Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • মে ১২, ২০২৪

ঘুঙুরের শব্দ

আশরাফ উদ্দীন আহমদ
ঘুঙুরের শব্দ

অলঙ্করন: দেব সরকার

 
ঘুঘুডাঙার ঠিক চার মাথা মোড়ের আগায় হাবলের চা-বিড়ি, কমদামি বিস্কুট-লেবুনচুস, পাউরুটি জাতীয় জিনিস নিয়ে চায়ের টঙ। বাঁশের চালার ওপর তিন দিকে দরমা বেড়া, মাথার ওপর খড়ের ছাউনি। ডোবার নীচে বাঁশগুলো বেশ শক্তপোক্ত ভাবেই গাঁঢ়া, যাতে মানুষজনের ভারে কোনো ঝুকি না থাকে। আট-দশ গাঁয়ের মানুষ এসে বসবে, চা-বিড়ি খাবে, খোশ গল্প করবে দু চারটে। স্কুলের সময়ও ছোট-ছোট ছেলে মেয়েগুলো তার টঙে ভিড় করবে, এসব চিন্তা করেই টঙের ওপর ষ্টল দিয়েছে হাবলে।
 
দুপুরের দিকে খদ্দের সেরকম না এলেও প্রাইমারি স্কুল বা ওপাশের মাদ্রাসার কঁচিকাঁচাদের ভিড় দেখা যায়। মাটির চুলো নেভানো থাকে। হয়তো ভেতরে আগুনের উত্তাপ থাকে কিছু। দু’ পাঁচটা ঘরছাড়া মানুষ বসে দীর্ঘসময় আড্ডা-ফাড্ডা দেয়। হাবলেকে কেউ- কেউ জোরাজরি করে, কুসুম-কুসুম পানি দিয়েই চা করতে… তাই খায়, সস্তা বিস্কুট চায়ে ডুবিয়ে। এতেই তাদের জীবন কাটে আর কী ! সুক্ষ্ণ ছন্দ বেশ টের পাওয়া যায়। সবাই পায় না, কেউ কেউ তো পেতেই পারে।
 
স্টলের কোণে বসে ছিলো আলোকদিয়ার আতাউল্লা। চোখ জোড়া লাল টকটকে জবা। কতোদিন যে ঘুমোয়নি কে জানে! আর কত বোতলই সাবড়েছে, তাও বা কে খোঁজ রাখে। আতাউল্লা এখন আলোকদিয়া থাকলেও বিষাহরি গ্রামের খাঁটাল তেঁতুলতলার দিকের মানুষ। সাপাহারের রহমান হাজি ট্রাক চালায় আজ বারো বছর। আগে পোরশা-আমনুরার দিকে মোকারম মিয়ার পিকাপভ্যানের আধা ড্রাইভারি করেছে, ফুল ড্রাইভার হয়েছে রহমানের ট্রাকের। এখন বাড়ি বসে আছে, কোথায় যেন বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে, তাই রহমান আর ট্রাক দেয়নি। হাবলের কাছে বাকিতে চা খায়, গাল-গল্প করে ইনিয়ে বিনিয়ে। কাকে যে গালমন্দ করে সেই জানে, সেভাবে তাকে কেউ ঘাটে না। মাঝে সাঝে ঝাঁঝালো কথাও দু একটা বলে বৈ কি !
 
— নাহ আর মনে হয় দেশে থাকব না গে হাবলে…
 
— কোন দেশে যাবুরে মিয়ার ব্যাটা ।
 
— এদেশে থেকে অনাহারে মরার কোনো মানে…
 
— বিদেশ-বিভূয়ে গিয়ে ডলার আনবে তো !
 
