Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • মে ৮, ২০২২

সালাম সাহেবের শ্যামা মা

জীবনের অপ্রাপ্তিগুলি, অনিশ্চিতির ভাবনাগুলি কোথায় যেন লীন হয়ে যায়! তার জন্যে মনপ্রাণ সঁপে দিতে চায়। তখন তার বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হয়।

বিশ্বনাথ গরাই
সালাম সাহেবের শ্যামা মা

অলঙ্করণ: দেব সরকার

পাড়ার পাশেই এই মসজিদে ভোরের আজান শুরুর অনেক আগেই ঘুম ভাঙে সালাম সাহেবের। তিনি এ বয়সেও বাল্যের অভ্যাসমতো বিছানায় শুয়ে থাকতে পারেন না – উঠে পড়েন। বাড়ির সামনে বহুপ্রাচীন একটা নিমগাছ আছে। তার একটা সরু ডাল ভেঙে দাঁত মাজতে মাজতে বেরিয়ে পড়েন বাড়িসংলগ্ন তাঁর যে কয়েক বিঘা জমি আছে, তাদের পরিদর্শনের জন্য। ভোরের হাওয়ায় তাঁর গা জুড়োয়। গ্রীষ্মে লুঙ্গি ও ফতুয়া গায়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। শীতে একটা সাধারণ চাদর। শৈশব থেকেই তাঁর এই অভ্যাস গড়ে দিয়েছিলেন তাঁর আব্বা – বলতেন, ভোরেই পৃথিবী সবচেয়ে সুন্দর। ভোরবেলা আল্লাও বের হন– তাঁর বান্দাদের আশির্বাদ করেন।

আজ এই চৈত্রের সকালে মাঠপরিক্রমা শেষে মসজিদ থেকে যখন নামাজ পড়ে ফিরছিলেন, তখন তাঁর দেখা হল পাশের পাড়ার অমূল্য মণ্ডলের সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে অমূল্য মণ্ডলের কী যেন গম্ভীর আলোচনা হল। সালাম সাহেবের ফর্সা মুখের রেখায় যেন আমূল পরিবর্তন ঘটে গেল। অমূল্যও লক্ষ্য করেছিল, কেমন যেন পালটে গেলেন উনি – মুহূর্তেই। ‘ও, তাই বুঝি, আচ্ছা দেখছি,’ শুধু এই কটি শব্দ ব্যবহার করে উনি হনহন করে বাড়ি ফিরে এলেন। বারান্দায় সবসময় বহুপ্রাচীন একটি কাঠের চেয়ার পাতা থাকে। উঠোন পেরিয়ে তিনি সেই চেয়ারটায় ধপ করে বসে পড়লেন – কাউকে কিছু বললেন না। তাঁর ঘন ঘন নিশ্বাস পড়তে লাগল। তিনি একবার দু’হাতের মুঠি খুলছেন, পরক্ষণেই তা মুড়ছেন। মাঝে মাঝে মাথার পাতলা হয়ে আসা চুলে আঙুল চালাচ্ছেন। এক বিজাতীয় অস্থিরতা তাঁকে তোলপাড় করে দিচ্ছিল, স্পষ্টই বোঝা যায়।

উঠোন ঝাঁট দিতে দিতে আড়চোখে সালাম সাহেবকে লক্ষ্য করছিলেন তাঁর স্ত্রী সবেরা বিবি। আজ নিয়ে তিনদিন হল শ্যামা আসেনি। বাড়ির অন্যান্য সদস্যরা, অর্থাৎ তাদের দুই সন্তান এখনও বিছানা ছেড়ে ওঠেনি। আসলে শ্যামা যদি কখনও কামাই করে, মসজিদ থেকে ফিরে উঠোন থেকেই সালাম সাহেব চিৎকার করেন, ‘তোরা এখনও উঠিসনি। ওঠ, ওঠ।’ যদিও তারা যথেষ্ট বড় হয়েছে, তবুও আব্বুকে তারা ভয় করে, শ্রদ্ধা করে, সর্বোপরি মান্য করে – তাই তারা ধড়মড় করে উঠে পড়ে। কিন্তু আজ শ্যামার অনুপস্থিতিতেও কাউকে ডাকেননি তিনি। সবেরা বিবি অবাক হলেন। তিনিই ঝাঁটা ফেলে সালাম সাহেবের কাছে এগিয়ে এলেন। দেখলেন, সাহেব রীতিমতো ঘামছেন। তাঁর চোখ-মুখের নিদারুণ অস্থিরতা তাঁর নজর এড়াল না। তিনি প্রমাদ গুনলেন, শরীর খারাপ নাকি! তাড়াতাড়ি এক গেলাস জল এনে বারান্দার ফ্যানের ঘূর্ণণগতি বাড়িয়ে দিলেন। তারপর সাহেবের কপালে হাত রেখে জিগ্যেস করলেন, ‘কী গো, কী হল তোমার? এরকম করছ কেন?’ অত্যন্ত ব্যক্তিত্ববান, অনমনীয় চরিত্রের অধিকারী সালাম সাহেব ভেঙে পড়লেন, স্খলিত কণ্ঠে বললেন, ‘জানো বিবি, কাল রাতে শ্যামামা-র ইন্তেকাল হয়েছে।’

-‘কী বললে? শ্যামার কী হয়েছে?’ ডুকরে কেঁদে উঠলেন সবেরা বিবি।
-‘হ্যাঁ গো, সত্যি। অমূল্য মণ্ডলের মুখে শুনলুম।’ তিনি থম মেরে বসে রইলেন চেয়ারে।
সবেরা কান্না জড়িত গলায় ছেলেদের ঘরের দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলেন, ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললেন, ‘ওরে, তোরা ওঠ। তোদের শ্যামাদিদি যে আর নেই রে।’ ছেলেরা জাগ্রত অবস্থায় চুপচাপ শুয়েছিল – আম্মার আর্তনাদে তারা উঠে পড়ল। দরজা খুলে এই নিদারুণ দুঃসংবাদ বিশদভাবে শুনে তারা প্রথমে স্তম্ভিত, পরে অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে রইল মা-র দিকে। তারপর, তারা ঘিরে দাঁড়াল আব্বাজানকে। ‘আব্বা, তুমিই বলো, আমাদের, কী করা উচিত’?

