Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • এপ্রিল ১৯, ২০২৬

সে আলোর স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা

রিমি দে
সে আলোর স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা

এ জগতের যা কিছু শুভ-অশুভ কিংবা ভালো-মন্দ যাই হোক না কেন, সব কিছুর মধ্যমণি মানুষ। তাকে  ঘিরেই জগৎ-যজ্ঞ। পুরাণ বলছে , ভরত মুনি শিল্পকে সুশৃঙ্খল করতে নাট্যশাস্ত্রের তাত্ত্বিক ভিত্তি স্থাপন করেন। ইন্দ্রের অনুরোধে ব্রহ্মা জ্ঞান, শিল্প ও আনন্দের মাধ্যমে মানুষকে বিনোদন ও শিক্ষা দেবার জন্য নাট্যবেদ তৈরির নির্দেশ দেন। সে সময় বেদপাঠের অনুমতি সকলের ছিল না বলে ভরত এমন একটি শিল্পরীতি গড়ে তুলেছিলেন, যা সমাজ জীবন, সম্পর্ক, দ্বন্দ্ব ও নৈতিকতা তুলে ধরবে । ঋকবেদ থেকে পাঠ বা সংলাপ, সামবেদ থেকে সঙ্গীত, যজুর্বেদ থেকে অভিনয়, এবং অথর্ববেদ থেকে রস ও অনুভূতি নিয়ে তৈরি করেন পঞ্চম বেদ, যাতে জাতি লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলে তা পাঠ করতে পারে।

এইসব বিষয়ে ক্লাস সেভেনের মেয়েটির বিন্দুমাত্র জ্ঞান ছিল না। সে খেলাচ্ছলেই ‘সাত ভাই চম্পা’  শীর্ষক একটি নাটক লিখেছিল। আর যেদিন স্কুলে পুজোর ছুটি হলো, সেদিন ক্লাসের বন্ধুদের দিয়ে নাটকটি করিয়েছিল।  ভেতরে ভেতরে একটি নাটকের বীজের ছায়া নিজের অজান্তেই লালন করেছিল। তবু তার জীবন তাকে তেমনভাবে শিল্পটির সঙ্গে বেঁধে রাখেনি। তাতে কী! সে তবু ভালোবাসে নাটক। জীবন তার যেমন হোক কেন, সে শিলিগুড়ির নাটক ভালোবেসে ফেলেছিল। তারপর একদিন একটি কাগজ থেকে শিলিগুড়ির নাট্যচর্চা নিয়ে লেখার আমন্ত্রণ পেল । নাটক তো সে দেখেই । বাংলা নাটক নিয়ে তার যথেষ্ট আগ্রহ। এমনকি কলকাতায় গেলে এক ফাঁকে নাটক সে দেখবেই! শিলিগুড়ির বিভিন্ন নাট্যদল প্রযোজিত নাটক-এর পাশাপাশি বাইরে থেকে আসা নাটকও দেখা হয়। সর্বশেষ দেখা নাটকটির নাম ‘তারাসুন্দরি’। অনবদ্য একক অভিনয়। ঠিক এই শহরের নাট্যমোদী মানুষ দীনবন্ধু মঞ্চে একদিন যেমন দেখেছে ‘চরন দাস চোর’,’মেঘনাদবধ কাব্য’ কিংবা ‘দেবাংশী’।

মহানন্দা নদীর তীরে গনেশরামের আমবাগানের আটচালায় ‘ফ্রেন্ডস ইউনিয়ন’ নামে এক আড্ডাখানায় জন্ম নিয়েছিল শিলিগুড়ির নাট্য স্বপ্নমালার প্রথম বীজ। উস্কানিতে ছিলেন মোক্তার কালীপ্রসন্ন ভট্টাচার্য । হরসুন্দর মজুমদার, ভগবৎ বিশ্বাস, মন্মথনাথ সরকার, চন্দ্রমোহন রায় প্রমুখ বিভিন্ন পেশার বান্ধবেরা নাটকের মহলা শুরু করেন

