Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • জুলাই ২৬, ২০২৬

বলাগড় বন্দর: সাসটেইনেবল মডেলের সন্ধান

অয়ন মুখোপাধ্যায়
বলাগড় বন্দর: সাসটেইনেবল মডেলের সন্ধান

শেষ পর্ব

গত সাতটি পর্বে বলাগড় ইনল্যান্ড ওয়াটার টার্মিনাল প্রকল্পের নাড়ি, তার সম্ভাবনা ও সংকটের অন্দরমহল এর গল্পকে অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে কাটাছেঁড়া করেছি। এর কৌশলগত অবস্থান, অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক উজ্জ্বল সম্ভাবনা যেমন আমাদের সামনে এসেছে, ঠিক তেমনই পরিবেশগত বিপর্যয়, নদী ভাঙন, জমি জট এবং মৎস্যজীবী ও কৃষকদের জীবিকাচ্যুতির বাস্তব অন্ধকার দিকগুলোও উন্মোচিত হয়েছে।

এই শেষ পর্বে আমার লক্ষ্য কোনো একপেশে রায় দেওয়া বা রায় চাপিয়ে দেওয়া নয়, বরং সমস্ত যুক্তি-তর্কের ওপর দাঁড়িয়ে এমন একটি টেকসই উন্নয়ন বা সাসটেইনেবল মডেলের সন্ধান করা, যেখানে রাজ্যের শিল্প ও বাণিজ্যও বাঁচবে, আবার বলাগড়ের প্রকৃতি, নদী ও সাধারণ মানুষও রক্ষা পাবে।

বলাগড় বন্দরকে ঘিরে সাধারণ মানুষজন মূলত দুটি বিপরীত মেরুতে বিভক্ত হতে দেখা গেছে। একদল পরিবেশবাদী বা আন্দোলনকারী মানুষজন বলছেন, পরিবেশ ও কৃষির সামান্য ক্ষতি করে কোনো শিল্প বা বন্দর আমাদের চাই না। অন্যদল প্রগতিবাদী বা শিল্পের পক্ষে মানুষজন, তাঁরা বলছে, উন্নয়নের স্বার্থে একটু-আধটু ক্ষতি মেনে নিতেই হবে, নতুবা রাজ্যে নতুন কর্মসংস্থান হবে কী করে ? রাজ্য এগোবে কীভাবে ? আধুনিক অর্থনীতি ও পরিবেশ বিজ্ঞান কিন্তু এই দুটি চরমপন্থী বা একগুঁয়ে মতামতের কোনোটিকেই নিরঙ্কুশ ভাবে সমর্থন করে না। ইতিহাস সাক্ষী, জোর করে মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া প্রকল্প যেমন শেষ পর্যন্ত গণআন্দোলনের মুখে ভেস্তে গেছে, তেমনই স্রেফ আশঙ্কার বসবর্তী হয়ে সব আধুনিক পরিকাঠামো গুলোকে আটকে রাখলে সমাজে অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও চরম বেকারত্বের অন্ধকারে নেমে আসে। সমাধান লুকিয়ে রয়েছে মাঝামাঝি এক বাস্তবসম্মত ও বৈজ্ঞানিক সূত্রে।


উন্নয়ন কোনো যান্ত্রিক দানব নয় যা স্থানীয় মানুষকে পিষে দিয়ে চলে যাবে, আবার উন্নয়ন কোনো অলীক স্বপ্নও নয় যা কেবল খাতার পাতায় বা নির্বাচনী ইশতেহারে থাকবে। বলাগড় বন্দর তখনই সার্থক হবে, যখন হুগলি নদীর বুক চিরে ভেসে যাওয়া জাহাজের সাইরেন স্থানীয় খেতমজুর বা মৎস্যজীবীর কানে আতঙ্কের বার্তা আনবে না, বরং তাঁর সন্তানের নিশ্চিত ভবিষ্যতের আশার আলো হয়ে বাজবে