স্বামী ছিল ট্রাকের খালাসি। দামোদর নদীর বাঁধের নীচে নদীর উল্টোদিকের ঢালে কুঁড়েঘর বানিয়ে থাকতে শুরু করেছিল শ্যামা ও অজয় বাউরি। অজয় মাঝে মাঝেই ট্রাকে নিরুদ্দেশ হয়ে যেত। কোনওবার উত্তরবঙ্গ তো কখনও দক্ষিণবঙ্গ। ফলে বাড়িতে একা হয়ে যেত শ্যামা। অবশ্য একা নয় – তার পাঁচ ও তিন বছরের দুই পুত্রসন্তান তার সর্বক্ষণের সঙ্গী। অজয়ের কর্তব্যবোধ ছিল দারুণ – যখনই দূরের দেশে সে রওনা হত, শ্যামাকে পয়সাকড়ি বুঝিয়ে দিয়ে যেত, যাতে তার অনুপস্থিতিতে কোথাও হাত পাততে না হয় বা ধার চাওয়ার জন্য দোকানির মুখঝামটা শুনতে না, হয়। বেশ সুখে কাটছিল তাদের দিনগুলি। কিন্তু বিধি বাম! সেবার শিলিগুড়ি না কোথায় যেন সে গিয়েছিল আলুর বস্তাবোঝাই ট্রাকের খালাসি হয়ে। ভোরবেলা মালিক এলো হন্তদন্ত হয়ে – ভয়ংকর এ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে বহরমপুরের কাছে কোনও এক জায়গায় ৩৪ নম্বর হাইওয়েতে। ড্রাইভার খালাসি দুজনেই গুরুতর আহত। স্থানীয় একটি হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে অজয়। হয়ত শীঘ্রই আরও কোনও দুঃসংবাদ শুনতে হবে।

শ্যামাকে দুঃসংবাদ শুনতে হয়েছিল।পরদিন বিকেলে। বুকফাটা কান্নার শব্দ শুনে প্রতিবেশী ঝুপড়ির বাসিন্দারা ছুটে এসেছিল। কিন্তু সামনে যে ভয়ংকর দিন আসছে, দুই নাবালক পুত্রকে নিয়ে তা থেকে উদ্ধারের উপায়ই বা কী, তা কেউ বাতলাতে পারল না। মৃতদেহ ফেরত এসেছিল – শ্যামা তার চিরচেনা মানুষটির বীভৎস মুখ ও হাড়গোড়ভাঙা শরীর দেখে মূর্ছা গিয়েছিল ঘনঘন। দুই শিশুপুত্র খুব কাঁদল মাকে জড়িয়ে। নিকটবর্তী শ্মশানে দাহ সম্পন্ন হয়েছিল প্রতিবেশীদের তোলা চাঁদার সাহায্যে। তারপর যা হয় আর কী! সবকিছু থিতিয়ে গেল ক্রমশ। জমানো কিছু টাকা ছিল – কিন্তু কলসির জল গড়াতে শুরু করলে শেষ হতে কদিন আর লাগে! শ্যামা পড়ল অথৈ জলে! দুই বাচ্চাকে নিয়ে গিয়ে পড়ল সালাম সাহেবের বাড়ি। তাঁর দান-ধ্যান, গরীবগুর্বোর জন্যে তাঁর দয়ামায়ার কথা অনেক শুনেছে সে। তাই তাঁর পায়ে উপুর হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল সে –‘বাবা, আমাদের বাঁচান আপনি। যা হোক একটা কাজ দিন আমাকে। নাহলে এই দুটো বাচ্চাকে নিয়ে ভিক্ষে করতে হবে আমাকে।’ সালাম সাহেব এক পা পিছিয়ে গেলেন –‘আরে, পা ছাড়। কী হয়েছে, বল্‌। এত কাঁদছিস কেন?’

এখানে সালাম সাহেবের একটু পরিচয় দেওয়া দরকার। দীর্ঘাকৃতি, প্রকৃতই গৌরবর্ণ, বলিষ্ঠ চেহারার অধিকারী ষাটোত্তীর্ণ সালাম সাহেব। ঘোষপুকুর নামক এই ছোট গঞ্জে তাঁর নাম শুনলে সব সম্প্রদায়ের মানুষ শ্রদ্ধায় মাথা নত করে। এখানকার একটি হাই স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার পিছনে তাঁর শ্রম, অর্থদান ও জনসাধারণকে স্কুল-কলেজের অপরিহার্যতা বোঝানোয় তাঁর অবদান সকলে নতমুখে স্বীকার করে। এহেন মানুষটি আবার প্রকৃতার্থেই ধর্মনিষ্ঠ, উদার, পরোপকারী ও অত্যন্ত সহিষ্ণু। আল্লা সবাইকে সবকিছু দেন না, কিন্তু প্রকৃত সৎ মানুষকে বঞ্চিত করেন না। গঞ্জে তাঁর একটি পাইকারি মুদিখানা দোকান আছে। সেখানে খদ্দের উপচে পড়ে – কারণ লোকে জানে, সালাম সাহেবের কাছে গেলে ঠকার ভয় নেই। তাই তিনি একজন সফল ব্যবসায়ীও বটে – আল্লা তাঁকে একজন স্বচ্ছল ব্যবসায়ী হিসাবে মান্যতা দিয়েছেন।

তাঁর দুই পুত্র ও দুই কন্যা। তাঁর প্রথম সন্তান কন্যা। ঠিক ঊনিশ বছর বয়েসে তার শাদি দিয়েছেন এক পরিচিত সৎ পাত্রে – একটি মাদ্রাসা স্কুলে সে স্থায়ী শিক্ষক। বাকি দুই পুত্র ও কনিষ্ঠ কন্যা স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করে। স্বামী ব্যবসার কাজে সবসময়ই প্রায় দোকানে থাকেন। তাই সবেরা বিবির নজর থাকে ছেলেমেয়েদের উপর, যাতে পড়াশোনায় ওরা ফাঁকি না দেয়। সালাম সাহেব তাঁর নিজস্ব ধ্যানধারণায় উজ্জীবিত করতে পেরেছেন তাঁর বিবিকেও – লেখাপড়া না শিখলে এই পৃথিবী অন্ধকার।