শিলিগুড়ি শহরের একটি ম্যাজিক ইতিহাস আছে। জলপাইগুড়ি ,কোচবিহার বা মালদা,মুর্শিদাবাদের মতো রাজকীয় না হলেও, তারও আলোকিত প্রাক কথন রয়েছে।  বিংশ শতকের শুরুর দিক। শিলিগুড়ি জনপদের জনসংখ্যা তিন থেকে সাড়ে তিন হাজারের কাছাকাছি। সেকালে মহানন্দা নদীর তীরে গনেশরামের আমবাগানের আটচালায় ‘ফ্রেন্ডস ইউনিয়ন’ নামে এক আড্ডাখানায় জন্ম নিয়েছিল শিলিগুড়ির নাট্য স্বপ্নমালার প্রথম বীজ। উস্কানিতে ছিলেন মোক্তার কালীপ্রসন্ন ভট্টাচার্য । হরসুন্দর মজুমদার, ভগবৎ বিশ্বাস, মন্মথনাথ সরকার, চন্দ্রমোহন রায় প্রমুখ বিভিন্ন পেশার বান্ধবেরা নাটকের মহলা শুরু করেন। প্রযোজনার অন্তিম লগ্নে কালীপ্রসন্ন ভট্টাচার্য পোশাক ও মঞ্চসজ্জার জন্য কলকাতা পাড়ি দেন। সেখানে গিয়ে কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে কিছুদিনের মধ্যেই প্রয়াত হন। তাঁর স্বপ্নের নাটক গর্ভাবস্থাতেই প্রাণ হারায়।

কালীপ্রসন্ন-র জামাতা সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ছাত্র। সাতপুরুষ আগে এ পরিবারের শিবরাজ বাচস্পতি ছিলেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সভাসদ। আইন পাস করে সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বহরমপুর কোর্টে যোগদান দেন।  বেশ কিছুকাল পরে শিলিগুড়ি ফিরে, এখানকার আদালতে প্র্যাকটিস শুরু করেন । নাট্যপ্রেমী সুরেন্দ্রনাথ ফ্রেন্ডস ইউনিয়নের বাংলা রূপান্তর করে নামকরণ করেন ‘মিত্র সম্মিলনী’। নাট্যচর্চার প্রয়োজনে ও নিত্য বান্ধববর্গের সঙ্গে গঠনমূলক আড্ডার অনুভবে একখণ্ড জমিও দান করেন তিনি। সেই শ্রীভূমিতে তৈরি হলো মঞ্চ। কাঠের খুঁটি, মেঝে ও টিনের চাল, দেওয়াল নিয়ে  ১৯০৯ সালে, ১৩১৫ বঙ্গাব্দে শ্রীপঞ্চমীতে মিত্র সম্মীলনীর ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। প্রথম প্রযোজনা ‘হরিশ্চন্দ্র’। সালটা ১৯১৪।

মিত্র সম্মিলনীর সামনে সবুজ গোচারণভূমি। অভিনয়ের দিন বাঁশের উপর ত্রিপল খাটানো হতো। দর্শকদের জন্য ঘাসের উপর ত্রিপল পাতা। মহিলাদের জন্য একদিকে চৌকি। অনেকেই মঞ্চটিকে বলত নাচঘর।  অভিনেতাদের মধ্যে অতুল দত্ত, মন্মথনাথ সরকার,রাজেন দে, রাজেন মজুমদার, অমৃতলাল তরফদার, পরেশ সরকাররা মঞ্চ কাঁপাতেন। দুর্গাপুজো, লক্ষ্মীপুজো, দোলযাত্রা উপলক্ষে প্রায়ই সারারাত ধরে নাটক চলত।  নাটক শুরুর আগে আর বিরতিতে ছোটো ছোটো ছেলের দল মেয়ের বেশ ধরে সখিনৃত্যে মেতে উঠত। মঞ্চালোক বলতে ছিল, একটি চোদ্দ বাতি আর সামনে একসারি মোমবাতি। ১৯১৭ তে আসে দে-লাইট। [দে কোম্পানির লাইট] । ফুটলাইটে  মোমবাতির পরিবর্তে আসে কার্বাইড স্টিক ল্যাম্প। দর্শকাসনে থাকতেন রেল কর্মচারী, পদস্থ কর্মচারী, এসডিও আর ব্রিটিশ রাজপুরুষেরা।