— ভাবছি বাহরাইন বা কাতার লোক নেবে, সেদিকেই উড়ে যাব…
 
হাবলে তাকিয়ে থাকে আতাউল্লার দিকে। নেশার ঝোঁকে বলছে নাকি সত্যিই কথা বলছে আন্দাজ করার চেষ্টা করে। বিদেশ যাবে ঠিক আছে, কিন্তু কী কাজই বা করবে। কোনো প্রশ্ন করার ইচ্ছে থাকলেও এ’ মুহূর্তে করে না। আতাউল্লার বাপ ছিল রঘুনাথপুরের দেওয়ান আজমুতুল্লার খাস সাগরেদ। আলকাপ দলের লোক বটে। হাবলেও কিছুদিন সঙ্গে ছিল, তো ওয়াকিল্লা মিয়া মানুষ ভালো বলেই আজমুতুল্লার সঙ্গে দীর্ঘসময় থেকেছে।
 
কত-কত জায়গায় আলকাপ নিয়ে গেছে… একটা সময় ওয়াকিল্লা মিয়াও আলকাপের গান বাঁধত আজমুতুল্লার দেখাদেখি। রহনপুর-আড্ডা ভোলাহাট-শিবগঞ্জ আমনুরা- নাচোল-পোরশা ওদিকে শিবরামবাজার-সিন্ধীবাজার মালদাহ-মুর্শিদাবাদ-বহরমপুর তামাম তল্লাটে ছড়িয়ে পড়ে তারা বছরের প্রায় সাত-আট মাস। আলকাপের গানে মুগ্ধ হয়ে মানুষজন মাথায় তুলে নিত ওদের। হাবলেও পায়ে বিশাল তামার ঘুঙুর বেঁধে নাচত ষ্টেজে। আহা সে কী নাচের মূদ্রা ! ঘেঁটু গানের কথা মনে পড়ে। ঘেঁটু পুত্রদের গেঁটুয়া বলত, তাদের দেখে কত যুবক পাগল হত, সে কী যেই সেই পাগল, অনেকে তো বিয়ে করতেও উদগ্রীব হত !
 
আজ সে সব দিনের কথা ভাবলে মনটা কোথায় হারিয়ে যায় হাবলের। সেবার তো চককৃত্তির মানুষজন বলেছিল, হাবলের আসল যন্ত্র সাবড়ে দিছে ওয়াকিল্লা মিয়া, এখন তো হিজড়ে-মদনা ! কথাটা সঠিক নয় একবিন্দু, আবার ভুলও বলা যাবে না। ওয়াকিল্লা মিয়া বড়বাড়ির ছেলে কথাটা ঠিক। আলকাপে আসার কারণে বাড়ি থেকে চিরকালের মতো বিতাড়িত করেছে ওর বাপ। বিয়ে করা বউয়ের সঙ্গেও দেখা করা বন্ধ হয় এক সময়। তখন তো মাঝে-সাঝে হাবলেকে নিয়েই শুয়েছে, আর হাবলেও অনেকবারই মিয়ার সাথে… সে সব দিনের ছবিগুলো আজও মনের স্মৃতিপটে জ্বলজ্বলিয়ে ভাসে। কতকালের ছবি সব, কত শতাব্দী যেন হয়ে গেল। কোনোভাবে সরাতে পারে না। সড়ানো যায় না। হয়ত কিছু কিছু স্মৃতি, ভালোবাসা রয়ে যায় জীবনভর। থাকলে দোষ দেবে কী করে !
 

হাবলে নিজেকে মাজা ভাঙা সাপের মতো একটা ঝোঁপের ভেতর কদাচিৎ আবিষ্কার করে,  তারপরও নিজেকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েই আকাশ দেখা, বুক টান করে নিঃশ্বাস নেওয়া নিরন্তর ভেতরে যে আগুন জ্বলে, তার বিস্ফোরণ একদিন সমাজটাকে বহন করতে হতে পারে। বাতাস এসে চুলোর আগুনটাকে আরো প্রজ্জ্বলিত করে তোলে

 
ঘুঘুডাঙার লোকজন দিনে দিন কেমন পালটে যাচ্ছে, কারো মধ্যে আর আগের মতো তেমন মায়া মহাব্বত নেই। সবাই কেমন পর-পর। অনেক দূরের মানুষ। মানুষ সত্যি সত্যিই বদলে যাচ্ছে, বদলে যাওয়া মানুষ দেখলে ভয় করে, ভয়ে বুক শুকিয়ে যায়।
 