সালাম সাহেবের বাড়ি গঞ্জের পূর্বপ্রান্তে মুসলিম মহল্লায়। খানিক হাঁটলেই নদী। তাঁর বাড়িটি একতলা – চার কামরার। টানা বারান্দার ঠিক নীচে উত্তরকোণে রান্নাঘর। এরপর উঠোন – উঠোনের এক প্রান্তে একটি পেয়ারাগাছ। উঠোনের মাঝবরাবর সদর দরজা। তাঁর দরজা অবারিত – হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের মানুষ তাঁর কাছে আসেন – কেউ সাহায্যের জন্য, কেউ বা পরামর্শের জন্য। তিনি কাউকে বিমুখ করেন না।
জ্যেষ্ঠা কন্যার শাদির সময় তাঁর বাড়িতে কে না আমন্ত্রিত ছিলেন! পঞ্চায়েতের প্রধান থেকে পার্শ্ববর্তী স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দ ও সর্বস্তরের মান্যগণ্য মানুষজনেরা ছিলেন তাঁর অতিথিদের তালিকায়। সালাম সাহেবের বাড়ির নিমন্ত্রণ বলে কথা! গ্রামগঞ্জে এ ধরণের বিয়েতে কাজকর্মের জন্যে কুলিপাড়া ও বাগ্‌দিপাড়ার বউঝি-রা হামলে পড়ে। তাদের দারিদ্রের হিমশীতল আবহে এ যেন ফাল্গুনের দখিনা বাতাস। অন্যদের সঙ্গে শ্যামাও কাজে লেগে গিয়েছিল সেদিন – অতিথিদের খাওয়ার শেষে পাতা তোলা, থালা বাসন পরিষ্কার করা, ঘরদোর সাফসুতরো ও বারান্দা-উঠোন ঝাঁটদেওয়া – দু দুটো দিন কাজকর্মের ফাঁকে অন্য মহিলাকর্মীদের সঙ্গে হাসিঠাট্টায় বেশ কেটেছিল। তাছাড়া সঙ্গের দুই নাবালকসহ দুদিন পেটপুরে খাওয়াও ছিল অন্যতম আকর্ষণ– এরকম ভালোমন্দ খাবার তো খুব একটা জোটেনা! বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হলে বিকেলে ফেরার সময় অন্যদের সঙ্গে তাকেও ডাকলেন সালাম সাহেব – প্রতিশ্রুত মজুরি তো দিলেনই – অতিরিক্ত একশো টাকা সবার হাতে গুঁজে দিলেন – সেইসঙ্গে সবাইকে একটা করে নতুন ছাপা শাড়ি। এতটা ভাবেনি তারা। বরং যে কোনও পালাপার্বনে বাবুদের বাড়ি অবাঞ্ছিত ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হতেই অভ্যস্ত তারা। পরিবর্তে এই অভাবনীয় উদারতায় শ্যামা বাক্‌রহিত হয়ে গিয়েছিল। সবাই চলে গেলে সে মুখ নীচু করে অত্যন্ত বিনীতভাবে সালামসাহেবকে বলেছিল, ‘বাবু, যদি কখনও কাজের লোক লাগে, বলবেন। আমি সব কাজ করে দোব।’

সেই শ্যামা যে এভাবে তাঁর পায়ে আছড়ে পড়বে – দুই নাবালক পুত্রসহ – সালামসাহেব ভাবেননি। বিস্ময় বিমূঢ়তার ঘোর কাটতে তিনি বললেন, ‘কী হয়েছে, সব খুলে বল। দেখছি, কী করা যায়।’ কখন যেন তাঁর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন সবেরা বিবি। শ্যামার পাশে সরে এলেন তিনি, বললেন, ‘এত কাঁদিস কেন? কী হয়েছে?’ শ্যামা একটু শান্ত হল, তারপর সবিস্তারে খুলে বলল তার দুর্ভাগ্যের কাহিনি। সবেরা বিবি বুঝলেন, বড় আতান্তরে পড়েছে মেয়েটি। একটা কিছু সুরাহার দরকার। সালাম সাহেবের অনুমতির অপেক্ষা না করেই তিনি শ্যামাকে বললেন, ‘ তোকে আমি চিনি। আমার বড় মেয়ের শাদিতে কাজ করেছিলি তো?’ শ্যামা ঘাড় নাড়ল। তিনি বললেন, ‘দ্যাখ, আমারও বয়েস হচ্ছে। একা দুহাতে সংসার সামলাতে পারি না। আমাদের বাড়িতে কাজ করতে পারবি? সারাদিন থকবি, খাবি। তোর ছেলেদের খাবারও পাবি। মাইনেও দেব। রাজি তো?’ শ্যামা যেন হাতে চাঁদ পেল। কৃতজ্ঞতায় তার মাথা নুয়ে এল। বলল, ‘আমাকে বাঁচালে গো তোমরা। কাল সকালেই চলে আসব আমি। ছেলেদুটোকে ওর মাসীর কাছে রেখে আসব। পাশেই থাকে। তারও ছেলেপুলে আছে। – কোনও অসুবিধে হবে না।’

এত তাড়াতাড়ি যে শ্যামা তাদের মন জয় করে নেবে, বাড়ির কেউ ভাবেনি। সালাম সাহেব কন্যাস্নেহেতাকে ডাকতে শুরু করলেন, শ্যামামা। পুত্রকন্যাদের একদিন ডেকে বললেন, ‘তোমরা সবাই ওকে দিদি বলবে।’ এরপর শ্যামা যেন এক নতুন জীবন পেল। যে দুঃখ-বেদনা নিয়ে সে এক অনিশ্চিত জীবনের গোলকধাঁধায় আবর্তিত হওয়ার আশংকা করেছিল, তা উধাও হয়ে গেল তার ভাবনাচিন্তা থেকে। আসলে অজানা মানুষ যখন কারুর প্রকৃত স্নেহ-ভালোবাসা পায়, তখন জীবনের অপ্রাপ্তিগুলি, অনিশ্চিতির ভাবনাগুলি কোথায় যেন লীন হয়ে যায়! তার জন্যে মনপ্রাণ সঁপে দিতে চায়। তখন তার বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হয়। শ্যামার জীবনেও তা-ই ঘটল। একটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী পরিবার তাকে যেভাবে কাছে টেনে নিল, তাতে তার মনে হল, আল্লা ও ঈশ্বর একজনই – তাঁদের শতকোটি প্রণাম।

মসজিদে আজান দেওয়া শুরু হয়েছে। সালাম সাহেব যথারীতি এ সময়ে বাড়ির বাইরে। সবেরা বিবি উঠে পড়েছেন। তিনি জানেন, এখনই শ্যামা হাজির হবে। প্রথমেই তার কাজ হল বারান্দা ও উঠোন পরিষ্কার করা। ঝাঁট দেওয়া। তারপর বারান্দা মুছে সে কলতলায় বসবে। ছেলেমেয়েদের বিছানা থেকে ওঠানোর জন্য তখন আর সালাম সাহেবকে ডাকতে হয় না। নামাজ পড়ে ফেরার আগেই তো শ্যামা হাজির হয়। বাসনকোসন মাজার পরই সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ডাকতে থাকে, বড়খোকা, বাবুসোনা, ছোড়দি। তারা জানে, তারা না উঠলে শ্যামাদি চেঁচিয়েই যাবে। অগত্যা উঠে পড়ে তারা। বাবুসোনা অর্থাৎ কনিষ্ঠ পুত্র – তার আসল নাম আবু। আবু না হয়ে সে শ্যামার কাছে বাবু – তারপর বাবুসোনা। সে ভারী মজা পায় বাবুসোনা ডাকটিতে। ক্লাস এইটের ছাত্র সে। শ্যামাদিকে রাগানোর জন্যে বলে, ‘দিদি, তোমার যা ব্রেন না, তুমি মুখ্যমন্ত্রীকে মূর্খমন্ত্রীও বানিয়ে দিতে পারো।’ শ্যামা ঠিক ধরতে পারে না, তার বাবুসোনা কী বলতে চায়। সে ভাবে, মূর্খমন্ত্রী আরও উঁচু কোনও প্রশাসনিক পদ। তাই সে গম্ভীর হয়ে বলে, ‘আমার কী অত ক্ষমতা আছে ভাই!’ ইতিমধ্যে বাড়ি ফিরেছেন সালাম সাহেব। শ্যামার অজ্ঞতা মিশ্রিত সারল্যে সবার সঙ্গে তিনিও হেসে ওঠেন। শ্যামা বুঝতে পারে না, এত হাসির কী আছে! সে গজগজ করতে করতে অন্য কাজে হাত লাগায়। সবেরা বিবি রান্নাচালায় গিয়ে বসেন। ছেলেমেয়েদের জন্যে হাল্‌কা জলখাবার অর্থাৎ মুড়ি খাবার জন্যে আলুচচ্চড়ি দরকার। শ্যামা তা দেখে চেঁচিয়ে বলে, ‘মা, আমি যাচ্ছি। তোমাকে আলু কাটতে হবে না। আমি আছি কী করতে!’

