Advertisement
  • খাস-কলম
  • মে ১৯, ২০২৬

মাতৃভাষার উচ্চারণেই জাগ্রত প্রতিরোধ

হিলাল উদ্দিন লস্কর
মাতৃভাষার উচ্চারণেই জাগ্রত প্রতিরোধ

১৯ মের স্মৃতিতে অসমের উধারবন্দে স্থাপিত মূর্তি

আজ ১৯ মে। বরাক উপত্যকা-সহ সমগ্র অসমের বহুমাত্রিক জনগোষ্ঠীর জাতীয় জীবনে দিনটি যেমন গভীর অশ্রু-তর্পণে সিক্ত, তেমনই তা পরম শৌর্য এবং শাশ্বত গৌরবে ভাস্বর। ঠিক পঁয়ষট্টি বছর আগে, ১৯৬১ সালের এ দিন শিলচর রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এগারো অকুতোভয় তরুণ-তরুণী নিজেদের তাজা রক্তে মাতৃভাষার যে অবিনাশী জয়গান লিখে গিয়েছিলেন, তার প্রতিধ্বনি আজও আমাদের প্রতিটি হৃদস্পন্দনে অনুরণিত হয়। এ মহান আত্মবলিদান কেবল একটি অঞ্চলের বাঙালির আত্মপরিচয় রক্ষার লড়াই ছিল না; তা ছিল ভাষিক অধিকারবঞ্চিত মানুষের অস্তিত্ব ও পরিচয় সুরক্ষার এক কালজয়ী সংগ্রাম। সেদিন ক্ষমতার দম্ভকে তুচ্ছ করে নির্ভীক ভাষাসৈনিকেরা যেভাবে আপন শিকড় ও বর্ণমালাকে রক্ষার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন, তাঁদের সেই মহিমান্বিত ত্যাগ আমাদের এক চিরন্তন সত্য শিখিয়ে দিয়ে গেছে— ‘মাতৃভাষার চেয়ে প্রিয় কোনো সম্পদ নেই, আর বর্ণমালার চেয়ে পবিত্র কোনো পতাকা হয় না।’

বঙ্গদেশ ও অসমের ভৌগোলিক সান্নিধ্য, অভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামো এবং নিবিড় সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে প্রবহমান। এই সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের সূত্রে এই জনপদে বিপুল সংখ্যক বাঙালির উপস্থিতি কোনো আকস্মিক বা কৃত্রিম ঘটনা নয়; বরং এক অনিবার্য ঐতিহাসিক বাস্তবতা। দুর্ভাগ্য, ভারতের স্বাধীনতা লাভ, দেশভাগ এবং পরবর্তীকালে অসমের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এ অঞ্চলের বাঙালির জন্য আশীর্বাদের পরিবর্তে অভিশাপ হয়েই দেখা দেয়। ভৌগোলিক ও জনতাত্ত্বিক বিচারে নবগঠিত অসম একটি বহুভাষিক ও বহুজাতিক অঞ্চল। পরিসংখ্যান অনুসারে, রাজ্যের এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। অথচ এই ধ্রুব সত্যকে উপেক্ষা করে, ১৯৫১ সালের আদমশুমারিতে কৃত্রিমভাবে সংখ্যাতত্ত্বের কারচুপি এবং এক সুগভীর রাজনৈতিক অভিসন্ধির মাধ্যমে অসমকে ‘একভাষিক’ (অসমীয়াভাষী) রাজ্য হিসেবে গড়ে তোলার আধিপত্যবাদী মানসিকতা সক্রিয় হয়ে ওঠে। ‘ভাষিক রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন’-এর সুনির্দিষ্ট গণতান্ত্রিক সুরক্ষানীতি— যেখানে কোনো রাজ্যে অন্য কোনো ভাষিক গোষ্ঠী ৩০% বা তার বেশি হলে রাজ্যটিকে ‘দ্বি-ভাষিক’ ঘোষণার নিয়ম ছিল— তাকে চরমভাবে পদদলিত করা হয়। ভাষিক আধিপত্যবাদী রাজনীতির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ১৯৬০ সালের ২৪ অক্টোবর, যখন কট্টরপন্থীদের চাপে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চলিহা ‘অসম সরকারি ভাষা আইন’ পাস করে অসমীয়াকে রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। তখনই ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাঙালির ওপর নেমে আসে ‘বঙ্গাল খেদা’ আন্দোলনের সুপরিকল্পিত হিংস্রতা ও উচ্ছেদ অভিযান।


