- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- এপ্রিল ১৩, ২০২৫
ধারাবাহিক: একদিন প্রতিদিন । পর্ব ৪
ভারতচন্দ্র থেকে প্যারিচাঁদ, মাইকেল। ভানুসিংহ থেকে ভাবকুমার, পরশুরাম- খৈয়াম-সত্যপীর-টেঁকচাঁদ এবং রূপদর্শী এবং সনাতন পাঠক এবং ইবনে ইমাম এবং সঞ্জয়— এরকম গুচ্ছ গুচ্ছ কবি আর লেখক, বুদ্ধিধনে ভরা বঙ্গের গ্রাম আর শহরের দিনযাপনকে খুঁটিয়ে-খতিয়ে দেখতে দেখতে খ্যাতির আড়ালে বসে তাৎক্ষণিকের ছবি এঁকেছেন কালক্রমে। তীক্ষ্ণ-তির্যক ভঙ্গিতে। উজ্জ্বলতম ব্যতিক্রম ছিলেন একজনই, বাংলার চালচিত্রর-এর আব্দুল জাব্বার। ছদ্ম পোশাকে নয়, স্বনামে সরাসরি দেখেছেন গ্রাম-জীবনকে। তাঁর উত্তরাধিকারকেও স্পর্শ করে দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠবেন আরেক ছদ্মহীন মুখোশহীন দুঃসাহসী।
বাহারউদ্দিন
আয়নার কাচে বৈবাহিক লাল
“I look down into the warm, earthy world… and feel apart, enclosed in a wall of glass.”
– Sylvia Plath
আজও ঠিক সেভাবেই সরে যায় ঘুম। নগরের সদর দরোজা খুলে ঘরে ফেরে সুব্রতর বউ। সাদা কালো আরতির মুখের উপর আজও জমে আছে মহানগর। পায়ে পায়ে হেঁটে যাই তার কাছে। বলি, তুমিও কি ক্লান্ত? তোমার রাতও কি জেগে থাকে দেওয়ালের গায়ে ? অন্ধকারে, চুপিসারে গুঁড়ি মেরে বেড়ে ওঠে আয়তনে ? তুমিও কি ভয় পাও অনাগত আক্রমণের ? সকালের বহু আগে তুমিও কি স্বপ্ন দেখ সকালের ? অবসন্ন অসুখের ভার তোমাকেও কি বিব্রত করে ? তুমিও কি সোফায় হেলান দিয়ে ক্লান্ত সুরে ফোনালাপে ডিপ্রেশনের কথা বল ? তারপর মিশে যাও সংসারের হলুদে লবণে ? যাবতীয় প্রশ্নচিহ্ন মুছে, গাছে জল দাও, পরিচর্যা কর, তারপর সবার জন্য প্রাতরাশ বানাও প্রত্যেকের মর্জি অনুযায়ী।
তুমি শাওয়ারের নব ঘোরাও দুই আঙুলে। ঠান্ডা জল আছড়ে পড়ে তোমার শরীরে। তুমি ইষৎ সাদা হও। বেরিয়ে আস কলঘর থেকে। নিয়মের সাফ সুতরো পোশাক পরে নাও দ্রুত। কাজল থেকে নিকষ কালো সুষমা তোমার চোখ দুটিকে গাঢ় করে তোলে। তোমার অ-ব্যবহৃত ঘুম ঢাকা পড়ে আয়নার কাচে। বৈবাহিক লাল টিপ তোমার কপাল সুরভিত করে তোলে রঙে আর বৈধতায়
এর বাইরেও, তোমার জন্য পড়ে আছে বাসী কাপড়, কাঁচা বাজার এবং তেল মশলা। সংসার থেকে ঝনঝন করে বেজে ওঠে ছোট ছেলের স্কুল, স্বামীর অফিস যাত্রা। আরও যা কিছু অন্তর্গত চরিত্র ছড়িয়ে আছে, তাদেরও নির্দেশ ধেয়ে যায় তোমার দিকে। তোমার লাইব্রেরি থেকে উঁকি দেয় রাসসুন্দরী। বহু যুগ থেকে উনানের আগুনে সিদ্ধ হয় শাক সবজি, লতা-পাতার অসহনীয়তা। ভাঙা কবিতাগুলি ডানা মেলে ওড়ে তোমার জানলার গ্রিলে। আশাপূর্ণার অন্তঃপুরবাসিনী কলম থেকে চমকে ওঠে উপন্যাসের পাতা। স্নানঘর ইশারা করে তোমাকে। অদৃশ্য ছায়া সরে যায় পর্দার আড়ালে। তুমি কেঁপে ওঠ ভয়ে। তোমার দুঃসহ কবিতাগুলি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তুমি দেখো জলে ভরা নদীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন ভার্জিনিয়া। তার কালির অক্ষরগুলি বাতাসে উড়ছে কয়েক প্রজন্ম ধরে। তুমি শাওয়ারের নব ঘোরাও দুই আঙুলে। ঠান্ডা জল আছড়ে পড়ে তোমার শরীরে। তুমি ইষৎ সাদা হও। বেরিয়ে আস কলঘর থেকে। নিয়মের সাফ সুতরো পোশাক পরে নাও দ্রুত। কাজল থেকে নিকষ কালো সুষমা তোমার চোখ দুটিকে গাঢ় করে তোলে। তোমার অ-ব্যবহৃত ঘুম ঢাকা পড়ে আয়নার কাচে। বৈবাহিক লাল টিপ তোমার কপাল সুরভিত করে তোলে রঙে আর বৈধতায়।
তুমি দিনের বাঁধুনি বেঁধে রেখে পায়ে চটি গলাও। গলির মুখে সে চটির স্ট্র্যাপ ছেঁড়ে। ঋত্বিকের নীতা এসে তোমাতে মিশে যায়। তুমি সেফটিপিনে জুড়ে নাও বিগত সময়। রঙিন পৃথিবী ভরে ওঠে ধূসরতায়।
নগর তোমাকে দেখে টিপ্পনী কাটে আদর্শ স্ত্রী, শব্দবন্ধে। তুমি এড়িয়ে যাও প্রতিক্রিয়া। খবরের কাগজ থেকে বেরিয়ে অন্বিতার সুইসাইড নোট কথা বলে। বদ্ধ জীবনের শর্তসমূহকে ঘিরে অন্বিতা ঝুলে পড়ে। তার অন্ধকার মুখ তাড়া করে তোমাকে। এই তো সেদিন সিঁদুরে, আদরে ভরে উঠেছিল সেই মেয়ে। এই তো সেদিন কড়ি দিয়ে কিনেছিল সাধের সংসার। সে-সংসারেই একদিন ঝুলে রয়েছিল তার অসার অনড় দেহ। খবর, খবর– শুধু খবর হবে বলে তারা দড়িতে ফাঁস দেয়। গিঁট পড়ে গলায়। সোশ্যাল মিডিয়া ছেঁড়া কাটা করে সে-দেহের অন্ধকার, চোরা গোপ্তা গলি। সে-সব কানাগলি ডিঙিয়ে তুমি জীবিকার দিকে ছুটে চল সাবধানে। এই তো জীবন অনুপমা। এই তো ছুরির ফলায় নিজেকে গেঁথে রেখে বেঁচে থাকা। ভোর হলে তুমি অবসন্নতার কথা বল কেন ?
♦–•–♦♦–•–♦♦–•–♦
ক্রমশ..
আগের পর্ব পড়ুন: ধারাবাহিক: একদিন প্রতিদিন । পর্ব ৩
❤ Support Us







