- প্রচ্ছদ রচনা বি। দে । শ
- মার্চ ১৮, ২০২৬
লোককথা ছাপিয়ে ইতিহাসে আফ্রিকার রাজা ! ৫০০ বছরের পুরনো ফরমানেই মিলল অস্তিত্বের প্রমাণ
এতদিন তিনি ছিলেন লোককথা আর কিংবদন্তির চরিত্র, ইতিহাসের পাতায় নাম থাকলেও অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ ছিল না। সেই নুবিয়ান রাজা কাশকাশকে ঘিরে দীর্ঘদিনের সংশয় ভাঙল অবশেষে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে উঠে এল ৫০০ বছর আগের এক প্রশাসনিক আদেশপত্র, যা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, কাশকাশ কোনো মিথ চরিত্র নন, তিনি ছিলেন রক্তমাংসের বাস্তব শাসক।
উত্তর সুদানের প্রাচীন নগরী ওল্ড ডোঙ্গোলার ধ্বংসাবশেষে খনন চালাতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করেন গবেষকেরা। উদ্ধার হয় কাগজের টুকরো, যা আসলে একোটি প্রশাসনিক ফরমান, যেখানে রাজা কাশকাশের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রায় ৫ শতাব্দী পুরনো নথির অংশ, যা একই জায়গা থেকে পাওয়া প্রায় দু–ডজন কাগজের টুকরোর মধ্যে অন্যতম।
‘আজানিয়া: আর্কিওলজিক্যাল রিসার্চ ইন আফ্রিকা’ পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণায় জানানো হয়েছে, খননকার্য চালানো হয়েছিল একটি প্রাসাদোপম স্থাপনায়, যা একসময় উচ্চপদস্থ কোনো শাসক বা প্রভাবশালী ব্যক্তির বাসভবন ছিল। নীল নদের পূর্ব তীরবর্তী এই স্থাপনাটি ‘বিল্ডিং এ.১’ বা ‘হাউস অব দ্য মেক’ নামে পরিচিত। সেখানেই মিলেছে এই বিরল নথি। আরবি ভাষায় লেখা ফরমানটি আকারে ছোটো হলেও তাৎপর্যে বিপুল। তাতে এক অধস্তন কর্মচারীর উদ্দেশে জারি করা বস্ত্র ও গবাদি পশু সংক্রান্ত একটি নির্দেশ রয়েছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, এ ধরনের প্রশাসনিক নথি সাধারণত দৈনন্দিন শাসনকার্যের অংশ হলেও, কাশকাশের মতো ‘অস্তিত্ব-সন্দেহে থাকা’ এক রাজার ক্ষেত্রে এ এক যুগান্তকারী প্রমাণ।
ইতিহাস বলছে, মধ্যযুগে মাকুরিয়া ছিল এক সমৃদ্ধ খ্রিস্টান রাজ্য। কিন্তু ১৪শ শতাব্দীর পর থেকে ধীরে ধীরে তার পতন শুরু হয়। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের জেরে সে ইতিহাস ক্রমে মুছে যেতে থাকে। বিশেষত ১৬শ ও ১৭শ শতাব্দী সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব ছিল প্রকট। ফলে কাশকাশের মতো শাসকদের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠেছিল, তাঁরা ইতিহাসের মানুষ নাকি কেবল লোককথার চরিত্র ! নয়া আবিষ্কার সেসব প্রশ্নেরই জোরালো উত্তর। গবেষকেরা জানিয়েছেন, নথিটির নির্দিষ্ট তারিখ না থাকলেও আশপাশে পাওয়া জৈব উপাদান ও মুদ্রার সাহায্যে এর সময়কাল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। তাঁদের মতে, এটি সম্ভবত ১৬শ শতাব্দীর শেষভাগ বা ১৭শ শতাব্দীর শুরুর সময়ের।
তবে, শুধু এই একটি কাগজই নয়, একই জায়গায় মিলেছে ২০টিরও বেশি চিঠি, নোট ও আইনি নথি। পাশাপাশি উদ্ধার হয়েছে বস্ত্র, গয়না, চামড়ার জুতো, এমনকি হাতির দাঁত বা গণ্ডারের শিং দিয়ে তৈরি ছুরির হাতলও। গবেষকদের দাবি, এই সমস্ত উপকরণ মিলিয়ে বোঝা যায়, জায়গাটি সমাজের উচ্চস্তরের কোনো ক্ষমতাশালী ব্যক্তির বাড়ি ছিল। উদ্ধার হওয়া প্রায় ৪ বাই ৩.৫ ইঞ্চির এই কাগজে দরবারি লেখক হামাদ একটি নির্দেশ লিপিবদ্ধ করেছিলেন। সেটি পাঠানো হয়েছিল ‘খিদর’ নামে এক ব্যক্তির উদ্দেশে। তাতে রাজা কাশকাশ নির্দেশ দেন, ‘আবদ আল-জাবির’ নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে একটি ভেড়া সংগ্রহ করে তা ‘মুহাম্মদ আল-আরব’-কে দিতে হবে এবং বিনিময়ে তিন ইউনিট কাপড় নিতে হবে।
গবেষকদের মতে, ‘এই আবিষ্কার বিরলতম উদাহরণ, যেখানে এতদিন কেবল ধর্মীয় আখ্যান ও মৌখিক ঐতিহ্যে সীমাবদ্ধ থাকা এক ব্যক্তিত্বকে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে বাস্তব ইতিহাসের কাঠামোয় স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে।’ ফলে ইতিহাসের অন্ধকার কোণ থেকে উঠে এল এক বিস্মৃত নাম— কাশকাশ। আর তার হাত ধরে নতুন করে লেখা শুরু হলো আফ্রিকার এক হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়।
❤ Support Us








