- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- নভেম্বর ১৬, ২০২৫
হিরণবালা । পর্ব ২৯
ট্রেনে ফিরতে ফিরতে হিরণ ভাবছিল, এই তার দেশ ? মাত্র বছর পঁচিশ স্বাধীন হয়েছে , এর মধ্যেই দেশটাকে কুরে খেতে শুরু করেছে ঘুষের ঘুণ ? প্রশ্নটা মনে আসতেই আবার ওর মনে হল, কিন্তু এই সিস্টেমের মধ্যেই তো ও খুঁজে পেয়েছে হরিহর ভৌমিককে। হিরণের মনে হল মানুষের জীবন যদি সাদা কালোয় মেশা হয়, তাহলে দেশই বা হবে না কেন ?.... তারপর
৫৫
পরপর দুটো ভালো খবর একসঙ্গে এসে পৌঁছল। গতবারের অভিজ্ঞতার পর থেকে একটু চিন্তাতেই ছিল হিরণ। ভাবছিল এবারও বুঝি গোবিন্দর সম্বন্ধটা শেষ মুহূর্তে ভেঙেই যাবে। কারণ, একদিন আগেই সুরেন গোসাই জানিয়েছিল যে, পাত্রীকে ওদের খুবই পছন্দ হয়েছে হিরণ জানিয়ে দেওয়ার পরেও পাত্রীপক্ষ একটু গাঁইগুঁই করছে শেষ মুহূর্তে দূরত্বের কথা ভেবে। রামসাগর থেকে ভজুডি যাওয়ার ট্রেন খুবই কম। সময়ও লাগে অনেকখানি। এটাই নাকি ওদের শেষ মুহূর্তে মাথাব্যথার কারণ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গতকাল সন্ধেবেলা সুরেন গোঁসাই এসে জানিয়েছে, পাত্রীপক্ষ রাজি। এবার ওরাই এখানে আসবেন পাকা কথা বলতে। হিরণদের দাবি দেওয়া কি জেনে নিতে। দাবি দেওয়া আবার কী থাকবে। পণ নেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। যেভাবে সত্যর বিয়ে হয়েছিল, সেভাবেই গোবিন্দরও বিয়ে হবে। কাল সন্ধেবেলা এই খবর দিয়েছিল সুরেন গোঁসাই আর আজ হাসপাতালে এসেই হিরণ হাতে পেল ওর ট্রান্সফার অর্ডার। ওর দরখাস্ত যে বাঁকুড়ার সিএমওইএইচ অফিস থেকে কলকাতায় চলে গেছে সেটা দিন পনেরো আগে ফোন করে হরিহর ভৌমিককে জানিয়েছিল হিরণ। আর আজই হাতে চলে এলো ট্রান্সফার অর্ডার। ট্রান্সফার হয়ে গেছে বেলিয়াতোড় হেলথ সেন্টারে। হরিহর ভৌমিক দেবদূত ছাড়া আর কী !
হিরণের। মনে হল ওর শরীরেরই একটু অংশ ঝুমু। ওর উত্তরসূরী। বাঁকড়ি ভাষায় কথা বলে এখন ও। কিন্তু ওর শরীরে তো আসলে বইছে পদ্মাপারের রক্ত। বইছে সেই মানুষটার রক্তও। ওর মধ্যেই তো বেঁচে রয়েছে এক টুকরো বাংলাদেশ
ডাক্তার শিট হিরণকে বললেন, আর কী ! আপনার তো এই হাসপাতাল থেকে ছুটি হয়ে গেল।
হিরণ বলল, আপনে না থাকলে এ কায হইত না ডাক্তারবাবু।
ডাক্তার শিট বললেন, আমি তো নিমিত্ত মাত্র। আসল কাজটি তো করেছেন আপনার হরিহর ভৌমিক। ওঁর ভূমিকা আপনার জীবনে অসামান্য।
হিরণ বলল, এক্কারে ঠিক কইসেন একথা। উনি মানুষ না। দেবদূত।
ঠিক দু-দিন পরে হিরণকে আশ্চর্য করে দিয়ে হরিহর ভৌমিকের চিঠি পেল হিরণ। ছোট্ট চিঠি। হরিহর ভৌমিক লিখেছেন,
কল্যাণীয়াসু হিরণবালা কর,
আগামীকাল আমি চাকুরি হইতে অবসর গ্রহণ করিব। অবসর গ্রহণের পূর্বে এইটুকু শান্তি পাইয়াছি এই ভাবিয়া যে, আমি তোমার অনুরোধ রক্ষা করিতে পারিয়াছি। আশা করি তোমার সাংসারিক যেসব অসুবিধার কথা বলিয়াছিলে, এইবার সেগুলির সুরাহা হইবে।
