃষ্টির দিনেও জল জমতো না, কাদা হতো না; ফলে প্রাণভরে আমরা ফুটবল খেলতে পারতাম।

বাবার পকেট থেকে এক টাকা চুরি করে এবং এক টাকা চেয়ে নিয়ে, মোট দুই টাকা চাঁদা দিয়ে আমি হলাম আমাদের দলের ক্যাপ্টেন। আমানত বেপারীর দোকান থেকে আট টাকা দিয়ে টি-শেইপের একটি তিন নম্বর ফুটবল কেনা হলো। বলের ভিতরে টুকটুকে লাল রঙের কোহিনূর ব্লাডার। চামড়ার ফুটবলের যুগে প্রবেশ করার সেই দিনটি আমার স্মৃতিপটে উজ্জ্বল হয়ে আছে। রাবারের বল, বেণীপাকানো খড়ের বল এবং জাম্বুরার বলের তিনটি স্তর অতিক্রম করে আমরা যেদিন চামড়ার ফুটবলের সর্বোচ্চস্তরে প্রবেশ করি, সেদিন আমাদের আনন্দ ও উত্তেজনা আকাশ স্পর্শ করেছিল। ফুটবল খেলা না বলে ফুটবলকে নিয়ে খেলা বলাটাই সঙ্গত হবে। ফুটবলের একটা সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি আছে, তাতে খেলার মাঠের আকৃতি, খেলোয়াড়ের সংখ্যা এবং খেলার সময় নির্দিষ্ট করা থাকে। আমাদের বেলায় ওই সদ্যকেনা চামড়ার বলটা ছাড়া আর কিছুই প্রায় নির্দিষ্ট ছিল না মাঠটি ছিল ত্রিকোণাকৃতিবিশিষ্ট, খেলোয়াড়ের সংখ্যা প্রায়ই বাইশ ছাড়িয়ে যেতো, দু’দলের সংখ্যাসাম্যও সর্বদা রক্ষিত হতো না। আর খেলার সময়? ওটার কোনো নির্দিষ্ট সীমা ছিল না—অন্ধকার এসে মাঠটাকে পুরোপুরি গ্রাস না করা পর্যন্ত যতক্ষণ বলটা দেখা যেতো আমরা চালিয়ে যেতাম।

আমি দুই টাকা চাঁদা দিয়েছি, আমি ক্যাপ্টেন, সুতরাং আমার হেপাজতেই বলটা থাকবে। পড়ার টেবিলের উপর বলটাকে আমি এমন ভাবে পেন্ডুলামের বলের মতো টাঙিয়ে রাখতাম যাতে পড়ার ফাঁকে ফাঁকে বলটাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পাই এবং প্রয়োজনবোধে দু’একটা ঢুঁসও লাগাতে পারি। বলের চামড়ায় মাখন মাখলে চামড়াটা মসৃণ থাকে, বল বেশিদিন টেকে। আমার অনুরোধে মা বলের জন্য কিঞ্চিৎ মাখন বরাদ্দ করেন। জমানো দুধ মন্থন করে মা মাঠা বানাতেন, মন্থনের সময় মাঠার উপরে মাখনটা ভেসে উঠতো—সেই মাখন আগুনে জ্বাল দিয়ে ঘি বানাতেন। মাঝে মাঝে মাখনমাখা হাত নিয়ে তিনি আমার পড়ার ঘরে আসতেন, আমারনাকেমুখে মাখন মাখিয়ে মাখিয়ে দিতেন। আমি আমার নিজের মুখটার চাইতে বলটাকেই বেশি পছন্দ করতাম। মাঝে মাঝে বাধ্য হয়েই মাখন চুরি করতে হতো। শ্রীকৃষ্ণ নিজের জন্য মাখন চুরি করতেন, আমি করতাম আমাদের বলটার জন্য। এখানেই শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে আমার পার্থক্য।


বাবার মুখে রবীন্দ্রনাথ – মাইকেল সম্পর্কে যেসব গল্প শুনতাম, তাতে আমার শিশু মনে কবি-সম্পর্কিত যে ধারণাটিবদ্ধমূল হয়েছিল— কবিরা সাধারণ মানুষ নন, তাঁরা ভগবান কর্তৃক প্রেরিত এক বিশেষ ধরনের মানুষ।


