Advertisement
  • প্রচ্ছদ রচনা স্মৃ | তি | প | ট
  • অক্টোবর ১৮, ২০২৫

প্রয়াত প্রচারবিমুখ, বহুমুখী প্রতিভার নীলাঞ্জনা ঘোষ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
প্রয়াত প্রচারবিমুখ, বহুমুখী প্রতিভার নীলাঞ্জনা ঘোষ

দুটি জোড়ালো আলো যদি কাছাকাছি থাকে, নির্মাণ হয় বৃহৎ-এর, তখন তাঁদের আলাদা করে চেনা দুস্কর। তাঁর উজ্জ্বল যে পরিচয়, আলোচিত নন্দিত তা হলো তিনি, বিশ্ববরেণ্য পরিচালক গৌতম ঘোষের সহজিয়া সাথী, জীবনপথের মনের মানুষ। তবে এ পরিচয় বিশালতার অল্পখানি। গৌতমের প্রত্যেকটি নির্মাণে তাঁর স্পন্দিত ভূমিকা, সাজসজ্জা আর দৃশ্য পরিকল্পনায় শিল্পিত ছোঁয়া। সুলেখিকা, সমাজকর্মী, হস্তশিল্প, বিশেষ করে বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য ‘কাঁথাশিল্প’-এর পুরুদ্ধারে যিনি অমোঘ, ঐকান্তিক— এমনই বহুমুখী অথচ প্রচারবিমুখ প্রতিভা নীলাঞ্জনা ঘোষ প্রয়াত। শনিবার ভোররাতে তাঁর মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই সংস্কৃতি-কলাক্ষেত্র, শিল্পজগৎ স্তব্ধ, পাথরসম শোকে স্তব্ধ আমরাও।

জীবনে যাঁর শান্তিনিকেতনের সাথে নিবিড় আলেখ্য। অন্ধকারে আলোকবর্তীকাসম বাঙালি শিল্প, সাহিত্য আর চলচিত্রের নক্ষত্রপুঞ্জের সাথে অনাবিল মেলামেশা, সহচার্যের বেজে ওঠা গান। অধ্যাপক রাধাবিনোদ আর শ্রীলতার কন্যা ‘খুকু’ কালের নিয়মে, শান্তদৃপ্ত ছায়া মেলে হয়ে উঠলেন নীলাঞ্জনা। বাংলা হস্তশিল্পকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার এক অম্লান মুখ। আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃত, তাঁর নিখুঁত শিল্পকর্ম, কাঁথা শিল্পের মাধ্যমেস্থানীয় মহিলাদের জীবনে নতুন প্রাণের সঞ্চারিকা। চেয়েছিলেন, প্রান্তিক নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করে তুলতে।