এই অফিসে আসিলে ইহার পর আর আমাকে পাইবে না। কিন্তু ভবিষ্যতেও তোমার এই অফিসে আসিবার প্রয়োজন হইতে পারে ভাবিয়া আমি সোমনাথ দত্তকে তোমার ব্যাপারে সমস্ত কিছু বলিয়া দিয়াছি। সোমনাথ দত্ত আমার পাশের টেবিলে বসে। বয়স কম। এখনও অনেকদিন উহার চাকরি আছে। কোনো প্রয়োজন হইলে ইহার পর আসিয়া উহার সঙ্গে যোগাযোগ করিবে।
ভালো থাকিও।তোমার মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী
হরিহর ভৌমিক
চিঠিটা পড়ে হিরণের কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। জীবনে অনেক মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী হিরণ আজ অবধি পেয়েছে। কিন্তু, হরিহর ভৌমিকের চেয়ে বড়ো মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী সত্যিই আর পেয়েছে কি ? চিঠিটায় হরিহর ভৌমিক লিখেছেন নিজের অফিসের ঠিকানা। নিজের বাড়ির ঠিকানা দেননি। এই চিঠির যে উত্তর হিরণ দেবে, সেটিও তাই সম্ভব নয়। হরিহর ভৌমিকের জন্য ও এই জীবনে কিছুই করেনি। ভবিষ্যতেও কিছু করতে পারবে কি না জানে না। এরপর তো ওঁকে খুঁজে পাওয়াই কঠিন হবে হিরণের জন্য। মানুষটা ওঁকে শুধু দিয়েই গেলেন। কিছু মানুষ হয়তো পৃথিবীতে আসেনই এই কাজ করতে। অন্যকে দিতেই কেবল। কিছু নিতে নয়। ভাবতেই টপটপ করে চোখ দিয়ে জল ঝরতে লাগলো হিরণের। আজ ও হাসপাতালে ওর সঙ্গে নিয়ে এসেছিল নাতনি ঝুমুকে। হিরণ কাঁদছে দেখে ঝুমু প্রথমে অবাক হয়ে গেল। তারপর ওর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে আধো আধো গলায় জিজ্ঞেস করল, ঠাম্মা কাঁদছিস ক্যানে ?
ওর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রাণ ভরে উঠল হিরণের। ওর মনে হল ওর শরীরেরই একটু অংশ ঝুমু। ওর উত্তরসূরী। বাঁকড়ি ভাষায় কথা বলে এখন ও। কিন্তু ওর শরীরে তো আসলে বইছে পদ্মাপারের রক্ত। বইছে সেই মানুষটার রক্তও। ওর মধ্যেই তো বেঁচে রয়েছে এক টুকরো বাংলাদেশ। গোবিন্দর বিয়েটা ঠিক হয়ে যাওয়ার পর হিরণ ভাবছিল, গোবিন্দর বিয়েটা ঠিকঠাক দিয়ে দিতে পারলে ওর ঘাড়ে আর তেমন দায়িত্ব থাকবে না। কিন্তু এখন ঝুমুর দিকে তাকিয়ে ওর মনে হচ্ছে, ওকে অনেক অনেক দিন বেঁচে থাকতে হবে। ঘোঁতন এখনও কলেজে পড়ছে। কুট্টি স্কুলে পড়ে। ঝুমু সবে আধো আধো কথা বলছে। এদের সবাইকে বড়ো করতে হবে। গোবিন্দর সন্তান হলে তাদেরও বড়ো করতে হবে। ওর মনে হল মানুষের মায়ের দায়িত্ব কোনোদিন শেষ হয়ে যায় না। বাঘের বাচ্চাকে বড়ো করে দিতে পারলেই বাঘের মায়ের মুক্তি। কিন্তু মানুষের মা কোনোদিন মুক্তি পায় না।
৫৬