ছেলেমেয়েরা এসময় টানা বারান্দায় কেউ চেয়ার টেবিলে, কেউ বা মাদুরে বসে পড়াশোনা করছে। সালাম সাহেব এসময় বারান্দায় না বসে উঠোনে পেয়ারা গাছের নীচে ফাইবারের চেয়ারে বসে থাকেন। প্রতিদিন সেখান থেকেই লক্ষ্য রাখেন ছেলেমেয়েদের উপর। পিতার দারিদ্র্যহেতু ম্যাট্রিক পাশের পর নিজে আর এগোতে পারেন নি। সেই বেদনা আজও তাঁকে কুরে কুরে খায়। তাই ছেলেমেয়েদের দিকে তাঁর এত লক্ষ। সবেরা বিবিও তা জানেন। স্বামী একটু পরেই দোকানে যাবেন – এরপর তাঁর দায়িত্ব। সকাল ৯টা-সাড়ে ৯টায় ছেলেমেয়েদের ছুটি মেলে। ওরা স্নান করে ভাত খেয়ে রেডি হয়ে নেয়। তারপর যে যার স্কুল-কলেজের উদ্দেশে রওনা দেয়।

সেদিন সবেরা বিবির বেশ শরীর খারাপ। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে বুঝতে পারেন, মাথা ভার। গা-হাত-পায়েও যন্ত্রণা। বাংলাদেশের কোনও রমনীকে এসব ক্ষেত্রে শুয়ে থাকতে দেখেনি কেউ। স্বামী-পুত্র-কন্যার খাবারদাবার বা সংসারের অতি প্রয়োজনীয় কাজকর্ম করবে কে? সুতরাং তিনিও উঠে পড়েছেন। খানিক পরেই বুঝলেন, শরীর বইছে না। অগত্যা শ্যামাকে কাছে ডাকলেন, ‘তুই আজ রান্না চাপা। আমি তোকে দেখিয়ে দিচ্ছি।’ শ্যামা একপায়ে খাড়া, ‘তুমি যেমন যেমন বলবে, আমি সেভাবেই রাঁধব।’

স্কুলকলেজ সেদিন ছুটি থাকায় দুপুরে বারান্দায় আসন পেতে সবাই খেতে বসেছে। সবেরা বিবি একদিকে বসে লক্ষ্য রাখছেন স্বামী-পুত্রকন্যার খাওয়াদাওয়া। পরিবেশন করছে শ্যামা। বড় ছেলে আসফাক মাকে বলল, ‘এই শরীর নিয়ে এতসব রাঁধতে গেলে কেন ? ভাতে ভাত করলেই তো মিটে যেত!’ সবেরা বিবি কষ্ট করে হাসলেন, ‘রান্না কেমন হয়েছে বল।’ সে হাসল, ‘খুব ভালো।’ এবার তিনি রহস্য ফাঁস করলেন, ‘আজ তোদের শ্যামাদি রান্না করেছে রে!’ সবাই মুখ তুলে শ্যামাকে দেখতে লাগল। তাদের চোখে বিস্ময়। শ্যামার মুখে একগাল হাসি, একটুখানি লজ্জাও। সালাম সাহেব তাকে আশীর্বাদ করলেন, বললেন, ‘শ্যামা মা, তুই তো দেখছি দ্রৌপদী। এবার থেকে মাঝে মাঝে রান্নায় হাত লাগাস তো। তোর মায়েরও তো বয়েস হচ্ছে!’ দায়িত্ব পেয়ে শ্যামা যেন বর্তে গেল, ‘নিশ্চয়ই বাবা, আপনি কিছু ভাববেন না।’

এভাবেই দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। সজ্জন মানুষ সালাম সাহেব শ্যামা ও তার দুই পুত্রের ভরণপোষণের সব দায় বহন করেন। আল্লা তাঁকে অনেক দিয়েছেন। দরিদ্রজনের সেবাও তাঁর সেবা। তিনি প্রতি মাসে নিয়ম করে শ্যামার ঘরে চাল-ডাল-তেল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য পাঠিয়ে দেন। শ্যামা সকাল-দুপুর তাঁর বাড়িতে খায়। তার আগে খুব ভোরে উঠে দুই ছেলের জন্যে দুপুরে রান্না করে আসে। তারা নিজেরা ভাত বেড়ে নেয়। বিকেলে কাজকর্ম সেরে সন্ধের মুখে সে তার ঘরে ফিরে আসে। রান্না চাপায়। ছেলে দুটির বয়েস এখন ঊনিশ-কুড়ি। গাঁয়ে প্রাথমিক স্কুলে গিয়েছিল দু’একবছর। তারপরই এসব নিম্নবর্গীয় ছেলেমেয়েদের যা হয় আর কী! ভো-কাট্টা ঘুড়ির মতন তাদের জীবন শুরু হয়ে যায়। শ্যামা তাদের অনেক বুঝিয়েছে – সালামসাহেবের ছেলেমেয়েদের উদাহরণ দিয়েছে। কিন্তু পড়াশোনায় ওদের মতিগতিই নেই। এখন তো তাদের বেশ জোয়ান গোছের চেহারা। এখানে ওখানে গতর খাটায় – কাঁচা পয়সা পায়। হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়। গঞ্জ পেরিয়ে একটা শ্মশানে আড্ডা জমায়। তাদের মতো শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত ও নিরক্ষর অনেক বখাটে ছেলের সকাল-দুপুর-সন্ধ্যায় আড্ডা সেখানে। গাঁজা-মদের আসর বসে। তাদেরও প্রথম প্রথম হাতেখড়ি গাঁজায়, তারপর তারা মদে ক্রমশ আসক্ত হয়ে পড়ল। একদিন শ্যামা তাদের সামনে খুব কাঁদল। কিন্তু চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি। কিছুকাল পরে একদিন কাজ থেকে ফিরে দুই ছেলের মাতলামি দেখে তার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে – রেগেমেগে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে নলে, ‘তোরা ঘর থেকে বেরিয়ে যা। এমন ছেলে থাকার চেয়ে না থাকা ভালো।’

