Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • নভেম্বর ৩০, ২০২৫

হিরণবালা । পর্ব ৩১

পুলিশ র‍্যান্টকেও খুঁজছে । ওর নেতারা ভজুডির আস্তানার খোঁজ পেলেও হিরণদের বাসার খোঁজ পায়নি । একটা ছেলে সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইলে, তাকে সেই সুযোগটুকু দেওয়া উচিত, এই ভেবেই র‍্যান্ট ওদের সঙ্গে রেখে দেয় হিরণ । এতে সুবিধেই হয়েছে, সংসারের অনেক কাজ করে দেয় র‍্যান্ট । আর মাঝেমাঝে দরজা বাজিয়ে গান গায় । ঘরের মধ্যে ঘুরতে থাকে সলিল চৌধুরী আর ভূপেন হাজারিকার সুর ... তারপর

অংশুমান কর
হিরণবালা । পর্ব ৩১

চিত্রকর্ম: দেব সরকার

 
৫৯

 
আবার সেই বেলিয়াতোড় বেশ কিছু চেনা মানুষজন আর অনেক অচেনা মানুষজন নিয়ে বেলিয়াতোড় যে কেমন একটা অন্য রকমের জায়গা হয়ে গিয়েছে এই কবছরে সেটা এই কদিনেই বেশ বুঝে গিয়েছে হিরণ সত্যর স্কুলের কোয়ার্টার্সেই এইবার ওর সংসার গুছিয়ে নিতে হচ্ছে কোয়ার্টার্সটি ছোটো কিন্তু চারপাশের পরিবেশ বড়ো সুন্দর কোয়াটার্সেই গায়েই স্কুলের খেলার মাঠসামনেপেছনে অনেকখানি করে জায়গা ফাঁকা এসব জায়গা স্কুলেরই সামনের ফাঁকা মাঠের একটু দূরেই বাঁহাতে স্কুলের হোস্টেল যেখানে ছাত্ররা থাকে আর থাকেন কিছু মাস্টারমশাই সত্য এতদিন ওখানেই থাকত ওদের কোয়াটার্সের চারপাশে আরও তিনটি কোয়াটার্স তার মাঝে মাঝে বড়ো বড়ো আমগাছ ওদের কোয়াটার্সের ঠিক পিছনেই ছোটো ছোটো গাছের ঝোপতার মধ্যে আছে কাগজি লেবুর গাছ বড়ো একটা বেলগাছও পুজোর জন্য বেলপাতা পাওয়া এখন আর সমস্যার নয় রামসাগরে বেলপাতা পেতে খুবই সমস্যায় পড়ত হিরণ কোয়াটার্সের সামনেই একটা বিরাট বড়ো ফলসা গাছ একটু দূরেই অনেক টগর আর করবী ফুলের গাছ তারও আরেকটু দূরে দুটো খেজুর গাছ কেমন যেন একা একাই দাঁড়িয়ে আছে এখানের মাটি খুব রুক্ষ কিন্তু তাও কেমন একটা যেন মায়া আছে এই এলাকাটায় এটাকে ঠিক একটা পাড়াও বলা যাবে না কারণস্কুলের কোয়ার্টারসগুলো ছাড়া বাড়ি আছে আর মাত্র দুটি চারপাঁচটি বাড়ি নিয়ে কি আর একটা পাড়া হয় একটা বাড়ি ইলেকট্রিক অফিসের উলটোদিকে আরেকটা বাড়ি ওদের কোয়ার্টারস থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে সেটি একটি দোতলা বাড়ি হাইস্কুলেরই শিক্ষক কন্দর্পনারায়ণ শিটের কন্দর্পর সঙ্গে সত্যর ভাব হয়ে গেছে খুবই ওদের পরিবারের সঙ্গেও হিরণের পরিবারের চমৎকার সম্পর্ক হয়ে গেছে এই কদিনে স্কুলের কোয়ার্টাসগুলোতে যেমাস্টারমশাইরা রয়েছেন তাঁদের পরিবারের সঙ্গেও ওদের খুবই দহরমমহরম হয়ে গেছে বাড়ির খাবার ওবাড়িতে যেতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই তবেঅচেনা লোকও প্রচুর এই জায়গাটা মোটামুটি দুটি শহরের মাঝামাঝি বলে বাঁকুড়া আর দুর্গাপুর থেকে বেশ কিছু মানুষ এখানে এসে জমি কিনে থাকতে শুরু করেছে বেশ কিছু বাড়ি ইতিমধ্যেই হয়েছে ইলেকট্রিক অফিসের পেছন দিকটায় এদিকটাতেও স্কুলের জমির আশেপাশে যেসব জমি আছে সেগুলোও ইতিমধ্যেই বিক্রি হতে শুরু হয়েছে সত্যও হিরণকে একবার জিজ্ঞেস করেছে এখানে জমি কিনে ফেলা ঠিক হবে কি না হিরণ অবশ্য এখনই জমি কেনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে নারাজ ওকে অবশ্য এখানে জমি কিনে নেওয়ার কথা বলেছেন শ্রীকৃষ্ণ হালদার
 