পঞ্চাশের দশক। বাংলায় নব নাট্যের জোয়ার। আড্ডা দিতে দিতেই শহরের ইতিহাস গড়লেন পীযুষ ঘটক আর বিপ্লব বোস। তৈরি হল ‘হযবরল’। শিলিগুড়ির প্রথম গ্রুপ থিয়েটার । হাজারো প্রতিবন্ধকতার কারণে আলো দেখাতে পারেনি বলে, প্রথম গ্রুপ থিয়েটার রূপে স্বীকৃত হয়ে আছে ‘কথা ও কলম’। তাদের বেশ কিছু প্রযোজনার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ রক্তকরবী , অজেয় ভিয়েতনাম, অঙ্গার, পদ্মানদীর মাঝি

১৯২৪ সাল। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ‘হরিশ্চন্দ্র’ নাট্য প্রযোজনা বিঘ্নিত হলে, আমজনতার কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে নির্মিত হয় পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ। মিত্র সম্মিলনী রঙ্গমঞ্চ ও প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে আসবার পর তাদের নাটকের আঙ্গিকও বদলে যেতে থাকে ধীরে। সীতার পাতাল্প্রবেশ, দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ এধরণের দৃশ্যগুলির আঙ্গিকগত চমকে দর্শকেরা মোহিত হতে থাকে। কলকাতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না থাকা এক প্রান্তিক শহরে মঞ্চ প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষায় সুপরিচিত হয়ে উঠলেন অমরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি। ব্রিটিশ রাজত্বের সুর্যের নীচে, অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মতো বয়ে চলল জাতীয়তাবাদী চেতনা।

১৯২৫। দার্জিলিং যাবার আগে শিউমঙ্গল সিং-এর বাড়িতে মহাত্মা গান্ধী রাত্রিবাস করেছিলেন। সন্ধ্যেবেলায় এক সভায় গান্ধীজি মিত্র সম্মিলনী এসেছিলেন। সে বছরই শিশিরকুমার ভাদুড়ির প্রযোজনায় মিত্র সম্মিলনী মঞ্চে ইতিহাস লিখবে ‘সীতা’ নাটকটি।

১৯৩১। আইন অমান্য আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিশেষ সভা হয় মিত্র সম্মিলনী রঙ্গমঞ্চে। এরপরই,  পৌরাণিক ৪ নাটকের পাশাপাশি চলতে লাগল জাতীয়তাবাদী চেতনার বার্তা ছিল উচ্চকিত ঐতিহাসিক নাটক।

চল্লিশের দশক। গণনাট্যের যুগ। ১৯৪৮। শিলিগুড়িতে ‘আর্য সমিতির’ প্রতিষ্ঠা হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামী বিজয়কৃষ্ণ ঘোষ প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং কালীব্রহ্ম মুখার্জি প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।

পঞ্চাশের দশক। বাংলায় নব নাট্যের জোয়ার। আড্ডা দিতে দিতেই শহরের ইতিহাস গড়লেন পীযুষ ঘটক আর বিপ্লব বোস। তৈরি হল ‘হযবরল’। শহরের প্রথম গ্রুপ থিয়েটার । হাজারো প্রতিবন্ধকতার কারণে আলো দেখাতে পারেনি বলে, প্রথম গ্রুপ থিয়েটার রূপে স্বীকৃত হয়ে আছে ‘কথা ও কলম’। তাদের বেশ কিছু প্রযোজনার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ রক্তকরবী , অজেয় ভিয়েতনাম, অঙ্গার, পদ্মানদীর মাঝি ইত্যাদি। ‘কথা ও কলম’-এর মহলা হতো চারু মজুমদারের বাড়ি। চারু মজুমদার নিজে কার্যকরী সমিতির সদস্য ছিলেন।

৮১-তেই নাট্যকার, নির্দেশক মলয় ঘোষ ‘ঋত্বিক নাট্যসংস্থা’র প্রতিষ্ঠা করেন। আজও তাঁরা সমানে কাজ করে চলেছে। ১৯৮৯। পথনাটক ‘হল্লাবোল’ অভিনয় করতে গিয়ে সফদর হাসমির শহিদ হওয়ার প্রতিবাদে শিলিগুড়ির একদল তরুণ গঠন করল ‘থটস এরিনা’। পরিচালক হিসেবে তাঁরা পেয়েছিল, অধ্যাপক ডঃ শ্যামাপ্রসাদ ভট্টাচার্যকে