সেদিন ক্ষমতার দম্ভকে তুচ্ছ করে নির্ভীক ভাষাসৈনিকেরা যেভাবে আপন শিকড় ও বর্ণমালাকে রক্ষার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন, তাঁদের সেই মহিমান্বিত ত্যাগ আমাদের এক চিরন্তন সত্য শিখিয়ে দিয়ে গেছে— মাতৃভাষার চেয়ে প্রিয় কোনো সম্পদ নেই, আর বর্ণমালার চেয়ে পবিত্র কোনো পতাকা হয় না


এ অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বরাক উপত্যকা-সহ সমগ্র অসমে যে স্বতঃস্ফূর্ত ও তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, ১৯৬১ সালের ১৯ মে-র মহান আত্মবলিদান তারই এক ঐতিহাসিক ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এ লড়াই কেবল বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং বিভিন্ন অ-বাঙালি ভাষিক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ওই আন্দোলনকে অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের রূপ দিয়েছিল। সেদিন কোনো উস্কানি ছাড়াই শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে অবস্থানরত শান্তিকামী, নিরস্ত্র সত্যাগ্রহীদের ওপর পুলিশের অতর্কিত ও নৃশংস গুলিবর্ষণে একে একে লুটিয়ে পড়েন ১১ জন বীর সন্তান। শহিদদের সে তালিকায় উজ্জ্বল হয়ে আছেন কমলা ভট্টাচার্য, যিনি বিশ্বের প্রথম মহিলা ভাষা শহিদ হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। তাঁর সঙ্গে আত্মদান করেছিলেন— হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, তরণী দেবনাথ, কুমুদরঞ্জন দাস, শশীকান্ত দাস, সুনীল সরকার, সুকোমল পুরকায়স্থ এবং বীরেন্দ্র সূত্রধর।

গণ-আন্দোলনের প্রচণ্ডতায় তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর ভিত্ টলে যায়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে কেন্দ্রীয় সরকার মধ্যস্থতায় অবতীর্ণ হয় এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর উদ্যোগে ‘শাস্ত্রী ফর্মুলা’ প্রণীত হয়। ওই ফর্মুলার ওপর ভিত্তি করে ১৯৬১ সালের ভাষা আইনের ৫ নম্বর ধারা সংশোধন করে বাংলা ভাষাকে বরাক উপত্যকার জন্য ‘সহযোগী সরকারি ভাষা’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে সরকার বাধ্য হয় ।

তৎকালীন রাজ্য সরকারের একমুখী ভাষিক আধিপত্যবাদী মনোভাবের প্রতিক্রিয়া কেবল বরাকের বাঙালিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এর তীব্র অভিঘাতে তৎকালীন ‘বৃহত্তর অসম’-এর বিভিন্ন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যেও গভীর বিক্ষোভ সঞ্চারিত হয়। নিজেদের ভাষিক ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা রক্ষার তাগিদে তাঁরাও স্বাধিকার আন্দোলনে সোচ্চার হয়ে ওঠেন, পরিণামে অসমের মানচিত্র খণ্ডিত হয়ে ১৯৬৩ সালে নাগাল্যান্ড, ১৯৭২ সালে মেঘালয় এবং ১৯৮৭ সালে মিজোরাম ও অরুণাচল প্রদেশ পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অসমের এসব ভৌগোলিক ব্যবচ্ছেদ আসলে একদেশদর্শী ও বর্জনমুখী রাজনীতিরই করুণ ও অনিবার্য পরিণতি।


পরভাষায় মানুষ বড়জোর ‘অতিথি’ হতে পারে, ‘মালিক’ হতে পারে না। যখন কোনো প্রজন্ম মাতৃভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তারা আসলে তাদের অস্তিত্বের ‘আদি ঘর’টিই হারিয়ে ফেলে।