গোবিন্দর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। মাঘ মাসে গোবিন্দর বিয়ে। মাঘের শীতে নাকি বাঘ পালায়। সেই ভয়ংকর ঠান্ডাতেই বিয়েবাড়ির সব আয়োজন করতে হবে। রামসাগরে ভালোই শীত পড়ে। সমীরকান্তি বোস বলেছেন ভজুডিতে শীত পড়ে তার চেয়ে আরও অনেক বেশি। কিন্তু কিছু করার নেই। ট্রান্সফারের চিঠি পাওয়ার পর থেকে ক-টা মাস বেলিয়াতোড় যাওয়াটা ঠেকিয়ে ঠেকিয়ে রেখেছিল হিরণ। এইবার আর ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। গোবিন্দর বিয়ে দিয়েই হিরণ রামসাগরের পাততাড়ি গোটাবে।
নকশালরা রাজ্যজুড়ে বন্ধ ডাকছে। বিহারেও ওদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। তরুণ ঝকঝকে ছেলেপুলে এই আন্দোলনে জড়িয়ে গিয়েছে। পুলিশের গুলিতে মারাও যাচ্ছে । তারাও মারছে গ্রামেগঞ্জে, শহরে, অনেককেই। এই ধরনের আন্দোলন করে দেশের যে কী উন্নতি হবে তা নিজের ছোট্ট বুদ্ধিতে বুঝেই উঠতে পারছে না হিরণ। রক্তপাতের এই রাজনীতি আরও কতদিন চলবে ও জানে না
বেলিয়াতোড়েই হয়তো ওর বাকি জীবনটুকু ওকে কাটিয়ে দিতে হবে। ইতিমধ্যেই সত্য স্কুলের কোয়াটার্স নেওয়ার জন্য অ্যাপ্লাই করেছে। স্কুলের কোয়ার্টার্সগুলো খুব বড়ো নয়। দুটো ঘর। ছোটো বারান্দা। এক চিলতে রান্নাঘর আর বেশ বড়ো উঠোন। তারই এক কোণে বাথরুম। আর এক কোণে পায়খানা। স্কুলের খেলার মাঠটা পাশেই। স্কুল কোয়াটার্সের চত্বরটা বড়ো বড়ো আম গাছ দিয়ে ঘেরা। যে কোয়ার্টারটা সত্য পাবে বলে শুনেছে তার সামনেই আছে একটা ফলসা গাছ। চারপাশে অনেক করবী ফুলের গাছ। জায়গাটা চমৎকার। হিরণ একদিন গিয়ে দেখে এসেছে।
গোবিন্দর বিয়ের পরিকল্পনাটাই এখন ঠান্ডা মাথায় করতে হবে হিরণকে। আপাতত এটাই ওর শেষ বড়ো কাজ। আবার ওকে মুখোমুখি হতে হবে দাদার। ও জানে না এই বিয়েবাড়িতে দাদা কী ভূমিকা নেবে। এবারও যথারীতি ওকে সুরেন গোঁসাই আর গোবিন্দর বন্ধুদের ওপরেই অনেকখানি নির্ভর করতে হবে। আরও একটা দুশ্চিন্তা ওর মাথার মধ্যে ঘুরছে। বন্ধের কারণে সত্যর বিয়ের সময় বরযাত্রীদের রামসাগর থেকে কলকাতা নিয়ে যেতেই অনেক ঝক্কি পোহাতে হয়েছিল হিরণকে। সেই স্মৃতি ফিরে ফিরে আসছে। বলা যায় না এবার কী হবে। মাঝে মাঝেই এখন নকশালরা রাজ্যজুড়ে বন্ধ ডাকছে। বিহারেও ওদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। তরুণ কিছু ঝকঝকে ছেলেপুলে এই আন্দোলনে জড়িয়ে গিয়েছে। পুলিশের গুলিতে মারাও যাচ্ছে তাদের অনেকে। তারাও মারছে গ্রামেগঞ্জে, শহরে, অনেককেই। এই ধরনের আন্দোলন করে দেশের যে কী উন্নতি হবে তা নিজের ছোট্ট বুদ্ধিতে বুঝেই উঠতে পারছে না হিরণ। রক্তপাতের এই রাজনীতি আরও কতদিন চলবে ও জানে না। এই রাজনীতির ছাপ ওর জীবনে সত্যিই তেমনটা পড়েনি। কিন্তু, এবার ও ভয় পাচ্ছে এটা ভেবেই যে, পাছে আবার গোবিন্দর বিয়ের দিনই বা বৌভাতের দিনই একটা বন্ধ ডেকে দেয় নকশালরা ! ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে তো ডরাবেই। আর কলকাতা রামসাগর থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ। কিন্তু ভজুডি তো বহুদূর !