তারা দুজনেই সে রাত্রে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। শ্যামা শুনেছে, নদীর অন্য পাড়ে তারা আছে। মুটেগিরি করে, জনমজুর খাটে। কিছুকাল পরে দুজনে বিয়ে-থাও করেছে। শ্যামা নিজের দুর্ভাগ্যকে দোষ দেয়। সালাম সাহেব ছেলেদের খোঁজখবর জানতে চাইলে বলে, ‘বাবা, ওরা কাজকর্ম করছে।’ তিনি খুশি হন, বলেন, ‘তোকে পয়সাকড়ি দিচ্ছে তো? নাকি বদ সঙ্গে পড়ে সব উড়িয়ে দিচ্ছে?’ কী উত্তর দেবে ভেবে পায় না শ্যামা। ম্লান হেসে কোনও উত্তর না দিয়ে তাঁর কাছ থেকে পালাতে পারলে সে বাঁচে! উনি যেরকম মানুষ, তাকে যেরকম মেয়ের মতো ভালোবাসেন, তাতে ছেলেদের অধঃপতন তাঁকে খুব কষ্ট দেবে। বারান্দার ঝুল পরিষ্কারে মন দেয় শ্যামা।

বাড়ির ছোট মেয়ের শাদি। রাজিয়া এখন কলেজে পড়ে। থার্ড ইয়ার। সে পাশ না করে কিছুতেই শাদি করবে না। কিন্তু এত ভালো পাত্র সচরাচর মেলে না। সে বর্ধমানের একটি ব্লকের জয়েন্ট বিডিও। সুদর্শন, ভদ্র ও মার্জিত। তার পরিবারকেও বেশ পছন্দ হল সালামসাহেবের। তাছাড়া পাত্রের বাড়ি থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, রাজিয়ার পড়াশোনার ব্যাপারে তাঁরা কোনও হস্তক্ষেপ করবেন না।তাছাড়া বিয়ের পরও তো পরীক্ষা দেওয়া যায়! তাই রাজিয়ার কোনও আবদার-অজুহাত পাত্তা পেল না তার আব্বার কাছে। শাদি হয়ে গেল তার। শ্যামার একটুও ফুরসৎ নেই। সারাক্ষণ চরকির মতো ঘুরেফিরে সে খাটল। গিন্নিমার কথামতো অতিথি-অভ্যাগতদের আপ্যায়ন, তাদের ফাইফরমাস খাটা – সবেতেই শ্যামা। সে যেন দশভূজা।

মেয়ে তো চলে গেল শ্বশুরবাড়ি। এবার পাত্রের বাড়ি তত্ত্ব নিয়ে যাবে কে? একজন মহিলা এসেছিলেন – এসব কাজে সবাই তাকেই নির্ভর করে। কিন্তু সালাম সাহেবের ইচ্ছা, তাঁর শ্যামামা এই দায়িত্ব পালন করুক। সে-ই সবচেয়ে উপযুক্ত। সুতরাং শ্যামা বর্ধমান চলল বিয়ের তত্ত্ব নিয়ে। রাজিয়াও খুব খুশি। তার নতুন ঘরে একজন কাছের মানুষ তো এসেছে।

বিয়ের মাস দুয়েক পরে রাজিয়া ফোন করেছে তার মা-কে। প্রায়ই ফোন করে সে। কিন্তু এবারের বিশেষত্ব হল, তাদের বাড়ির এক অনুষ্ঠানে আব্বা আর মাকে দুদিন থাকতেই হবে। আগামী মঙ্গল-বুধবার। সালামসাহেবও ভাবছিলেন, একবার মেয়ের বাড়ি দু’একদিন থেকে দেখে আসবেন মেয়ে কেমন নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে তার নতুন সংসারে। বিবিকে বললেন, বলে দাও, যাব। কিন্তু বাড়িতে থাকবে কে? দুই ছেলেই এক টুরিস্ট পার্টির সঙ্গে সিকিম বেড়াতে গেছে। এখন উপায়? অগত্যা তিনি শ্যামাকে ধরলেন, বললেন,‘শ্যামামা, ছোট মেয়ের বাড়ি যাচ্ছি আমরা। মঙ্গলবার সকালে। একটা রাত কাটিয়ে পরদিন বিকেলেই ফিরব। তোকে যে মা বাড়িতে থাকতে হবে। থাকবি তো? তোর কোনও অসুবিধে হবে না তো?’ শ্যামা একপায়ে খাড়া। সে অভয় দিল, ‘বাবা, তুমি কিছু ভেবো না। আমি সবদিক আগলে রাখব।’সবেরা বিবি তাকে দেখিয়ে দিল কোন্‌ ঘরে সে শোবে, কোথায় বিছানা পাতবে। মশারি, বালিশ ইত্যাদিও আলাদা করে তাকে দেখাল। তারপর বললেন, ‘দুবেলা রান্না তুই করে নিবি। ঘরে ডিম আছে।’ এতগুলো বছর ধরে দেখছেন তিনি মেয়েটাকে, এমন বিশ্বাসী মেয়ে কোথায় পাবেন তিনি!