১৯৬১ সালের রেশ কাটতে না কাটতেই ১৯৭২ সালে পুনরায় ভাষিক আধিপত্যের আঘাত নেমে আসে। গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘোষণা করে যে, উচ্চশিক্ষার একমাত্র মাধ্যম হবে অসমিয়া। ফলে বরাক উপত্যকার বাংলা মাধ্যম থেকে আসা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথ রুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। প্রতিবাদে ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীদের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘কাছাড় জেলা গণসংগ্রাম পরিষদ’। দ্বিতীয় দফার ভাষা আন্দোলনে উগ্র জাতীয়তাবাদীদের দাঙ্গায় বহু বাঙালি ভিটেমাটি হারান এবং ১৯৭২ সালের ৫ অক্টোবর পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান বিজন চক্রবর্তী। এছাড়াও তেজপুরে শহিদ হন রাজেন দাস ও তপন পুরকায়স্থ। ওই তীব্র আন্দোলনের মুখে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শরৎচন্দ্র সিংহ মধ্যস্থতা করতে বাধ্য হন এবং বরাকের জন্য উচ্চশিক্ষায় বাংলার অধিকার ও পরবর্তীকালে ১৯৯৪ সালে ‘আসাম বিশ্ববিদ্যালয়, শিলচর’ প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হয়। একইভাবে নিজেদের ভাষিক অস্তিত্ব রক্ষায় ১৯৮৬ সালের ২১ জুলাইয়েও বরাকের মানুষকে রাজপথে রক্ত দিতে হয়েছিল।

মাতৃভাষা কেবল ভাব বিনিময়ের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের অস্তিত্ব, চিন্তা এবং সংস্কৃতির আদি ভিত্তিভূমি। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান ও দর্শনের বর্তিকা দিয়ে বিশ্লেষণ করলে শহিদদের আত্মত্যাগের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে: জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার মনে করতেন, ভাষা হলো, সেই জগত যেখানে মানুষের প্রকৃত বসবাস— ‘Language is the house of being. In its home man dwells.’ যখন কোনো প্রজন্ম মাতৃভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তারা আসলে তাদের অস্তিত্বের ‘আদি ঘর’টি হারিয়ে ফেলে। পরভাষায় মানুষ বড়জোর ‘অতিথি’ হতে পারে, ‘মালিক’ হতে পারে না । ভাষাবিজ্ঞানী সাপির-হুইর্ফ এবং দার্শনিক লুডভিগ ভিটগেনস্টাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী, ভাষাই মানুষের চিন্তার ধরন ও বিশ্ববীক্ষা নির্ধারণ করে। ভিটগেনস্টাইন বলেছিলেন, ‘The limits of my language mean the limits of my world.’ অর্থাৎ, আমার ভাষার সীমানাই আমার জগতের সীমানা। ১৯ মে-র শহিদেরা রক্ত দিয়ে আসলে আমাদের ‘জগতের সীমানা’ রক্ষা করে দিয়ে গেছেন। ফ্রান্ত্‌জ ফ্যানো ঔপনিবেশিকতার প্রেক্ষিতে সতর্ক করে বলেছিলেন—নিজের মাতৃভাষা ছেড়ে শাসকের ভাষা গ্রহণ করা এক প্রকার ‘সাংস্কৃতিক দাসত্ব’ বা ‘Cultural Alienation’। নোয়াম চমস্কির মতে, ভাষা মানুষের এক সহজাত জৈবিক ক্ষমতা। সমাজতাত্ত্বিক লুই দুমঁ ও ভিটগেনস্টাইনের ‘প্রাইভেট ল্যাঙ্গুয়েজ’ ধারণার খণ্ডন অনুযায়ী, ভাষা সর্বদাই সামাজিক ও সামষ্টিক। তাই ১৯ মে-র শহিদদের রক্তে ভেজা শব্দগুলো কেবল কিছু বর্ণমালা ছিল না,  তা ছিল আমাদের আত্মপরিচয় রক্ষার সক্রিয় সামাজিক অঙ্গীকার। বিংশ শতাব্দীর দর্শনের এই মোড় পরিবর্তন বা ‘Linguistic Turn’ প্রমাণ করে যে, জগতকে দেখতে হয় ‘ভাষার চশমা’ দিয়ে। ভাষা আক্রান্ত হলে মানুষের মৌলিক ভিত্তিটাই সংকটের মুখে পড়ে।