এই ছেলেবেলার রচয়িতা যদি বড় হয়ে নামজাদা ফুটবলার হতো, তাহলেই বোধহয় বিধাতা রচয়িতার প্রতি সুবিচার করতেন। বড় হয়ে নামকরা ফুটবল খেলোয়াড় হওয়ার কথাই ভাবতাম। কবি হওয়ার ব্যাপারটা আমার একবারও মাথায় আসতো না। আমি তা ভাবতে যাবোই বা কেন? কবি যে হওয়া যায়, কবি যে হতে হয়, এমন দৃষ্টান্ত আমার চারপাশে আদৌ ছিল না। বাবার মুখে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বা মাইকেল সম্পর্কে যেসব গল্প শুনতাম, তাতে আমার শিশু মনে কবি-সম্পর্কিত যে ধারণাটিবদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল, তা হচ্ছে কবিরা সাধারণ মানুষ নন, তাঁরা ভগবান কর্তৃক প্রেরিত এক বিশেষ ধরনের মানুষ।

‘লেখাপড়া করে যেই গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সেই’—এই উপদেশটাকেই আমি সত্য বলে মানতাম। লেখাপড়া করতাম বড়কিছু একটা হওয়ার জন্য নয়, চাকরি করে বাবার দুঃখ দূর করার জন্য, পরিবারের উপর নেমে আসতে  থাকা অভাবের কালোমেঘটার মুখোমুখি রুখে দাঁড়ানোর শক্তি লাভের জন্য। লেখাপড়া করতাম বটে, কিন্তু তাতে আমার অন্তরের সায় ছিল না, আমার আনন্দ ছিল খেলায়।

বল্টু দিয়ে এক ধরনের খেলা তখন খুব চালু হয়েছিল। আমাদের এক জ্ঞাতি  ভাগ্নে সন্তোষ ছিল আমাদের  সহপাঠী—বল্টু খেলার পোকা। সে লেখাপড়ায় আমার সঙ্গে না-পারার শোধ তুলতো বল্টু খেলায় আমাকে প্রায় নিয়মিত হারিয়ে দিয়ে। বল্টু খেলায় হারতে হারতে আমার পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকলো তখন আমার চোখ পড়লো ভেঙে পড়ে থাকা আমাদের বাড়ির সামনের স্কুল ঘরটির দিকে। ঐ প্রকান্ড টিনের ঘরটিতে বল্টুর অভাব ছিল না—আমি লুকিয়ে লুকিয়ে ঐ স্কুলঘর থেকে বল্টু সংগ্রহ করতে থাকি। পরে অন্যরাও ব্যাপারটা জেনে যায় এবং তারাও গোপনে গোপনে ঐ ঘর থেকে বল্টু সংগ্রহ করতে থাকে। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই ঐ ঘরের টিনের চাল এবং টুই ঘরের কড়িবর্গা থেকে পৃথক হয়ে যেতে শুরু করে। আমার বাবা ব্যাপারটা ধরে ফেলেন। বল্টুর বাঁধন থেকে আলগা হয়ে যাওয়া টিনগুলি সহজেই চুরি হয়ে যেতে পারে ভেবেই বাবা প্রায় ছিন্ন হতে বসা টিনগুলো বাড়িতে নিয়ে আসেন এবং কিছুদিনের মধ্যেই যোগীশাসনের হরেন্দ্র সরকার এবং যশমাধবের রফিজ খাঁ সাহেবসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে একটি স্কুল পুনঃনির্মাণ কমিটি গঠন করা হয় এবং স্কুলটিকে আবার চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দীর্ঘদিন মরা  হাতীর মতো মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা স্কুলটি আবার মাথা তুলে দাঁড়ায়। আমাদের বল্টু খেলার ঐ একটা বাস্তব সুফল ফলেছিল। স্কুলটি নব-উদ্যমে যাত্রা শুরু করে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সাহায্যের হাত প্রসারিত করেন। কয়েকজন শিক্ষক নিয়োগ করা হয় এবং পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে ছেলেমেয়েরা এসে এই স্কুলে ভর্তি হতে শুরু করে। স্কুলটি পুনরায় চালু হওয়াতে আমাদের গ্রামের হৃতগৌরব ফিরে আসে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!