- বি। দে । শ
- মার্চ ৩১, ২০২৬
ইরানের মাশাদ বিমানবন্দরে ভারতমুখী ত্রাণবাহী বিমানে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত, যুদ্ধের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন
মার্কিন-ইজরায়েল-ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই সামনে এল এক উদ্বেগজনক খবর। অভিযোগ উঠেছে, মার্কিন বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের মাশাদ বিমানবন্দরে থাকা একটি ভারতমুখী বিমানে আঘাত হেনেছে। ওই বিমানটি মানবিক কারণে ভারতে আসার কথা ছিল এবং ত্রাণসামগ্রী পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে জানা গেছে। যদিও, এ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার দারভার স্বীকার করেনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু ইরান প্রশাসনের বক্তব্যে স্পষ্ট, এটি নিছক সামরিক লক্ষ্যভ্রষ্ট হামলা নয়, বরং মানবিক সহায়তার ওপর আঘাত।
ইরান প্রশাসনের দাবি, সংশ্লিষ্ট বিমানটি মাহান এয়ার-এর, গন্তব্য ছিল ভারত। পরিকল্পনা ছিল, বিমানটি দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এ অবতরণ করবে, সেখান থেকে জরুরি ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ করে তা আন্তর্জাতিক সংস্থা রেড ক্রস-এর মাধ্যমে ইরানে পৌঁছে দেওয়া হবে। অর্থাৎ, যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে মানবিক সহায়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হওয়ার কথা ছিল বিমানটির। কিন্তু মার্কিন হামলার ফলে সে পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে।
এ ঘটনাকে ঘিরে আরও একবার সামনে এসেছে ইরানের বর্তমান মানবিক সংকটের চিত্র। গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ইরান-এর একাধিক অঞ্চলে লাগাতার হামলার অভিযোগ উঠেছে ইজরায়েল এবং মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে। ইরানের বক্তব্য, একাধিক হামলায় শুধু সামরিক ঘাঁটি নয়, অসামরিক অবকাঠামোও ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি মেয়েদের স্কুল ধ্বংসের অভিযোগও সামনে এসেছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ক্রমশ খাদ্য, ওষুধ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট বাড়ছে, ফলে যুদ্ধের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে আরও নির্মম হয়ে উঠছে।
এ পরিস্থিতিতে ভারতের ভূমিকা কি হবে, এ প্রশ্ন ঘিরে আলাদা করে জল্পনা শুরু হয়েছিল বিশ্বজুড়ে। এমত অবস্থায়, মানবিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে ভারত ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর উদ্যোগ নেয়, যা রেড ক্রসের মাধ্যমে ইরানে পৌঁছনোর কথা ছিল। তেহরান এ উদ্যোগকে প্রকাশ্যে স্বাগত জানায় এবং ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানায়। এমনকি প্রতীকীভাবে, ইজরায়েলের উদ্দেশে নিক্ষিপ্ত একটি ক্ষেপণাস্ত্রে ‘থ্যাঙ্ক ইউ পিপল অফ ইন্ডিয়া’ লেখা ছিল বলে দাবি করা হয়, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষায় এক অভিনব বার্তা হিসেবেই দেখা হয়েছিল। একইভাবে জার্মানি, স্পেন এবং পাকিস্তানের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিল ইরান।
কিন্তু মানবিকতার আবহের মাঝেই মাশাদের ঘটনায় এক তীব্র বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মানবিক সাহায্যের সঙ্গে যুক্ত একটি বিমানে হামলার অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলে নিন্দার ঝড় তুলেছে। যদিও এই হামলা সংক্রান্ত কোনও ছবি বা ভিডিও প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও প্রশ্ন উঠছে— যুদ্ধের নিয়ম এবং নৈতিকতা কি ক্রমশ গুরুত্ব হারাচ্ছে? মানবিক সহায়তাও কি আর নিরাপদ নয়? আর এই সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই আরও এক নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধের সূচনায় তাঁর বক্তব্য ছিল— ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে, এবং সেই সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করতেই এই সামরিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বক্তব্যের সুর বদলেছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ফিনান্সিয়াল টাইমস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প খোলাখুলিভাবে জানিয়েছেন, তাঁর লক্ষ্য ইরানের তেল, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং বিশেষ করে খার্গ দ্বীপ-এর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর কথায়, ইরানের তেল তাঁর ‘সবচেয়ে প্রিয় পণ্য’, এবং সেই সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করাই এই সংঘাতের অন্যতম উদ্দেশ্য। এই মন্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, কারণ এটি যুদ্ধের পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থের ইঙ্গিত বহন করছে।
খার্গ দ্বীপকে ইরানের অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু বলেই মনে করা হয়। পারস্য উপসাগরের বুকে অবস্থিত এই দ্বীপ থেকেই ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল রফতানি হয়। বিশাল তেলাধার, উন্নত লোডিং সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ— সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি দ্বীপ নয়, বরং ইরানের অর্থনৈতিক স্নায়ুকেন্দ্র। সরকারি আয়, পরিকাঠামো উন্নয়ন, এমনকি সামরিক ব্যয়ের একটি বড় অংশই এই দ্বীপের ওপর নির্ভরশীল। ফলে খার্গের নিয়ন্ত্রণ হারানো মানেই ইরানের অর্থনীতির ভিত কেঁপে ওঠা।
ট্রাম্পের দাবি, এই দ্বীপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ততটা শক্তিশালী নয় এবং চাইলে খুব সহজেই সেটি দখল করা সম্ভব। তাঁর এই মন্তব্যের পাল্টা কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। তেহরানের স্পষ্ট বার্তা, খার্গ দ্বীপে মার্কিন বাহিনী প্রবেশের চেষ্টা করলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে। একইসঙ্গে পারমাণবিক বিতর্কও এই সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের কাছে প্রায় ৪৫০ কিলোগ্রাম ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা খুব অল্প সময়ের মধ্যে ৯০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব— এবং সেই স্তরেই তা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে। যদিও এই দাবির পক্ষে কোনও নির্দিষ্ট প্রমাণ এখনও প্রকাশ করেননি তিনি, ফলে আন্তর্জাতিক মহলের একাংশ এই বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
❤ Support Us