‘কথা ও কলম’-এর দুই পল্লবিত শাখা ছিল ‘কল্লোল’ ও ‘মিলেমিশে’। ‘কল্লোল’-এর পরিচালক ছিলেন অসিত ভট্টাচার্য। ‘ মিলেমিশে ‘ পশ্চিমবঙ্গে প্রথম ভিয়েতনাম বিজয় উৎসব পালন করে, ‘বিজয়ী ভিয়েতনাম’ নামে নাটক প্রযোজনা করে। এদের প্রচুর নাটকের মধ্যে চরিত্রহীন, লেনিন, মাস্টারদা, তিতুমির, পাতার নাম জনম(চোমং লামার গল্প অবলম্বনে নাটক) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

স্বাধীনতা উত্তর  শিলিগুড়ি ভৌগোলিক কারণেই বাণিজ্যের শহর হয়ে উঠল। টি, টিম্বার ও টেবিল টেনিস নামে খ্যাত শিলিগুড়ির বাঙালী তাদের নাটকের পরিচয়ের চিহ্নটুকুও সমানভাবে লালন করেছিল। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৯ অবধি এ শহরের আনাচ কানাচে জন্ম নিয়েছিল কর্ণিক, দামামা, রঙ্গন, কোরাস থিয়েটার ইউনিট, ইঙ্গিত নাট্য সংস্থা, গননাট্যের উত্তরধ্বনি শাখা, বলাকা নাট্য সংস্থা, মহুয়া, সন্ধানী, স্ফুলিঙ্গ। ৭৯ সালে শহরের বারোটি দল সম্মিলিতভাবে গঠন করল মুক্তমঞ্চ। রোড স্টেশন ময়দানে। কাঠের চৌকি জোড়া দিয়ে,  কালো পর্দা টাঙিয়ে খোলা আকাশের নীচে নাট্য প্রযোজনা। মঞ্চের সামনে ইতস্তত টাঙানো থাকত পোস্টার-প্ল্যাকার্ড।  তাতে লেখা থাকত সমাজ সচেতনতার বার্তা। একা একা যে কিছু হয় না, ব্যক্তি কিছু নয়, সমষ্টিই সমাজের জন্য একমাত্র কিছু করতে পারে, এরকম বিশ্বাসই মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ছিল। ‘মুক্তমঞ্চর স্ফুলিঙ্গ জন্ম নিক দাবানলের’,’শিল্পের উৎস চেতনা,চেতনার বিকাশ শ্রেণীসংগ্রাম’ ইত্যাদি স্লোগান তখন মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

দামামার ‘শতাব্দীর পাড়ে’ প্রযোজনার মধ্য দিয়ে মুক্তমঞ্চর জয়যাত্রা শুরু। নাটকের আগে গাওয়া হতো গণসঙ্গীত। টিনের কৌটোয় দর্শকদের কাছ থেকে সংগৃহীত হতো অর্থ। মুক্তমঞ্চের উদ্যোগে কর্ণিকের ‘অরুণোদয়ের পথে’ এবং উত্তালের ‘শিব ঠাকুরের আপন দেশে’-এর মতো নাটক প্রযোজিত হয়েছিল। এভাবে মক্তমঞ্চের ব্যানারে একে একে হতে থাকে সন্ধানীর ‘ললাট লিখন’, ইঙ্গিতের ‘কৈলাশ বদ্ধ উন্মাদ’,কোরাসের ‘মরা’ ইত্যাদি। অপসংস্কৃতি বিরোধী আন্দোলনে সারা বাংলার সামনে দৃষ্টান্ত রাখল মুক্তমঞ্চ। ‘সম্রাট ও সুন্দরী’ নাটককে অপসংস্কৃতি বলে অভিযুক্ত করে, বয়কটের ডাক দিয়ে পাড়ায় পাড়ায় পথনাটক প্রযোজনার মধ্য দিয়ে জনমত তৈরি করতে থাকে মুক্তমঞ্চ । ‘সম্রাট ও সুন্দরী’ নাট্যানুষ্ঠানের দিন দারুণ শীতকে উপেক্ষা করে এক প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক আয়োজনে সামিল হয়েছিল হাজার হাজার দর্শক। এ উপলক্ষে অমল চক্রবর্তীর পরিচালনায়,  বিজন ভট্টাচার্যর যৌথ প্রযোজনা প্রদর্শিত হয় ‘গর্ভবতী জননী’।