গৌতম ঘোষের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি প্রীতি, চলচিত্র আর তথ্যচিত্রের বিস্ময় প্রবাহ, সে তাঁর একার নয় কিছুতেই, প্রতিটা ছত্রে, প্রতিটি অধ্যায়ে জুড়ে আছেন, মিশে আছেন নীলাঞ্জনা। ভাবনা থেকে চিত্রনাট্য, লোকেশন থেকে নির্মাণকৌশল, সাজসজ্জা থেকে বিনির্মাণ সবেতেই নীলাঞ্জনার সুচারু উপস্থিতি। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘মনের মানুষ’ ‘মনন’, ‘যাত্রা’, ‘মহাপৃথিবী’-এর মতো কালজয়ী ছবির নেপথ্যে শান্ত, নিরব শিল্পীর অবিচল উপস্থিতি। সিনেমা আর তথ্যচিত্র নির্মাণের সেসব আশ্চর্য কাহিনী, বহুমুখী অভিজ্ঞতা সুচিন্তন, বলিষ্ট ধারাবাহিক কলমে ২০১৪-২০১৭ পর্যন্ত নিয়মিত ‘আরম্ভ’-র পাঠকদের শুনিয়েছিলেন লেখিকা নীলাঞ্জনা ঘোষ। গৌতম ঘোষের সিনেমা নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে নিয়ে লিখেছেন ‘আলোছায়া’। স্মৃতিকণায় বারবার ধরা দিয়েছে দুই একক মানুষের বান্ধবযাত্রার আখ্যান। ১৯৭৯ সালে গৌতমের প্রথম কাহিনীচিত্র ‘মা ভূমি’ দিয়ে শুরু, ২০১২-য় ‘শূন্য অঙ্ক’ পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে বাংলা চলচিত্র নির্মাণে নিবেদিত দুটি প্রাণ সতেজ বাতাস ছড়িয়েছেন অকৃপণ হাতে। ‘ছায়ায় গৌতম’-এ নীলাঞ্জনা শোনাচ্ছেন দেশে-বিদেশে পরিচালক হিসাবে গৌতমের উদ্বুদ্ধ উত্থান। অর্থাভাবেও পে-পরোয়া অভিঘাত, তরুণ তুর্কীর নির্মাণজেদ। নাটক-কবিতা-ছবি-গানে মুখর যৌথ খামার। জুড়ে যান আত্মিক সুনীল, সমরেশরা। ১৯৮০ সালে পশ্চিমবঙ্গ তথ্য সংস্কৃতি দপ্তরের প্রস্তাবে আর অর্ত্থ সাহায্যে সুশীল জানার গল্প অবলম্বনে গৌতম তৈরি করলেন স্বল্পদীর্ঘের ছবি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনের কথন, সংগ্রামের কথা ঢুকে পড়ল সংস্কৃতিপ্রবণ নাগরিক কোলাহলে। ‘মা ভূমি’-তে যে অস্থিরতা, সামাজিকতার কথা ফুটে ফুটে বেড়িয়ছিল, ১৯৯০-এ এসে সুরসাম্রাজ্ঞী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরিতে শান্তিনিকেতনে তাঁবু যখন পড়ল, তা অনেকখানি শান্ত। বর্ষামঙ্গলের অনাড়ম্বর, সজল আবেশ নিয়ে ঢুকে পড়ছেন রবীন্দ্রনাথ, বসন্তদিনের লাল স্মৃতিতে গৌতম-নীলাঞ্জনার শৈশবস্নেহ, আনন্দময় কৌশোর। না-জানা বহু কথা, চলচিত্র, শিল্প, সঙ্গীত, সাহিত্যের ভিন্ ভিন্ ঘরানার ব্যক্তিত্ব, কাজ, মনস্তাত্ত্বিক ঘাত-অভিঘাত, জয়-পরাজয় আর নিবিড় স্থিরতার গল্প নীলাঞ্জনা ‘আরম্ভ’-এর পাঠকদের দীর্ঘদিন যে ভাবে অবিভূত, বিস্মিত করে রেখেছে আজ, এই শোকপর্বে আমাদের বারবার মনে পড়ে যায়, বেজে উঠছে সকরুণ বাণী।

শুক্রবার রাতেই আচমকা অসুস্থ বোধ করায় দ্রুত ঢাকুরিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় নীলাঞ্জনাকে। চিকিৎসকেরা জানান, ‘অ্যানিউরিজ়ম’-এর কারণে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। শারিরীক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। আমাদের আশা ছিল লড়াকু প্রাণ নিশ্চয় দ্রুত সেরে উঠবেন, তা হলো না। শনিবার ভোররাতে ভেঙে গেল বুক, একের পর এক স্মৃতি এসে জড়ো হতে থাকল চেতনে-অবচেতনে।

নীলাঞ্জনার চলে যাওয়া শুধু ঘোষ পরিবারের পারিবারিক ক্ষতি নয়, বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতি জগতের এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করে দিয়ে গেল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শোকবার্তায় লিখেছেন, ‘আমার প্রিয় বৌদি, গৌতম ঘোষের স্ত্রী নীলাঞ্জনা ঘোষের মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে বিচলিত। তাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। তিনি শুধু শিল্পী নন, একজন সমাজসেবকও ছিলেন। তাঁর হাতের শিল্প আমাদের মনে গভীর ছাপ রেখেছে।’ আমাদের অনুভূতিও খানিক একইরকম, তবে আপনার চলে যাওয়ার যন্ত্রণায় শোকস্তব্ধ। তাঁর কাজ, তাঁর চিন্তা, তাঁর প্রেরণা বাংলা শিল্প-সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে চিরজীবী হয়ে থাকবে, এ বিশ্বাস আমাদের অটুট। গৌতম ঘোষের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানোর ভাষা নেই, আছে শুধু শোকে শরিক হবার টান। শনিবার বিকেল ৫টা নাগাদ তারাতলা মহাশ্মশানে নীলাঞ্জনার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে, কিন্তু তাঁর অবিনাশ স্মৃতি, কাজের অনুররন জেগে থাকবে, জ্বলে থাকবে নিশ্চয়।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!