দেখতে দেখতে পবিত্র ইদুজ্জোহা এসে গেল। বকরি ইদ। শুধুমাত্র শ্যামার জন্যে আজ ভালো মাছ কিনেছেন সালাম সাহেব। সে আলাদা মাছ-ভাত রান্না করে খাবে। বাড়ির পরিবেশটাই পালটে গেছে যেন। দু’মেয়েই বাপের বাড়ি এসেছে। তারা ভায়েদের এবং মা-বাবার জন্যে নতুন উপহারসামগ্রী এনেছে। দুজনেই যখন তাদের শ্যামাদির হাতে নতুন শাড়ি তুলে দিল, তখন শ্যামা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না – কেঁদে ফেলল। বলল, ‘দিদি, তোমাদের ঋণ এ জীবনে শোধ করতে পারব না গো। এই দ্যাখো না, বাবা তো আমাকে দুর্গাপুজোয় আর পয়লা বোশেখে জামাকাপড় দেয়। আজও দেবে, আমি জানি। বিধবা মানুষ, এত জামাকাপড় কখন পরব বলো তো?’ একটু থেমে সে আবার জানাল, ‘এরপর তো এবাড়ির কুটুমজনরা যখনই আসে, আমার জন্যে কিছু না কিছু তো নিয়ে আসবেই। আমার ভাল্লাগে না, বাপু।’ সালাম সাহেব বারান্দায় চেয়ারে বসে উপভোগ করছিলেন এই মধুর দৃশ্য! তাঁর ভালো লাগছিল এই দেখে যে তাঁর দুই মেয়ে শুধুমাত্র বাবা-মা-ভাইদের কথা ভাবেনি, শ্যামাকেও বাড়ির সদস্য মেনে তার জন্যেও উপহার এনেছে। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘শ্যামামা, শোন। আমার আত্মীয়রাও তোকে উপহার দেয় কেন, জানিস? তোর ব্যবহার, আচার-আচরণ, সব্বার সুখসুবিধের দিকে নজর রাখা – কজনের এই দায়িত্ববোধ থাকে, বল্‌তো? তার চেয়ে বড় কথা কী জানিস, তোর মতো মন আর সততা কজনের আছে রে? বাড়ির সব্বাই, আমাদের কুটুমজন পর্যন্ত দামি ঘড়ি-গয়নাগাটি-টাকাপয়সা এখানে ওখানে ছড়িয়ে রাখে। কোনওদিন তো একটা জিনিসও এধার ওধার হয়না!’ শ্যামা তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘বাবা, কোনও পাপ কাজ আমার দ্বারা হবে না কখনো।’‘তা জানি আমি, সেজন্যেই তো তোকে মা বলে ডাকি,’ কথাগুলি বলার সময় সালামসাহেবকে স্পষ্টতই একজন তৃপ্ত মানুষ মনে হচ্ছিল।

তৃপ্ত তো তিনি বটেই। বড় ছেলেকে কলকাতায় হোস্টেলে রেখে এম এ পাশ করিয়েছেন। তারপর নিজের চালু ব্যবসায়ে তাকে বসিয়েছেন। প্রথমে সে গাঁইগুঁই করেছিল, এম এ পাশ করে শেষে ব্যবসা! পরে সালাম সাহেবের যুক্তির কাছে হার মেনেছিল সে। আব্বাই তাকে বুঝিয়েছিলেন, পৈতৃক সম্পত্তি ও ব্যবসা রক্ষা করা পুত্রের নৈতিক কর্তব্য। তাছাড়া একজন শিক্ষিত মানুষ যদি ব্যবসা করে, তার জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিবেক ব্যবসায় নিয়োগ করে, সে ব্যবসার জেল্লা অনেক দূর ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য। বড় ছেলে আর অমত করেনি। এখন সে গদিতে বসে। সালাম সাহেব অভ্যাসবশত রোজ দোকানে আসেন, গদির পাশে একটি চেয়ারে বসেন – কেনাবেচা লক্ষ্য করেন। পুরানো খদ্দের এলে খুশি হন, তাঁদের সঙ্গে কুশলসংবাদ বিনিময় করেন। তাঁর সময় কেটে যায়।

একজন নারী, যাকে তিনি মা বলে সম্বোধন করেছেন, কন্যার মতো স্নেহ-ভালোবাসা উপুড় করে দিয়েছেন প্রায় পনেরোটা বছর, একটু পরেই সে কয়েকমুঠো ছাইয়ে লীন হয়ে যাবে! চিতায় অগ্নিসংযোগ হতেই ‘বল হরি, হরিবোল’ ধ্বনি শুনতে পেলেন তিনি। অত্যন্ত মানসিক দৃঢ়তাসম্পন্ন যুক্তিবাদী মানুষ তিনি। কিন্তু পাড়ে দাঁড়িয়ে আজ তিনি ভেঙে পড়লেন

ছোট ছেলে পনেরো-ষোলো কিলোমিটার দূরে বি এল আর ও অফিসে চাকুরে। বাড়ি থেকেই তার যাতায়াত। সকাল নটার মধ্যে তাকে বাড়ি থেকে বেরুতে হয়। এদিকে সবেরা বিবিরও সেই কর্মক্ষমতা আর নেই। ইদানীং বাতের ব্যথা তাঁকে বড্ড ভোগাচ্ছে। তাই সংসারের বেশি দায়দায়িত্বই শ্যামার কাঁধে। সকাল সকাল পাটঝাঁট সেরে সে উনুনে ভাত চাপিয়ে দেয় তার বাবুসোনার জন্যে। সবেরা বিবির নির্দেশমতো তাকে খেতে দেয়। সে চলে গেলে আরও একবার, একটু বেলার দিকে, তাকে উনুনগোড়ায় বসতে হয়। এবার বাড়ির বাকি লোকজনদের জন্যে। সবেরা বিবি জিগ্যেস করে, ‘হ্যাঁ রে শ্যামা, ছেলেরা কোনও খোঁজখবর নেয়?’‘নাঃ,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে শ্যামা। তার অকথিত বেদনা ছুঁয়ে যায় তাঁকে, আর এক জননীকে। তিনি সান্ত্বনা দেন, ‘ শোন্‌ মা, যার কেউ নেই, তার আল্লা আছে।’ একটু থামলেন তিনি। তারপর তাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন, ‘তাছাড়া তোর বাবা তোকে কত ভালোবাসে। সারাজীবন তোর কোনও কষ্ট হবে না। আমরা হয়তো তদ্দিন বাঁচব না। কিন্তু ছেলেদের আমরা বলে যাব, তোর উপর যেন কোনও অবিচার না হয়।’ বলতে বলতে তাঁর গলা ধরে এসেছিল। নিজের আবেগ সংযত করে তিনি শ্যামার দিকে তাকালেন। শ্যামা ভাবেনি ভিন্ন ধর্মের এইসব লোকজন তার মতো একজন ছোট জাতের হিন্দু বিধবার জন্যে এত মঙ্গলচিন্তা করবেন! নিজেকে সামলাতে পারল না সে, কেঁদে ফেলল হাউ হাউ করে।