হিরণ জেনেছে১৯৫২ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত যেউদ্বাস্তুরা শিয়ালদা স্টেশনে আসতেন, তাদের ট্রাক ভরতি করে রাতের বেলায় হাওড়া থেকে তুলে দেওয়া হত হাওড়াচক্রধরপুর প্যাসেঞ্জারে কামরার দরজায় নাকি তালা লাগিয়ে দেওয়া হত, যাতে মানুষগুলো পছন্দমতো কোনো স্টেশনে নামতে না পারেন এঁদের নামানো হত পিয়ারডোবা আর ওন্দা স্টেশনে

 
শ্রীকৃষ্ণ হালদার থাকেন বাঙালপাড়ায় এই পাড়াটা আগে ছিল না এর আগে যখন সামান্য কিছুদিন বেলিয়াতোড়ে ছিল হিরণতখন এই পাড়াটার অস্তিত্বই ছিল না কিন্তু এখন বাংলাদেশ থেকে এদেশে চলে আসা বেশ কিছু মানুষ থাকে বাঙালপাড়ায়ইলেকট্রিক অফিস থেকে যেরাস্তাটা চলে গেছে বাঁকুড়ার দিকে তার বাঁহাতে এই কলোনি গড়ে উঠেছে হাসপাতালেই প্রথম শ্রীকৃষ্ণ হালদারের সঙ্গে পরিচয় হয় হিরণের আগেরবার এসে বেলিয়াতোড়ে বাঙাল ভাষায় কাউকেই কথা বলতে শোনেনি হিরণশ্রীকৃষ্ণ হালদারের মুখে নিজের দেশের ভাষা শুনে তাই খুব তাড়াতাড়ি বন্ধুত্ব হয়ে গেছিল হিরণের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ হালদারের
 
শ্রীকৃষ্ণ হালদারও হিরণেরই বয়সি ওঁর কাছ থেকে যা জানতে পেরেছে হিরণ তা অবাক করার মতো ওর কোনো ধারণাই ছিল না যেবাঁকুড়া জেলাতে বাংলাদেশের এত মানুষ এখন বসবাস করে শ্রীকৃষ্ণ হালদারের কাছ থেকে হিরণ জেনেছে যে১৯৫২ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত যেউদ্বাস্তুরা শিয়ালদা স্টেশনে আসতেন তাদের ট্রাক ভরতি করে হাওড়ায় নিয়ে এসে রাতের বেলায় হাওড়া থেকে তুলে দেওয়া হত হাওড়াচক্রধরপুর প্যাসেঞ্জারে কামরার দরজায় নাকি তালা লাগিয়ে দেওয়া হত যাতে মানুষগুলো নিজেদের পছন্দমতো কোনো স্টেশনে নামতে না পারেন এঁদের নামানো হত পিয়ারডোবা আর ওন্দা স্টেশনে এই দুটো স্টেশন থেকে এঁদের আবার ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হত বাসুদেবপুরশিরোমণিপুর আর সাবানপুর ক্যাম্পে এই দুটো ক্যাম্পে প্রায় দশ হাজার শরণার্থী পরিবারের থাকার ব্যবস্থা করেছিল সরকার পিয়ারডোবায় ছিল আর একটা ক্যাম্প সেখানে রাখা হয়েছিল সহায়সম্বলহীন বৃদ্ধবৃদ্ধাদের ১৯৫৭ সালে এই পরিবারগুলোর অনেকগুলোকেই রাজস্থানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল যারা যেতে চায়নিতাদের ডোল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল তারপর ১৯৬১ সালে এই ক্যাম্পগুলোকেই পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় সরকার এই ক্যাম্পগুলো বন্ধ হয়ে গেলে দেশছাড়া ওই মানুষগুলো দামোদর ও দ্বারকেশ্বর নদীর চরে খাসজমিঅনাবাদি জমি দখল করে থাকতে শুরু করে সরকার এগুলোকে বলছিল জবরদখল কলোনি শ্রীকৃষ্ণ হালদার বলেছিলেন যেগোটা বাঁকুড়া জেলাতে নাকি চল্লিশটার মতো জবরদখল কলোনি আছে সবাই অবশ্যই এই জবরদখল কলোনিতে জায়গা পায়নি অনেকেই নাকি ভিক্ষা করে দিন কাটাচ্ছে আর শ্রীকৃষ্ণ হালদারদের মতো অনেকেই চলে এসেছেন বেলিয়াতোড়বড়জোড়ার মতো নানা জায়গায় গড়ে তুলেছে ছোটো ছোটো পাড়াএক ধরনের জবরদখল কলোনিই এগুলো এতসব বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছেন বলেই বোধহয় শ্রীকৃষ্ণ হালদার হিরণকে বলেছেনদাম কম থাকতে থাকতে এই অঞ্চলে জমি কিনে নিতেকিন্তুবেলিয়াতোড়ে জমি কেনার ব্যাপারে এত তাড়াহুড়ো হিরণ করতে চায় না ও আর কটাদিন অপেক্ষা করতে চায়