লাবণ্যর ট্রাংকল পেয়ে হিরণ স্তম্ভিত হয়ে গেল। ভেবেছিল অশোকনগরে যাবে গোবিন্দর বিয়ের জন্য লাবণ্যদের নেমন্তন্ন করতে। প্রথমে দাদার কাছে গিয়ে ও আর সত্য যাবে অশোকনগরে। এখন পুরো উলটে গেল ব্যাপারটা। ওকে প্রথমে যেতে হবে অশোকনগরে। সেখান থেকে যাবে দাদার কাছে
এবার তবে একটা সুবিধে হিরণের হয়েছে। সত্য আছে। ওর মাথা অনেক ঠান্ডা। যে-কোনো কাজ অনেক গুছিয়ে সম্পন্ন করতে পারে। গোবিন্দর মধ্যে ওই মানুষটার বাউন্ডুলে স্বভাব অনেকটা আছে। এখনও যেন ছেলেমানুষই রয়ে গেছে ও। সত্যর মধ্যে এটা একেবারেই নেই। ও অনেক হিসেব করে চলতে পারে। আগু-পিছু, ভালো-মন্দ ভেবে কাজ করে। সত্য যেমন ইতিমধ্যেই হিরণকে বলেছে, দাদাকে নেমন্তন্ন করতে হিরণ আর সত্য দু-জনেই যাবে। মামির কাছ থেকে খুব ভালো ব্যবহার সত্য সবসময় পায়নি। তবে এটাও সত্য বলেছে যে, মামারা না থাকলে তো ওর পড়াশুনাটুকুই ঠিক ভাবে হত না। এই কথাটা তো ভুল নয়। দাদার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে দাদা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে হিরণ জানে না। তবে সত্যর কথাটা ও মেনে নিয়েছে। দাদার কাছে যাবে সত্যকে নিয়ে।
বিয়ের প্রস্তুতি যখন তুঙ্গে, তখনই এল ভয়ংকর সেই খারাপ খবরটা। মাত্র দু-দিনের জ্বরে চলে গেছে অনন্তলাল। লাবণ্যর ট্রাংকল পেয়ে হিরণ স্তম্ভিত হয়ে গেল। ভেবেছিল অশোকনগরে যাবে গোবিন্দর বিয়ের জন্য লাবণ্যদের নেমন্তন্ন করতে। প্রথমে দাদার কাছে গিয়ে ও আর সত্য যাবে অশোকনগরে। এখন পুরো উলটে গেল ব্যাপারটা। ওকে প্রথমে যেতে হবে অশোকনগরে। সেখান থেকে যাবে দাদার কাছে। অবশ্য অশোকনগরেই ওর দাদার সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে। অনন্তলালের মৃত্যুটা খানিকটা স্তম্ভিতই করে দিয়ে গেল হিরণকে। সারা জীবন মানুষটা সেভাবে কোনো কাজই করল না। করতে পারলই না। জীবনটাকে কেমন যেন ছেলেখেলার মতোই নিয়েছিল অনন্তলাল। কোনো কিছুতেই ওর যেন কোনো ভ্রূক্ষেপ হত না। চলেও গেল সেভাবে। মৃত্যুকে যেন পরোয়া না করেই। লাবণ্যর কী হবে, মেয়ে দুটোর কী হবে, সেসব বিন্দুমাত্র না ভেবেই। এইরকম ভাবে বাঁচতে পারলে জীবনটা বোধহয় সুখেরই হয়। অন্তত কোনো দুশ্চিন্তা থাকে না। ভাবতে হয় না কাল কী হবে। ভাবতে হয় না আর একটা মানুষ আমার কথায় কী ভাবল। হিরণের মনে হল ওরা যতই তাকে গালমন্দ করুক, অনন্তলাল আসলে সুখীই ছিল। জানত এই পৃথিবীতে ওর ভূমিকাটা ঠিক কী। তাই কারও কোনো কথাতেই ওর কোনো হেলদোল ছিল না। হিরণের মনে হল, সংসারে সন্ন্যাসীই ছিল লোকটা।
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
ক্রমশ..
আগের পর্ব পড়ুন: হিরণবালা । পর্ব ২৮
❤ Support Us