১৯৯২। মিস শেফালীর নৃত্যানুষ্ঠানের প্রতিবাদে আনন্দলোক প্রেক্ষাগৃহে মুক্তমঞ্চের নাট্যকর্মীরা পিকেটিং করতে গিয়ে পুলিশের প্রহারে আহত ও রক্তাক্ত। সামাজিক সাংস্কৃতিক ইস্যুর পাশাপাশি  বাবরী মসজিদ ধ্বংসের প্রতিবাদে, বিহার প্রেস বিলের মতো বিভিন্ন ইস্যুতে মুক্তমঞ্চ সর্বদায় সোচ্চার।

১৯৮০। আকাশবাণী শিলিগুড়ি কেন্দ্রে নিতীশ বিশ্বাস এলেন। স্থাপিত হলো শিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ‘শতফুল একাডেমি’। শতফুল নাট্যবিভাগের পরিচালনায় প্রথম নাট্য কর্মশালা হয়। শিলিগুড়ির নাট্য চর্চায় আকাশবাণী শিলিগুড়ির যে বিশাল ভূমিকা ছিল এবং আছে তা অস্বীকার করবার উপায় নেই।

১৯৮১। তৈরি হয় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের লোকরঞ্জন বিভাগের শিলিগুড়ি শাখা। ৮১-তেই নাট্যকার, নির্দেশক মলয় ঘোষ ‘ঋত্বিক নাট্যসংস্থা’র প্রতিষ্ঠা করেন। আজও তাঁরা সমানে কাজ করে চলেছে। ১৯৮৯। পথনাটক ‘হল্লাবোল’ অভিনয় করতে গিয়ে সফদর হাসমির শহিদ হওয়ার প্রতিবাদে শিলিগুড়ির একদল তরুণ গঠন করল ‘থটস এরিনা’। পরিচালক হিসেবে তাঁরা পেয়েছিল, অধ্যাপক ডঃ শ্যামাপ্রসাদ ভট্টাচার্যকে। ১৯৯২ তে মঞ্জু  দাসের নেতৃত্বে ‘প্রয়াস’ দল গঠিত হয়। ৮৯-এ অমল আচার্য র ‘নন্দন কালচারাল ফোরাম’ এবং প্রভাকর চক্রবর্তী র ‘মঞ্জরী’। ১৯৯৩ সালে তরুণদের জন্য গঠিত হয় ‘সৃজনসেনা’। নেতৃত্ব দেন পার্থপ্রতিম মিত্র। দলটি আজও প্রবল উদ্যমের সাথে প্রযোজনা করে চলেছে একের পর এক দৃপ্ত নাটক। ১৯৯৩ সালে জন্ম নিয়েছিল একটি নতুন দল,’ভাবনা’। নির্দেশক কুন্তল ঘোষ ।

১৯৯৮ সালে চম্পা ভট্টাচার্য ও কুন্তল ঘোষের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে মঞ্চসফল নাটকে বলীয়ান ‘শিলিগুড়ি থিয়েটার একাডেমি’। এ দশকেই,  ‘শিশুনাট্যম’ শিশুদের নাট্যচেতনা ও মন গড়ে তোলার জন্য কাজ শুরু করে। নতুন শতাব্দীর সূচনায় সঞ্জয় চক্রবর্তীর নেতৃত্বে ‘উত্তরের হাওয়া’-র প্রতিষ্ঠা। ‘উত্তরের হাওয়া’-র সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান এ সময়ের প্রতিনিধি সাগ্নিক-এর পরিচালনায় নাট্য নির্মাণ।

শিলিগুড়ির নাট্যচর্চা এবং নাট্যমোদী মানুষের যদি ইতিহাস রচিত হয় কোনোদিন, তবে তা নিশ্চিতভাবেই হবে মহাকাব্যিক।  দুঃখের কথা, আজকের বিশ্বায়নের যুগে অতীতের উন্নত চর্চার বহমানতা নিয়ে প্রশ্ন ঘনাচ্ছে দুর্যোগের মেঘের মতো। উত্তরসুরী নেই। ভরসা করবার মতো তরুণ বলিষ্ঠ কাঁধ নেই। তবে,  আর ভবিষ্যৎ নেই শিলিগুড়ির নাটকের ?