নিজের ভাষিক সত্তা বিসর্জন দেওয়া বা আঁকড়ে ধরার সামাজিক পরিণাম কতখানি সুদূরপ্রসারী, তা দুটি ভিন্ন ঐতিহাসিক উদাহরণ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়। প্রথম উদাহরণটি হলো, নিম্ন অসমের বিশাল জনসমষ্টি, যাঁদের আজ অবজ্ঞাভরে ‘মিয়াঁ’ বলে সম্বোধন করা হয়। দেশভাগের আগে অসমে আগত বাংলাভাষীর স্বাধীনতার আগে, পরেও উগ্র ভাষিক জাতীয়তাবাদের মুখে নিছক নিরাপত্তার আশায় নথিপত্র বা আদমশুমারিতে নিজেদের ‘ন-অসমীয়া’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে মাতৃভাষায় পঠন-পাঠন ছেড়ে দেন। কিন্তু এই ভাষা বিসর্জন দিয়েও তাঁরা কাঙ্ক্ষিত সামাজিক স্বীকৃতি পাননি; বরং আজ তাঁরা চরম অনিশ্চিত নাগরিকত্ব সংকটের বাসিন্দা। মাতৃভাষা থেকে চ্যুত হওয়ার দরুন তাঁদের মৌলিক সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং তাঁরা আজও অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগতভাবে চরম পশ্চাৎপদ।

বিপরীতমুখী উজ্জ্বল উদাহরণটি হচ্ছে ইরান। সপ্তম শতাব্দীতে আরবরা পারস্য জয় করার পর ইরানিরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও, তারা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে তাদের নিজস্ব ‘ফারসি’ ভাষা রক্ষা করেছিল, আরবিকে গ্রহণ করেনি। ভাষা ত্যাগ করেনি বলেই ইরানে ইবনে সিনা, ওমর খৈয়াম, হাফিজ ও রুমির মতো বিশ্ববিশ্রুত প্রতিভার জন্ম হয়। ইরানি বৈদগ্ধ প্রমাণ করেছে যে, ধর্ম এবং ভাষা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সত্তা। দুর্ভাগ্য, আজও অনেক বাঙালি মুসলিম ধর্মচর্চার দোহাই দিয়ে মাতৃভাষা বাংলার পরিবর্তে উর্দু বা আরবিকে আভিজাত্যের প্রতীক মনে করে এক প্রকার সাংস্কৃতিক বন্ধ্যাত্বের শিকার হচ্ছেন। এসব উদাহরণ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে—ধর্মবিশ্বাস বদলালেও ভাষিক পরিচয় বদলানো আত্মহননের শামিল।

অসমকে মূলত একটি ‘শুদ্ধ একভাষিক’ রাজ্য হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে একদেশদর্শী আধিপত্যবাদী মানসিকতা দীর্ঘকাল ধরে সক্রিয়। বিশ্বায়ন বা প্রযুক্তির চেয়েও ভয়ংকর হচ্ছে উগ্র  জাতীয়তাবাদ ও ক্ষমতাবান একমুখী প্রভাব, যা কৃত্রিম ‘সমরূপতা’ চাপিয়ে দিতে সদা সচেষ্ট। ‘এক রাষ্ট্র, এক ভাষা’র আধিপত্যবাদী দর্শনের বিপরীতে ১৯ মে আমাদের ভিন্ন কথা শেখায়; বৈচিত্র্যের মধ্যেই মানুষের প্রকৃত ঐক্য নিহিত। তারই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখেছি ১৯৭৯-১৯৮৫ সালের ‘আসাম আন্দোলন’ এবং বর্তমান সময়ের ‘ডি-ভোটার’ ও ‘এনআরসি’-র মতো অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। এই বর্জনমুখী রাজনীতির নির্মম পরিণতি হিসেবে এ রাজ্যের বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর একাংশের মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম মনস্তাত্ত্বিক অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘস্থায়ী নাগরিকত্ব সংকট।

বীর শহিদদের স্মরণ করতে গিয়ে আমাদের নতুন করে শপথ গ্রহণ করা দরকার, সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে পূর্বসূরিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত অধিকারকে আমরা যেকোনো মূল্যে রক্ষা করব। আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে আধুনিক করুক, কিন্তু তা যেন আমাদের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন না করে। শহিদদের আত্মত্যাগ আমাদের ভাষিক পরিচয়ের যে রক্ষাকবচ পরিয়ে দিয়ে গেছে, তা রক্ষা করে আগামী প্রজন্মের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ও স্বনির্ভর ভাষিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাটাই হয়ে উঠুক উত্তরসূরি হিসেবে আমাদের জীবনের পরম ও পবিত্র ব্রত।

♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦

লেখক : হাইলাকান্দির এস এস কলেজ-এর দর্শনের অধ্যাপক

প্রবন্ধের বিষয়, মতামত লেখক-এর নিজস্ব।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!