- এই মুহূর্তে দে । শ
- নভেম্বর ২, ২০২৬
জল-জঙ্গল-জমির অধিকার, খনি ও উচ্ছেদের বিরুদ্ধে পুরুলিয়ায় জনজাতি মহাসমাবেশ, দেড় লক্ষাধিক জমায়েতের দাবি
জল, জঙ্গল, জমি। জনজাতি জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি জড়িয়ে থাকা অস্তিত্বের প্রশ্ন। সে অধিকার রক্ষার দাবিতেই সোমবার পুরুলিয়ার মানবাজারে জমায়েত হলেন হাজার হাজার জনজাতি মানুষ। আয়োজকদের দাবি, পাথরকাটা ফুটবল মাঠে আয়োজিত মহাসমাবেশে দেড় লক্ষাধিক জনসমাগম হয়েছে। পুরুলিয়া ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা ও বিহার থেকে মূলনিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ এ সমাবেশে যোগ দিয়েছেন বলে দাবি উদ্যোক্তাদের। ‘ভারত জাকাত মাঝি পরগণা মহল’-সহ প্রায় ২০টি সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত এ সমাবেশে উঠে এসেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংবিধানিক প্রশ্ন। খনি ও শিল্পের নামে জমি অধিগ্রহণ, বনাঞ্চলের উপর অধিকার, জীবিকার নিরাপত্তা, মাতৃভাষায় শিক্ষা, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের স্বীকৃতি থেকে শুরু করে তফসিলি জনজাতির তালিকায় নতুন জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি — সব মিলিয়ে আদিবাসী অধিকার রক্ষার প্রশ্নে একজোট হওয়ার বার্তা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
সমাবেশের প্রস্তুতি ঘিরে গত কয়েক দিন ধরেই পুরুলিয়ায় তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। ২৯ অক্টোবর পুরুলিয়া শহরে সাংবাদিক বৈঠক করে সমাবেশের কথা জানিয়েছিলেন আয়োজকেরা। ‘ভারত জাকাত মাঝি পরগণা মহলে’র জেলা নেতৃত্বের তরফে রতনলাল হাঁসদা-সহ অন্য প্রতিনিধিরা জানিয়েছিলেন, প্রায় ২০টি সংগঠনের সহযোগিতায় সমাবেশের আয়োজন করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি ছিল, লক্ষাধিক মানুষের জমায়েত হবে। সমাবেশের আগের দিন মানবাজারে করম পুজো ও ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের আয়োজনও করা হয়। স্থানীয় স্তরে প্রচার, সংগঠনগুলির মধ্যে যোগাযোগ ও বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
তবে এ সমাবেশের তাৎপর্য শুধু মানুষের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং যে সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে খনিজ সম্পদ উত্তোলন, শিল্পায়ন আর পরিকাঠামো নির্মাণের নামে বনভূমি ও মূলনিবাসী বসতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সে সময়ে মানবাজারের জমায়েতের রাজনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ও স্থানীয় মানুষের অধিকার— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কোথায়, সে প্রশ্নই সামনে আনতে চাইছেন আন্দোলনকারীরা। পুরুলিয়ায় খনিজ সম্পদ এবং শিল্পায়নকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক এলাকায় অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। রঘুনাথপুরের বেড়ো অঞ্চলের চণ্ডী পাহাড় তার অন্যতম উদাহরণ। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, গ্রানাইট উত্তোলন এবং পাথর ভাঙার কাজের ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক চরিত্র বদলে যাচ্ছে। একের পর এক টিলা কেটে ফেলার ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। পাহাড়ের জমির শ্রেণি, বনাঞ্চলের নথি এবং পাথর উত্তোলনের অনুমতি প্রকাশ্যে আনার দাবিতে আন্দোলন হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরেও চণ্ডী পাহাড় বাঁচানোর দাবিতে মিছিল করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অক্টোবরে ফের আন্দোলন জোরদার হয়। তাঁদের অভিযোগ, গ্রানাইট হাব তৈরির পরিকল্পনার পরিবর্তে এলাকায় একাধিক পাথর ভাঙার যন্ত্র বসেছে।
