- এই মুহূর্তে দে । শ
- আগস্ট ২৪, ২০২৬
যাদবপুরে ভাঙচুরের ঘটনায় নতুন মোড়! ইস্তফা তদন্ত কমিটির প্রধানের, নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ করবে বিশ্ববিদ্যালয়
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক অশান্তি ও ক্যাম্পাসে ভাঙচুরের অভিযোগের তদন্তে নতুন মোড়। হঠাৎই পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন অধ্যাপক শুভশঙ্কর সরকার। তদন্তের কাজ কার্যকর ভাবে পরিচালনা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না— এই কারণ দেখিয়েই তিনি দায়িত্ব নিতে অপারগতার কথা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। তাঁর জায়গায় শীঘ্রই নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হবে বলে সোমবার বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সেলিম বক্স মণ্ডল জানান, শুভশঙ্কর সরকার তাঁকে জানিয়েছেন যে বর্তমান পরিস্থিতিতে কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তদন্তের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য শুভশঙ্কর সরকার শনিবার ই-মেলের মাধ্যমে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্যকে তাঁর সিদ্ধান্তের কথা জানান। সোমবার তিনি বলেন, নিয়োগের খবর পাওয়ার পরেই তিনি উপাচার্যকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি দিল্লিতে রয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, এ ধরনের তদন্তে ঘটনার সময় ক্যাম্পাসে উপস্থিত থাকা ছাত্র, শিক্ষক এবং অন্যান্য ব্যক্তির সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা প্রয়োজন। সে কাজ দূর থেকে করা কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তরফে তাঁকে অনলাইনে তদন্তের কাজ পরিচালনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান শুভশঙ্কর। তবে তাঁর মতে, শুধুমাত্র ভার্চুয়াল মাধ্যমে এ ধরনের ঘটনার তদন্ত করলে তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যেতে পারে। সে কারণেই তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে শুভশঙ্করের পদত্যাগের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টা আগে আরএসএস-ঘনিষ্ঠ শিক্ষক সংগঠন অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে চিঠি দিয়ে তাঁর নিয়োগের বিরোধিতা করে। সংগঠনের দাবি, তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে শুভশঙ্করকে বেছে নেওয়া হলে তদন্তের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাঁরা তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে কলকাতা হাই কোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টের কোনো অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে রাখার দাবি জানিয়েছেন। এর নেপথ্যে শুভশঙ্করের পূর্ববর্তী দায়িত্বের প্রসঙ্গও তুলেছে ওই সংগঠন। পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান পদে থাকাকালীন ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। নিয়োগে অনিয়ম সংক্রান্ত মামলায় কলকাতা হাই কোর্টের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের কথাও সামনে আনা হয়েছে। যদিও শুভশঙ্করের পদত্যাগের কারণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়কে দেওয়া তাঁর বক্তব্যে এ বিরোধিতার কোনো উল্লেখ নেই।
গত ২০ আগস্ট মধ্যরাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এবিভিপি এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ায়। ঘটনার সূত্রপাত ফ্যাকাল্টি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন-এর একটি বৈঠককে ঘিরে। পরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। ক্যাম্পাসে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও মারধরের অভিযোগ ওঠে। ঘটনায় কয়েক জন পড়ুয়া আহত হন বলেও খবর। ঘটনার পর থেকেই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে সরব দুই পক্ষ। এবিভিপির অভিযোগ, ‘ফেটসু’-র বৈঠককে কেন্দ্র করে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি তাদের সদস্যদের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়। এসএফআই এবং ডিএসও-ডিএসএফ-সহ বামপন্থী সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ভাবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার অভিযোগও করেছে তারা।
অন্যদিকে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির পাল্টা দাবি, এবিভিপিই বাইরে থেকে লোকজন এনে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় পতাকা সরানো, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের অভিযোগও তারা তুলেছে। দুই পক্ষের অভিযোগই অবশ্য তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়ার কথা। ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ছাত্র রাজনীতির সংঘাত— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য জানিয়েছিলেন, ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশে বিধিনিষেধের কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
এরপর, ২১ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের কথা ঘোষণা করে। উদ্দেশ্য ছিল সংঘর্ষের সূত্রপাত, ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের উপস্থিতি এবং ভাঙচুরের অভিযোগ— সব দিক খতিয়ে দেখা। কিন্তু কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে শুভশঙ্কর সরকারের নিয়োগের পরেই আপত্তি ওঠে। আরএসএস-ঘনিষ্ঠ শিক্ষক সংগঠনের পাশাপাশি এবিভিপির একাংশও তাঁর নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সংগঠনের যাদবপুর ইউনিটের সভাপতি ভাস্কর সরদার শুভশঙ্করের পদত্যাগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, যাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তাঁর নেতৃত্বে নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত তাঁরা মেনে নেবেন না।
এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে এখন প্রধান প্রশ্ন, নতুন চেয়ারম্যান কে হবেন এবং কত দ্রুত তদন্ত শুরু করা যাবে। কারণ সংঘর্ষের পর ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন ওঠায় নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রেও বিশ্ববিদ্যালয়কে সতর্ক পদক্ষেপ করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
❤ Support Us