নাটকের সঙ্গে সর্বতভাবে জুড়ে থাকা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, আমার আশঙ্কা অমূলক নয়, তাঁদের কপালেও একই চিন্তার ভাঁজ। ‘দামামার’ পার্থ চৌধুরী জানালেন, সময়ের আগ্রাসনকে অস্বীকার করবার কোনো উপায় নেই। এরই মধ্যে নিরন্তর লড়াই চলবে। ‘দামামা’ নতুন কাজ করছে, আগামীতেও করবে। তবে তিনি আশাবাদী, শিলিগুড়ি থেকে নাট্যচর্চা হারিয়ে যাবে না। অন্যরূপে হলেও সে থাকবেই।

‘উত্তাল’-এর কর্ণধার পলক চক্রবর্তী ১০০ ভাগ নাটকে জড়িয়ে থাকেন। ওঁর পাশে পাশে, পিছু পিছু হাঁটা তরুণেরাও যথেষ্ট সিরিয়াস। সময়ের সংকটকে মেনে নিয়েও পলক চক্রবর্তী তাই নতুনদের ভাবনা-চিন্তা আর একাগ্রতা নিয়ে নিরাশ নন একদম। ‘ইঙ্গিত’-এর আনন্দ ভট্টাচার্য  এই মুহূর্তে নতুন নাটক ‘মহলা’ নিয়ে ব্যস্ত। কলকাতায়ও অন্য দলেও তিনি আমন্ত্রিত অভিনেতা হিসেবে কাজ করছেন। নব্বইয়ের দশকে কর্মসূত্রে বোলপুর থেকে আসা মৌকণা মুখার্জির কণ্ঠে শিলিগুড়ির নাটকের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা হতাশার সুর। আগের মতো সে শক্তি আর তিনি পান না। পাবেনই বা কী করে?

আমার ব্যক্তি উপলব্ধিও সে কথাই বলে ! মানুষ এখন আত্মকেন্দ্রিক। রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে আদর্শগত মরচে পড়েছে কিছুটা হলেও, সেটা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। তবে পুরনো দলে নতুন কাজ অল্প হলেও হচ্ছে। সৃজনসেনা, থিয়েটার একাডেমির মতো নাট্যদলগুলো এত সহজে থেমে থাকার নয়। আজও তারা প্রযোজনার উদ্যম দিয়ে  মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। জাগিয়ে তোলে।

১৯৬৮ সাল থেকে মঞ্চে কাজ করছেন অভিনেত্রী চম্পা ভট্টাচার্য। আজও মঞ্চ ওঁকে টানে। দু-বছর আগেও তিনি সাবলীল অভিনয়ে দক্ষতা দেখিয়ে মঞ্চ কাঁপিয়েছেন। এখন তিনি তাঁর অভিনীত নাটক ও সংলাপ সম্পৃক্ত কাজ করছেন। গত শতাব্দীর নাটকের মানুষেরা কোনো না কোনো ভাবে নিজেদের নাটকের কাজে যুক্ত রাখেন। বলা ভালো রাখতে চান, ভালোবাসেন।

সবশেষে কথা হলো,  ২০১০-এ জন্ম নেওয়া ‘বনমালা’ র কর্ণধারের সঙ্গে। বিশ্বজিত রায় । শিশু, কিশোর, সদ্যতরুণদের নিয়ে কাজ করেন। এ সময়ে নব্যপ্রজন্ম নিয়ে যেকোনো সমবেত শিল্পের কাজ, খুবই শক্ত ! বিশ্বজিৎ বললেন, সময়ের ছাপ নিয়েই চলতে হবে। রিলজীবন থেকে রিয়েল জীবনে কচি মনগুলোকে প্রভাবিত করবার জন্য স্কুলে স্কুলে যান। কর্মশালার মধ্য দিয়ে ছাত্রদের থিয়েটারমুখী করে তুলবার চেষ্টা করেন। এবং তাতে করে বিশ্বজিৎ একেবারেই অসফল নন। প্রযোজনাও হয়। ঠিকই তো, পথ তো বাছতেই হবে। হাল ছেড়ে দিলে তো চলবে না। তা না হলে ভবিষ্যতের হালই বা কারা ধরবে! আর ভরত্মুনির পঞ্চম বেদ রচনার সার্থকতা এখানেই, এখানে আলো আর স্বপ্ন-আখড়ার যৌথ বসবাস ।

♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!