— তা মিয়ার ব্যাটা তোমার দাদাও চোখ বুঁজলো আর বাপটাও ঘরে ফিরল…
 
— কী লাভ হলো ! আলকাপ ছেড়ে তোমাদের প্রেম-ভালোবাসা ছেড়ে বাড়ি ফিরে কি আর শান্তিতে ছিল বাপজান, বছর না ঘুরতেই গোরে সিঁধিয়ে গেল, আসলে কি জানো প্রবহমান নদীকে বাঁধতে নেই, ফল উল্টে যায়…
 
— খাঁটি একখান কথা বলেছো ব্যাটা ! চলন্ত কোনো কিছুকেই থামানো উচিৎ নয়, বিপরীত হবেই…
 
— তা তোমাদের ওস্তাদ দেওয়ান আজমুতুল্লা চোখ বুঁজতেই তোমরাই বা আলকাপ ছাড়লে কেন…
বড়ো একটা নিঃশ্বাস ফেলে চুলোতে শুকনো কয়েকটি কাঠ ঠেঁসে তালপাখা দিয়ে বাতাস করতে-করতে হাবলে জানায়, দেওয়ানজির অনেক বয়স হয়েছিল, বলা যায় মহীরুহ, একশত ষোল বছর, তার মৃত্যু আমাদের মনকে ভেঙে দিয়েছিল, তোমার বাপও বলল, আর নয়, এসব পাপ কাজ । অনেক পাপ কুড়ুলাম এবার বাড়িমুখো মানে সংসারমুখি…
 
— কিন্তু কাজটা নেহাৎ অন্যায় ! একটা শিল্পকে ধ্বংস করে দিলে গো…
 
— আর শিল্প ! যাত্রা, ঘেঁটু গান,আলকাপ,গম্ভীরা তো বলে সমাজের ওপরওয়ালারা… কিন্তু একবারও কি তাদের হাঁড়ির খবর নেয়, তারা খেতে পায় কি পায় না…
 
— কেনো রোজগারপাতি কি ছিলো না…
 
— ওই রোজগারে মন ভরলেও পেট ভরে না ব্যাটা ! শুধু নেশায় পড়ে দলের পেছনে ছুটতে হয়, ওখানে জীবন নেই, আছে হাহাকার আর চাপ-চাপ অন্ধকার।
 
— আর মানুষের সম্মান-ভালোবাসার কথা বলছ না যে…
 
— সম্মানের কথা বলো, আধুনিক সমাজের মানুষেরা ওই ঘেঁটু পুত্র অর্থাৎ ঘেঁটুয়াদের মতো আমাদেরও ছি-ঘৃণা করে, দূর-দূর বলে তাড়িয়ে দেয়…
 
— তোমাদের জগৎ রঙের…
 
— রঙের ! সে রঙ ওপরে দেখা যায়, সংসার চালাতে আলকাপ শিল্পীরা নছিমন-ভটভটি টানে, কেউ শবজি বেচে, কেউ কামলা খাটে, অনেকে চুল-দাড়ি কাটে, কেউ ফেরি করে সওদা বেচে… এই তো জীবন !
 
আতাউল্লা আর কোনো কথা বলে না। হাবলে নিজের খোলসে ঢুকে যায়। আলকাপের প্রতি অনেককালের ভালোবাসা-টান দিনে দিন কেমন ফিকে হয়ে গেছে। অথচ এক সময় সে আলকাপের সঙ্গেই থেকেছে, কী সে মোহ ! কী সে টান ! দেশ বিভূয়ে পাড়ি দিয়েছে, চোখে স্বপ্ন আর ভালোবাসার কাজল মেখে মানুষকে শুনিয়েছে জীবনের গল্প, সুখ আর আনন্দের গল্প। নিজেরা নীলকন্ঠ হয়ে বিষটুকু চুষে খেয়ে ভালোবাসাটুকু নিংড়ে দিয়েছে মানুষের জন্য… মানুষ তার কতটুকু মূল্য দিয়েছে ?
 