সকাল আটটা বাজতে চলল। বড় ছেলে সাকিব চা-বিস্কূট খেয়ে দোকানের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় এসময়। সবেরা বিবি অত্যন্ত চিন্তিত মুখে ছেলের কাছে এসে দাঁড়ালেন, ‘বড় খোকা, আজ একবার শ্যামার খোঁজ নিয়ে আয় না। সেই যে পরশু বিকেলে বাড়ি গেল, আজও এল না। এমন তো ও কখনও করে না। অসুখবিসুখ করেনি তো?’
‘দ্যাখো মা, এখন শেষ চৈত। আখেরি মাস। খদ্দেরদের কাছ থেকে টাকাপয়সা আদায়ের জন্যে চারদিক ছুটতে হচ্ছে। বড্ড চাপ।’ তারপর পায়ে চটি গলাতে গলাতে বলল, ‘ঠিক আছে, দেখছি।’ বলে সে দ্রুত বেরিয়ে গেল। সবেরা বিবি হতাশ হলেন। তাহলে কি আবুকে বলবেন? তিনি ধীরে ধীরে আবুর ঘরে ঢুকলেন। দেখলেন, চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে আবু গুনগুন করে গান গাইছে। তাঁর মনে হল, আবু বেশ খুশমেজাজে আছে। তাই ভূমিকা না করে সরাসরি তাকে বললেন, ‘বাবা, দেখছিস তো, তোদের শ্যামাদিদি পরশু থেকে আসছে না। বোধ হয় শরীর খারাপ। অফিস থেকে ফিরে একটু খোঁজ নিবি?’ আবু যে শ্যামাদিদির অনুপস্থিতি লক্ষ্য করেনি, তা নয়। সে ভেবেছে, হয়তো দিদির সামান্য জ্বর-জ্বালা হয়েছে। তাই ততটা গুরুত্ব না দিয়ে সে বলল, ‘দ্যাখো মা, অফিসে এখন ইয়ার-এনডিং চলছে। ভীষণ চাপে আছি। আজ তো হবেই না। তবে কাল একটু সকাল সকাল ফিরে সাইকেল নিয়ে নিশ্চয়ই খোঁজ নেব।’

খোঁজ নিতে আর হয়নি। পরদিন সকালবেলা নামাজ সেরে ফেরার পথে অমূল্য মণ্ডলের মুখে খবরটা পেয়েছিলেন সালাম সাহেব। এখান থেকে ছয় কিলোমিটার দূরের এক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ইন্তেকাল হয়েছে শ্যামার। মাত্র দুদিনের ভয়ংকর ডায়েরিয়া তার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। তার দুরবস্থা দেখে বাউরিপাড়ার দুচারজন ছেলেছোকরা বড়দের পরামর্শ মেনে যখন তাকে ভ্যানরিক্‌সায় তোলে, তখনই তার সাড় ছিল না। হাসপাতাল তাকে প্রথমে ভর্তি করতে চায়নি – পরে অনেক কাকুতিমিনতির পর তাকে ভর্তি করা হয়। আজই ভোররাত্রে সে মারা গেছে। অমূল্য মণ্ডলের এক পড়শির রোগী ভর্তি আছে ওখানে। সে শ্যামাকে সালাম সাহেবের বাড়ির কাজের লোক হিসেবে চিনত। সে-ই খবরটা তাকে দিয়েছে। এরপর সালাম সাহেব যা শুনলেন, তাতে তিনি স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। সারা দিন সারা রাত বেডে একাই পড়েছিল শ্যামা। যারা তাকে ভর্তি করতে এসেছিল, তারা ভর্তি করে দিয়েই পগার পার। ডাক্তারবাবু শ্যামার পুত্র কিংবা নিকটাত্মীয়দের খোঁজ করেছিলেন – কাউকে পাননি। এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওষুধপত্রের আকাল চিরকালই। তাই শ্যামাকে প্রায় বিনা চিকিৎসায় চলে যেতে হল। সালাম সাহেব মনে মনে আপশোষ করতে লাগলেন, শ্যামার পাড়ার লোকেরাও তাঁকে একবার খবর দেবার প্রয়োজন বোধ করল না! অকালে চলে গেল মেয়েটা!

নিজেকে একটু সামলে নিয়ে চেয়ার থেকে উঠলেন সালাম সাহেব। ছেলেদের নির্দেশ দিলেন, ‘তোরা এখনই ঐ হাসপাতালে যা। নিজেদের পরিচয় দিবি। ড্ডে্‌বডি এখানকার শ্মশানে নিয়ে আয়। হ্যাঁ, ডেথ সার্টিফিকেট নিতে যেন ভুল না হয়।’ তারপর তাঁর দোকানের বিশ্বস্ত এক কর্মচারীকে ডেকে নদীর ওপারে গিয়ে শ্যামার ছেলেদের এক্ষুনি খবর দিতে বললেন। এছাড়া শ্যামার পাশের ঝুপড়ির বাসিন্দা তার সম্পর্কিত বোন ও বোনপোদেরও যেন খবর দেওয়া হয়, তিনি তাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন। এবার সবেরা বিবির দিকে ফিরলেন তিনি। বারান্দার একটা পিলারে গা ঠেকিয়ে তিনি থম মেরে বসেছিলেন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তাঁর চোখের কোণ থেকে ঝরে পড়া অশ্রু গাল পর্যন্ত নেমে শুকিয়ে গেছে। সালাম সাহেব তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন, ‘কেঁদে কী লাভ বলো! তোমার কষ্ট আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু শ্যামামার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া তো করতে হবে! ছেলেগুলো তো সব কুলাঙ্গার! আমি এখন প্রধানসাহেবের কাছে চললুম। দেখি কী করা যায়।’

সাতসকালে সালামসাহেবকে তাঁর দরজায় দেখে অবাক হলেন পঞ্চাশোত্তীর্ণ অঞ্চল প্রধান পেশায় স্কুলশিক্ষক অচিন্ত্য চক্রবর্তী। দুয়ার থেকে তড়িঘড়ি নেমে এলেন তাঁর কাছে, দুটি হাত জড়িয়ে বললেন, ‘আমার কী সৌভাগ্য, আপনি আমার বাড়ি এসেছেন। বলুন, কী করতে পারি আপনার জন্যে।’ একটা চেয়ার সালাম সাহেবের জন্যে এগিয়ে দিয়ে তিনি আর একটা চেয়ারে বসলেন। তারপর জিজ্ঞাসু চোখে সালামসাহেবের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সালাম সাহেব সংক্ষেপে শ্যামার দুর্ভাগ্য, তারপর তার নিঃসঙ্গ মৃত্যুর কথা জানালেন। এরপর অনুরোধের সুরে প্রধানসাহেবকে বললেন, ‘দেখুন, আমার দুই ছেলে ডেড্‌বডি আনতে গেছে। ওরা তো রক্তসম্পর্কিত কেউ নয়। তাছাড়া ওরা ভিন্ন ধর্মের। আপনি যদি হাসপাতালে একটু ফোন করে দেন, ডেড্‌বডি নিয়ে আসতে সুবিধে হবে।’ সালামসাহেবের মতো একজন মানী লোকের এই অসহায় কাতরতায় তিনি যুগপৎ বিস্মিত ও মুগ্ধ হলেন। বললেন, ‘এ আর এমন কী কাজ! আমি এক্ষুনি ফোন করে দিচ্ছি। কিচ্ছু চিন্তা করবেন না।’আশ্বস্ত হয়ে এবার সালামসাহেব বিনীতভাবে বললেন, ‘আর একটা অনুরোধ। আপনি যদি একজন অগ্রদানী আর শবদাহের জন্যে কিছু লোকজন জোগাড় করে দেন, অভাগীটা মরে গিয়েও শান্তি পাবে। আমার অসহায় অবস্থাটা একটু বিবেচনা করুন।’ প্রধানসাহেব একটুও বিচলিত না হয়ে বললেন, ‘কিচ্ছু ভাববেন না। আমি দেখছি।’ তিনি উঠলেন এবং মোবাইলে একটার পর একটা ফোন করতে লাগলেন। ফোন করা শেষ হলে বললেন, ‘সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। হরেন ধাড়াকে আমি সব বলে দিয়েছি। শ্মশানে সব ব্যবস্থা করে রাখছে সে। আপনি নিশ্চিন্তে বাড়ি যেতে পারেন।’