প্রথমেই মনে রাখতে হবে বলাগড় টার্মিনালকে একটি সফল ও পরিবেশ-বান্ধব প্রকল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হলে নীতি-নির্ধারকদের প্রধানত তিনটি স্তম্ভের ওপর কাজ করতে হবে। প্রথমত, গ্রীন পোর্ট বা পরিবেশ-বান্ধব প্রযুক্তির কঠোর ও আইনী প্রয়োগ। বন্দরে কয়লা বা ফ্লাই অ্যাশের মতো উড়ন্ত পণ্য খালাসের সময় সম্পূর্ণ ঢাকা স্বয়ংক্রিয় কন্টেইনার বা ক্লোজড কনভেয়র বেল্ট ব্যবহার করতে হবে, যাতে বাতাসে বা সবুজ দ্বীপের রেণুতে দূষণ না ছড়ায়। জাহাজের গতিসীমা নদীর এ অংশে নির্দিষ্ট করতে হবে এবং লো-নয়েজ প্রপেলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে গাঙ্গেয় শুশুকদের শব্দ-তরঙ্গে আঘাত না লাগে। দ্বিতীয়ত, নদী বিজ্ঞান মেনে পাড় সুরক্ষা। স্রেফ বোল্ডার বা জিও-ব্যাগ ফেলে নদী ভাঙন রোখার চেনা ছক থেকে বেরিয়ে এসে বৈজ্ঞানিক উপায়ে নদীপাড়ের মাটিকে বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং দিয়ে স্থায়ীভাবে বাঁধতে হবে এবং এর সম্পূর্ণ খরচ প্রকল্পের মূল বাজেটের অংশ হওয়া উচিত। তৃতীয়ত, অংশীদারিত্বমূলক পুনর্বাসন বা ইনক্লুসিভ গ্রোথ। জমিহারা বা নদী থেকে উচ্ছেদ হওয়া মৎস্যজীবীদের কেবল কিছু টাকা দিয়ে বিদায় করলে চলবে না, বন্দরকে কেন্দ্র করে যে বিশাল লজিস্টিকস ইকোসিস্টেম তৈরি হবে, সেখানে স্থানীয় যুবকদের নিখরচায় কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়োগ করতে হবে।

সুতরাং একথা বলা যেতেই পারে বলাগড়ের বন্দর প্রকল্প আসলে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের জন্য একটি মস্ত বড়ো সুযোগ, একই সঙ্গে কঠিন পরীক্ষা। আমাদের কাছে প্রমাণ করার সুযোগ এসেছে যে,  পশ্চিমবঙ্গ অতীতের জমি আন্দোলনের তিক্ততা ও জড়তা কাটিয়ে পরিবেশ ও মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করেও ব্যাপকভাবে আধুনিক পরিকাঠামো গড়তে পারে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের যৌথ উদ্যোগে যৌথ বিশেষজ্ঞ নজরদারি কমিটি গঠন করে বলাগড়ে বন্দর নির্মাণ করতেই হবে।

উন্নয়ন কোনো যান্ত্রিক দানব নয় যা স্থানীয় মানুষকে পিষে দিয়ে চলে যাবে, আবার উন্নয়ন কোনো অলীক স্বপ্নও নয় যা কেবল খাতার পাতায় বা নির্বাচনী ইশতেহারে থাকবে। বলাগড় বন্দর তখনই সার্থক হবে, যখন হুগলি নদীর বুক চিরে ভেসে যাওয়া জাহাজের সাইরেন স্থানীয় খেতমজুর বা মৎস্যজীবীর কানে আতঙ্কের বার্তা আনবে না, বরং তাঁর সন্তানের নিশ্চিত ভবিষ্যতের আশার আলো হয়ে বাজবে। আর এ স্বপ্নের বাস্তব রূপায়ণ তখনই সম্ভব, যখন বন্দরের বিশাল গেটের বাইরে সারিবদ্ধভাবে গড়ে উঠবে এলাকার লোকেদের নিজস্ব আধুনিক হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকানপাট আর স্বনির্ভর কর্মসংস্থানের এক প্রাণবন্ত গ্রামীণ গঞ্জ। প্রকৃতির বুকে বড়ো শিল্পের সাথে স্থানীয় মানুষের ছোটো ছোটো স্বাধীন ব্যবসার সহাবস্থানই হবে বলাগড়ের আসল রূপান্তর ও প্রকৃত টেকসই উন্নয়ন।

♦•♦ – ♦•♦ ♦•♦ – ♦•♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!