শেষ জীবনে এসে শুধুই অন্ধকার ছাড়া তো কিছুই দেখে না চোখের সামনে। এমন একটা জীবন তো আশা করেনি সে। আতাউল্লার মতো ছেলেদের চোখে হাবলেরা নষ্ট কীট। মুখোমুখি যতই মিষ্টি মধুর কথা বলুক না কেন, আড়ালে-আবডালে বলে বেড়ায়, ওয়াকিল্লা মিয়ার ডেমনি হাবলে হিজড়ে। কথাটা শুনতে ভালো লাগে না, তারপরও শুনতে হয় । এ’ যেন ভবিতব্য, কপালের লিখন । এক সময় সাতগাঁয়ে রটে যায় ওয়াকিল্লার সাথে হাবলে কেন আলকাপ ছাড়ল। মাখা-মাখা শারীরিক সম্পর্ক যে কোথায় ঠেকেছে তারই নিদর্শন হাবলের আলকাপ ত্যাগ। কান গরম হলেও দাঁত-মুখ শক্ত রেখে শুনেছে নিন্দুকের যাবতীয় অশ্রাব্য কথামালা । দিনদিন সবই সহ্য হয়ে গেছে, আজ কানে আসে বাতাসের সঙ্গে সে সব ব্যাঙ্গার্তক কথা । কিন্তু পাত্তা দেয় না হাবলে। কারণ সে বিয়ে-শাদি করেছে, ঘরে দু’ দুটো সন্তান। পাখিডাঙার মেয়ে টিয়া, তার জীবনটাকে ভরিয়ে দিয়েছে আনন্দে-ভালোবাসায়। তারপরও মানুষের মুখ বন্ধ হয় না ? টিয়া মুখ টিপে হাসে আর বলে, ওরা বলুক না তাতে কী, তোমাকে আমি তো জানি…
 
মাঝে-মাঝে দেওয়ান আজমুল্লার কথা মনে হয়। কী চমৎকার মানুষ ছিলেন তিনি। আর তখনই ওয়াকিল্লার মুখছবি ভেসে ওঠে । মানুষ মরে যায় কিন্তু তার স্মৃতি তার জমানো গল্পগুলো তো মরে না। চোখের তারায় ফুটে ওঠে পদ্মদীঘি। দর্শকের মুখোমুখি হলে আলকাপকে জীবন্ত করে তুলত। জীবন এবং সময় আর গতি কেমন প্রবহমান নদীর মতো ভেসে গেল। এখন মানুষ কত আধুনিক হয়ে উঠেছে, জীবনকে অন্যভাবে দেখছে অন্যরকম আবহাওয়ায়। একটা সময় বিনোদন বলতে আলকাপ-যাত্রা-গম্ভীরা-সার্কাস-জারিগান-সারিগান-ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালি গানই ছিল মানুষের মনের খোরাক। মনকে সতেজ সজীব রাখার জন্য এগুলোর প্রয়োজন অনস্বীকার্য। আর আজ এসবের অনুপস্থিতিতে সমাজে বিশৃঙ্খলা অস্থিরতা প্রতিনিয়ত বিরাজ করছে।
 

লাল শিখা দেখে হাবলের মনে হয় পায়ে তার গোছা-গোছা ঘুঙুর, আলকাপে নাচছে সে। নাচ কি থামবে, পা তার কেমন নাচের মুদ্রায় টলমলো। তারপর ও ওয়াকিল্লা মিয়ার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়বে, কেউই বাঁধা দেবে না।  সেখানে কত তৃপ্তি, কত আনন্দ