 
৬০

 
গীতা এসেছে সঙ্গে কুট্টি অনেকদিন পরে গীতা এল মানে এইভাবে কোনো কারণ ছাড়াই কেবল হিরণের কাছে কটা দিন থাকতে কুট্টি একেবারেই ঘোঁতনের মতো নয় দুই ভাইয়ের মধ্যে মিলের চেয়ে অমিলই বেশি হিরণরা বেলিয়াতোড়ে আসার কয়েক দিন পরেই র্যান্ট ফিরে গেছে ভজুডিতে ্যান্ট থাকলে র্যান্টের সঙ্গে কুট্টির যে দারুণ ভাব হয়ে যেত তা নিয়ে হিরণের কোনো সন্দেহই নেই কুট্টি দিনরাত ছটফট করছে মুহূর্তের মধ্যে চোখের আড়াল হয়ে যাচ্ছে বড়ো রাস্তাটা দিয়ে বাসট্রাক চলে বাঁকুড়া আর দুর্গাপুরের মধ্যে কুট্টি সেই রাস্তা পেরিয়ে চলে যাচ্ছে বাঙালপাড়ায় সেখানে ইতিমধ্যেই বন্ধুও বানিয়ে ফেলেছে ও ওকে গীতা কোন্নগরে কী করে একা একা সামলায় ভেবে সত্যিই অবাক লাগছে হিরণের
 
এই কবছরে গীতাও পালটে গিয়েছে অনেকটা আগে তেমন খেয়াল করেনি হিরণ এবারেই হঠাৎ মনে হল গীতাকে কেমন যেন অন্যরকম লাগছে কোনো কোনো জিনিস আসলে হঠাৎ করেই একদিন চোখে পড়ে হয়তো আগেও বারবার দেখা হয়েছে সেজিনিসকিন্তু তখন তেমন করে খেয়াল করা হয়নি এ বারই যেমন হিরণের মনে হচ্ছে গীতা বেশ মোটাসোটা হয়ে গেছে কেমন একটা গিন্নিবান্নি ভাব এসে গেছে চেহারাটার মধ্যে ডাক্তার চরণ গীতাকে দেখলে নিশ্চিত বলবেনওর সবকটা টেস্ট করান সিস্টার ওবেসিটি হচ্ছে হাজারটা রোগের আঁতুরঘর শরীরে এত ফ্যাট ভালো নয়
 
বেলিয়াতোড় হেলথ সেন্টারের ডাক্তারবাবুর নাম পিচরণ একদিক থেকে হিরণের ভাগ্য খুব ভালো চাকরি জীবনে হরিহর ভৌমিকের মতো একজন দেবতার অভিভাবকত্বই কেবল পায়নি ওযেসমস্ত ডাক্তার বাবুদের অধীনে ও কাজ করেছেতাঁরা সকলেই ভীষণ ভালো এক একজন একেক রকম কিন্তু মানুষ হিসেবে প্রত্যেকেই খুবই ভালো যখন যা প্রয়োজন হয়েছেসেই সাহায্য হিরণ এঁদের সকলের কাছ থেকেই পেয়েছে
 

মানুষের মধ্যে সবসময় বোধহয় একজন শিশু বেঁচে থাকে হিরণ ভাবেএই শিশু কি ওর মধ্যেও আছে ছোটোবেলায় কত ছোটো ছোটো জিনিস দেখে ওর মন ভরে যেতহয়তো ঘরের পাশে ফুটেছে ছোট্ট একটা ফুলসেটা দেখেই মনে হতআহা কী চমৎকার পদ্মা দেখলে তো আর আনন্দবাদ মানত না এখন তো আর সেরকমটা মনে হয় না