এত সহজে তাঁর সমস্যার সমাধান হবে, ভাবেননি সালামসাহেব। ওঠার সময় তিনি অনেক ধন্যবাদ জানালেন অচিন্ত্যবাবুকে। তিনি দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন সালামসাহেবকে। নিজের মনেই বললেন, ঈশ্বর, তুমি কত সুন্দর!
শ্যামাকে নিয়ে আসা হয়েছে একটা ভ্যান রিক্‌সায়। সঙ্গে এসেছে তার পড়শি দুই তরুণ আর আসফাক ও আবু। নদীবাঁধ থেকে যে ঢাল নেমে গেছে, তার বেশ খানিকটা দূরে শ্মশান। ভ্যানরিক্‌সা যাবে না সেখানে। কী করা যায়, ভাবছিল আসফাক। সেই দুই তরুণ জানাল, আমরা হাট থাকে একটা চৌপায়া কিনে আনছি। তারা ছুটল এবং কিছুক্ষণ পরেই ফিরল। ইতিমধ্যে সালাম সাহেব নিজে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। একবার তাকালেন তাঁর শ্যামামা-র দিকে।সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলেন। তাঁর মনে হল, অত্যন্ত যন্ত্রণাক্লিষ্ট একটা রুগ্ন চোখমুখ তাঁকে যেন কী বলতে চাইছে! তিনি তাড়াতাড়ি ডেড্‌বডি চৌপায়ায় তোলার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু শ্যামার প্রতিবেশি মাত্র দুজন উপস্থিত। শবদেহ বহন করার জন্য বাকি দুজন ব্যক্তি কোথায় পাওয়া যাবে! সালাম সাহেব তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। দুই ছেলেকে হুকুম করলেন, ‘সামনে তোরা দুজন দুদিকে কাঁধ লাগা।আর ওরা দুজন পিছনে যাক।’ আসফাক ও আবু একটু ইতস্তত করছিল। তারা যথেষ্ট বড় হয়েছে। তাই ভেবে পাচ্ছিল না, এই কাজ সমীচীন কিনা! আব্বুকে কিছু বলার আগেই তারা শুনতে পেল তাঁর কঠোর নির্দেশ, ‘যা বলছি, তাই করো। এখন আর ভাবার সময় নেই।’ কোনও কথা না বাড়িয়ে তারা তাদের আব্বার নির্দেশ পালন করতে তৎপর হল।

শ্যামাকে শোয়ানো হয়েছে চিতায়। শ্যামার দুই পুত্রকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাদের সেই তুতো ভাইকে অনেক কষ্টে রাজি করিয়েছে হরেন ধাড়া। মুখাগ্নি করবে সে। একটু দূর থেকে সালাম সাহেব দেখছেন, কীভাবে অগ্রদানী, অগ্নিকর্তা ও শবদাহকারীবৃন্দ ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করলেন। এবার মুখাগ্নি হবে। তিনি দুই পুত্রকে নিয়ে সরে এলেন। একজন নারী, যাকে দুদিন আগেও তিনি মা বলে সম্বোধন করেছেন, নিজের কন্যার মতো স্নেহ-ভালোবাসা উপুড় করে দিয়েছেন প্রায় পনেরোটা বছর, একটু পরেই সে কয়েকমুঠো ছাইয়ে লীন হয়ে যাবে! চিতায় অগ্নিসংযোগ হতেই ‘বল হরি, হরিবোল’ ধ্বনি শুনতে পেলেন তিনি। তারপর ধীরে ধীরে নদীঘাটের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। অত্যন্ত মানসিক দৃঢ়তাসম্পন্ন যুক্তিবাদী মানুষ তিনি। কিন্তু পাড়ে দাঁড়িয়ে আজ তিনি ভেঙে পড়লেন। নিজেকে স্থির রাখতে পারলেন না – ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন সেই আদিম নির্জনতায়, নদীজলের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে। অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করলেন তিনি। তাঁর মনে পড়ছিল, একবার তাঁর অসুস্থতার সময় কীভাবে তাঁর শ্যামামা তাঁর ঘরের বাইরে বারান্দায় খোলা দরজার সামনে সারারাত জেগে বসেছিল, তাঁর বিবির কাছে বারবার তার বাবার খোঁজ নিচ্ছিল। এছাড়া, তিনি আশ্চর্য হতেন এই ভেবে যে, শ্যামামা মুখ ফুটে তাঁকে তার দুঃখময় জীবনের কথা সাতকাহন করে বলে কোনওদিন কোনও সুযোগ নেয় নি! একজন গ্রাম্য নিরক্ষর নিম্নবর্গীয় নারীর কী সততা ও পরিণত মানসিকতা! নিজের আবেগকে তিনি সংযত করতে চাইছিলেন, পারছিলেন না! তাঁর ঠোঁট এত কম্পমান কেন! তাঁর দুগাল বেয়ে এত অশ্রু কেন! তিনি একবার পিছন ফিরে, দূরে, চিতার দিকে তাকালেন। লকলকে শিখায় সম্পূর্ণ ঢেকে গিয়েছে তাঁর শ্যামামা। তিনি আর তাকাতে পারলেন না। প্রায় আশির কাছাকাছি বয়সে এই অভিজ্ঞতা তাঁর প্রথম। এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি যে তাঁকে কোনওদিন হতে হবে, তা’ ছিল তাঁর স্বপ্নের বাইরে। তিনি কি অন্যায় করলেন? পরক্ষণেই মনে হল তাঁর, তিনি তো মানবধর্ম পালন করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, সর্বশক্তিমান আল্লা তাঁকে সুবিচার দেবেন।

কয়েক পা এগিয়ে নদীর পশ্চিম দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন তিনি। মনে হল, তাঁর শরীর আর বইছে না। তিনি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন সেখানেই। তারপর জীবনে এই প্রথম ‘আল্লা’ না উচ্চারণ করে, ঊর্দ্ধাকাশে মুখ তুলে মনে মনে প্রার্থনা করলেন, ঈশ্বর, আমার মেয়েটা বড় দুঃখী গো! ওকে সুখে রেখো!

 

♦–♦♦–♦♦–♦


❤ Support Us
error: Content is protected !!