 
হাবলে নিজেকে মাজা ভাঙা সাপের মতো একটা ঝোঁপের ভেতর কদাচিৎ আবিষ্কার করে, আর তখন বুকের মধ্যে অন্যরকম অপরাধবোধ ঘনিয়ে আসে। তারপরও নিজেকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েই আকাশ দেখা, বুক টান করে নিঃশ্বাস নেওয়া নিরন্তর ভেতরে যে আগুন জ্বলে, তার বিস্ফোরণ একদিন সমাজটাকে বহন করতে হতে পারে। কিন্তু তার তো কোন কিছু করার নেই। বাতাস এসে চুলোর আগুনটাকে আরো প্রজ্জ্বলিত করে তোলে। তাল পাখার হাওয়া কোথায় উবে যায়, হাবলে তাকিয়ে দেখে আগুনের হলকা ছড়িয়ে পড়েছে চুলোয়।
 
বিষাবলীর বিলের ওদিক থেকে আবুল্লা তালডোঙা বেয়ে ঘুঘুডাঙার পাড়ে নামে। বেলা শেষে যেটুকু মাছ ধরেছে, বাজারে বিক্রি করে বাড়ি ফিরবে। হাবলে একবার ডাকতে গিয়ে থেমে যায়, আগের দামটা দেওয়া হয়নি। আবার ধার করে মাছ খাওয়ার চিন্তা ছেড়ে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
অকস্মাৎ একটা লম্বা সালামের বহর শুনে ঘাড় কাত করতেই দেখে ফুলিয়াহাটের মকরম। একেবারে নতুন কেনা সাইকেলে চেপে বা পা মাটিতে ফেলে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে চাপ দাঁড়ি রেখেছে।
 
— আরে হাবলে ভাই, সারাজীবন গরুর মতো খাটলে হবে, আল্লাতালার নামটামও করতে হবে…
হাবলে কিছু বলে না। নতুন নামাজি হয়েছে মকরম। চিল্লা-ফিল্লা করে বেড়ায়। শুনেছে এবার নাকি তিন চিল্লাও দিয়ে ফেলেছে। সমাজের নষ্ট লোকেদের এবার সুপথে ফিরিয়ে আনার জন্য পথে নেমেছে বেশ জোরেশোরে। হাবলেও তার প্রথম টার্গেট, তা হাবলেও বেশ অনুমান করে।
 
— তা মকরম মিয়া তুমি আমাকে সুপথে আনবে তাহলে…
 
— কেন, তা কি খারাপ, জীবন আর ক’দিনের বলো, একজীবনে কত কিছু করলে শুধু ফরজ-সুন্নত…
 
— কথা ঠিক, তবে মানুষকে দেখিয়ে করলেই কী !
 
— তুমি তো যাত্রাদল না ওই আলকাপে খেমটা নাচ নাচতে, আর কী কী সব যা-তা করতে…
 
— মকরম তুমি নতুন নামাজি হয়েছো বলেই মানুষকে ছোট জ্ঞান করতে শিখেছো, এটা কিন্তু অন্যায়…
 
— ন্যায়-অন্যায় বোধ তোমার আছে তাহলে…
 
— কেন তুমি কি আমাকে মানুষ…
মুহূর্তে টঙের ভেতর থেকে বের হয়ে আসে রঘুনাথপুরের দয়াল বয়াতির বড় ছেলে রামায়ণ। মস্ত একটা বিবাদ শুরু হওয়ার আগে বাতাসটিকে ঘুরিয়ে দিতে না পারলে পরিবেশ নষ্ট হবে।
রামায়ণ বলে ওঠে, মকরম তুমি ভাই চিল্লা-ফিল্লা যা দাও দিয়ে যাও, কেউ কি বাঁধা দিচ্ছে ?
 
— এটা কী ধরণের কথা রামায়ণদা।
 
— খারাপ কথা তো কিছুই বলেনি, সব জায়গায় তোমার এই চিল্লা মার্কা চেহারা না দেখালেই কি নয়!
 