 
কোয়াটার্সের যেটা রান্নাঘরসেটাকেই ওর আর ঘোঁতনের থাকার ঘর বানিয়ে নিয়েছে হিরণ দুটো ঘরের একটায় থাকে সত্যঝুমু আর মঞ্জু আরেকটায় গোবিন্দ আর রত্না এখন গোবিন্দ আর রত্নার সঙ্গে রাত্রিবেলা শুচ্ছে কুট্টি আর গীতা আজ হিরণের নাইট ডিউটি ঘোঁতন স্কুলে গেছে কুট্টি রত্নার পাশে শুয়ে শুয়ে গল্প শুনছে ছোট্ট ঘরটার মধ্যে হিরণ আর গীতা পাশাপাশি শুয়ে শুয়ে পুটুর পুটুর করে গল্প করছে ছোটো ছোটো কথা এসব কথার সবেরই যে খুব গুরুত্ব আছেতা নয় সংসারের ছোটো ছোটো সুখদুঃখের কথা অনেকক্ষেত্রেই তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয় কিন্তুমেয়ের সংসারের এইসব কথা ভাগ করে নিতে ভালোই লাগে হিরণের গীতা দুঃখ করে বলছে মনোরঞ্জনের মাইনে এখনও এতই কম যেকাজের লোক এখনও রাখতে পারেনি ও সারাদিন পরিশ্রম করতে হয় শুনতে শুনতে হঠাৎ হাসি পেল হিরণের ও বললতোরে দেইখ্যা তো সে কথা মনে অয় না বেশ তো নাদুসনুদুস হইয়া গেছস
 
গীতা হেসে বলেকেন যে হইতাসি যানি না মা খাই তো এইটুকু সারাদিন খাইট্যা মরি তবু ক্যামন থপ থপ কইর্যা হাঁটতাসি বলেই খিল খিল করে হাসতে থাকে গীতা ওর দিকে তাকিয়ে হিরণের মনে হয় একটু আগেই যাকে মনে হচ্ছিল বেশ ভারিক্কি গিন্নিবান্নি একজন মহিলাএখন তাকেই মনে হচ্ছে এক্কেবারে শিশু একজন মানুষের মধ্যে সবসময় বোধহয় একজন শিশু বেঁচে থাকে হিরণ ভাবেএই শিশুটি কি ওর মধ্যেও বেঁচে আছে ছোটোবেলায় তো কত ছোটো ছোটো জিনিস দেখে ওর মন ভরে যেতহয়তো ঘরের পাশেই ফুটেছে ছোট্ট একটা ফুলসেটা দেখেই মনে হতআহা কী চমৎকার পদ্মা দেখলে তো আর আনন্দবাদ মানত না এখন তো আর সেরকমটা মনে হয় না ছোট ছোট জিনিস থেকে হঠাৎ করে মন্ত খুশিতে ভরে ওঠে না এই কোয়াটার্সে  থাকায় প্রতিদিন বেলপাতা পেতে সুবিধে হচ্ছে বলে ওর মনে একটা শান্তি আছে কিন্তু কই ফুটে থাকা টগর ফুলকরবী ফুল দেখে ওর মন সেই ছোটোবেলার মতো নেচে উঠছে না তো গীতা এইমাত্র যেভাবে খিল খিল করে হেসে উঠলসেভাবে কি আর হাসতে পারবে ও কোনোদিনই কতদিন ও এই ভাবে হাসেনি ওর হঠাৎ মনে হলকোনো কোনো মানুষের জীবনে এমন একটা ঘটনা ঘটে যেতার মধ্যে বেঁচে থাকা শিশুটা এক মুহূর্তেই মরে যায় এক মুহূর্তেই সেমানুষটা বুড়ো হয়ে যায় হিরণ সেদিনই বুড়ি হয়ে গেছিলযেদিন ওর মানুষটা ওকে ছেড়ে চলে যায় এই এতগুলো বছরেমানুষটা চলে যাওয়ার পর ওই প্রথম কটাদিন ছাড়া ওর যে একটা শরীর আছেসে কথাটাও তো ওর সেভাবে মনেই হল না ও অনেকদিন আগেই যেন বুড়ি হয়ে গিয়েছে শরীরে নয়মনে ওর মনে হল একজন মানুষের শরীরের বয়স আর মনের বয়স সব সময় এক হয় না
 

♦–♦•♦–♦•♦–♦•♦–♦

আগের পর্ব পড়ুন: হিরণবালা । পর্ব ৩০

হিরণবালা । পর্ব ৩০


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!