— আমি কি মন্দ কথা বলেছি…
 
— না ভাই মন্দ নয়। তবে আমরা মন্দ মানুষ কি না। হাবলে বা আমার বাপও সমাজের চোখে খারাপ মানুষ, তোমরাই ফতেয়া দাও তো…
 
— মন্দকে তো মন্দ বলবেই, তুমি কিন্তু হাবলের পক্ষ নিলে।
 
— কেনো নেবো না বলো, এখন হাবলেকে বলছ, একটু পরে আমার বাপকেও টানবে…
 
— তোমরা সবাই একেই সুতোর লাটাই।
 
— যদি তাই মনে করো তো তাই…
 
— কাজটা কি ঠিক করলে ?
 
— তুমি একটা বেয়াদপ, নতুন নামাজি হয়ে মানুষকে কি ভাবো ?
 
অবস্থা বেগতিক দেখে আর বিলম্ব না করে নতুন কেনা সাইকেলে পা তুলে মকরম গজগজ করতে-করতে ধুপদীয়ার দিকে এগুতে থাকে। বিকেলের সূর্যটা হাসি ছড়িয়ে আকাশের কোণে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরেই ডুব দেবে অন্তরালে। কোথায় যাবে কেউ জানে না। সে হারিয়ে যায়, হারিয়ে যাবে।
 
রামায়ণ চুপচাপ বসে থাকে হাবলের টঙের ভেতর। মানুষ ক্রমশ আরো ভিড় করে। হাবলের ছেলেটা এখনো ফিরল না দেখে চিন্তার ভাঁজ পড়ে ওর মুখে। তেঁতলের মায়ের আবার কি জ্বর বাড়লো। একদৌঁড়ে বাড়িতে যাবে তারও কোনো সুযোগ নেই, পাক্কা ছয় মাইলের পথ। আজকাল যেভাবে মানুষ মরছে তেঁতলের মাকে বাঁচানো কঠিন হবে। এ সময় যদি কোনো বিপদ চলে আসে সামলাবে কীভাবে, বুঝে পায় না হাবলে। দিনেদিন কত কত সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় মানুষকে। কোনো সমস্যা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। একটা দোটানার মধ্যে মানুষ বেঁচে থাকে। কেন যে মানুষ এভাবে বেঁচে থাকে, বোঝে না হাবলে। বোঝে না মানুষ। তারপরও মানুষ বাঁচার জন্য হা-হাপিত্তাস করে মরে। বাঁচতেই হবে আরো আরো, না বাঁচলে জগৎ উদ্ধার করবে কে? আহা চিন্তার কী ছিরি!
 
চুলোর কাঠগুলো পুড়তে থাকে। আগুনের মাতামে কেঁটলির পানি ফুটতে থাকে টগবগিয়ে। লাল শিখা দেখে হাবলের মনে হয় পায়ে তার গোছা-গোছা ঘুঙুর, আলকাপে নাচছে সে। নাচ কি থামবে, পা তার কেমন নাচের মুদ্রায় টলমলো। তারপর ও ওয়াকিল্লা মিয়ার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়বে, কেউই বাঁধা দেবে না। বাঁধা দেওয়ার তো কেউ নেই। কেনোই বা সে বাঁধা মানবে। সেখানে কত তৃপ্তি, কত আনন্দ । কত শত স্মৃতি ভেসে আসে উড়ে উড়ে, মেঘের মতো ভেসে থাকতে ইচ্ছে জাগে, কিন্তু কী হবে এত এত ভাবনা আর স্বপ্নের খই উড়িয়ে। তারপরও সময় শুধু বয়ে যায় সামনের দিকে, আগামীর পথে। জীবন তো একটা নদী… নদীর মতো বয়ে যায় সময়। সেখানে দাঁড়িয়ে মন উদাস করার কী দরকার? চলছে চলুক যেভাবে নদীর স্রোত দিক-বিদিক যাচ্ছে।
 

♦–♦♦–♦♦–♦

 
লেখকের অন্যান্য গল্প: উলুখাগড়া


  • Tags:
❤ Support Us
ভেসে যায় নধরের ভেলা, ভেসে যায় বেহুলা পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
ঈশানবঙ্গের শক্তি পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
error: Content is protected !!