শুধু পাহাড় কাটা নয়, নতুন শিল্পপ্রকল্প নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে স্থানীয় মানুষের। গত ২৮ অক্টোবর রঘুনাথপুরে ‘শাকম্ভরী ইস্পাত অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডে’র প্রস্তাবিত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ইস্পাত ও বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিবেশগত জনশুনানিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ায়। স্থানীয় কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, জনশুনানিতে অংশ নিতে গিয়ে তাঁরা প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়েন। পুলিশি ব্যারিকেড, বন্ধ দরজার কারণে বহু মানুষ শুনানিস্থলে ঢুকতে পারেননি বলে অভিযোগ ওঠে। প্রকল্পের সম্ভাব্য দূষণ, কৃষিজমির ক্ষতি, জলসংকট এবং স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। প্রতিবাদী সংগঠনগুলির আরও অভিযোগ, প্রস্তাবিত প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব সংক্রান্ত নথি স্থানীয় মানুষের কাছে যথাযথ ভাবে পৌঁছে দেওয়া হয়নি। বিশেষত সাঁওতালি ভাষাভাষী এলাকার মানুষের জন্য অলচিকি লিপিতে প্রয়োজনীয় তথ্যের ব্যবস্থা ছিল না। যদিও এ সমস্ত অভিযোগের স্বাধীন যাচাই স্পষ্ট নয়, তব্বে ঘটনাটি শিল্পায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ও সম্মতির প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।
এ পরিস্থিতিতে মানবাজারের সমাবেশ থেকে শিল্প ও খনি প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশগত সুরক্ষা, জমির অধিকার এবং পুনর্বাসনের বিধি মেনে চলার দাবি উঠেছে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, উন্নয়নের বিরোধিতা তাঁদের উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু যে উন্নয়নের ফলে পূর্বপুরুষের জমি, বসতভিটে, চাষের জমি, বনজ সম্পদ, জীবিকার অবলম্বন হারাতে হবে, সে উন্নয়নের সিদ্ধান্তে স্থানীয় মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করা যায় না। শুধু বিনিয়োগের পরিমাণ কিংবা সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের হিসাব দিয়ে কোনও প্রকল্পের সামাজিক ও পরিবেশগত মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
চলমান আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি ‘বনাধিকার আইন, ২০০৬’ কার্যকর করা। দীর্ঘদিন ধরে বনাঞ্চলে বসবাসকারী মূলনিবাসী এবং অন্যান্য ঐতিহ্যগত বনবাসীদের জমি ও বনসম্পদের উপর ব্যক্তিগত এবং গোষ্ঠীগত অধিকার স্বীকার করার উদ্দেশ্যে এ আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। আইনে শুধু বসবাসের জমির অধিকার নয়, বনজ সম্পদ সংগ্রহ, ব্যবহার এবং সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার স্বীকার করা হয়েছে। গোষ্ঠীগত বনসম্পদের উপর অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বনসম্পদ সংরক্ষণে গ্রামসভার ভূমিকার কথাও বলা হয়েছে।
কিন্তু আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কেন্দ্রীয় জনজাতি বিষয়ক মন্ত্রকের ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে বনাধিকার আইনে মোট ১ লক্ষ ৪২ হাজার ৮১টি আবেদন জমা পড়েছিল। তার মধ্যে মাত্র ৪৫ হাজার ১৩০টি আবেদনের ভিত্তিতে অধিকারপত্র দেওয়া হয়েছে। খারিজ হয়েছে ৯৬ হাজার ৫৮৭টি আবেদন। অর্থাৎ, রাজ্যে জমা পড়া মোট আবেদনের প্রায় ৬৮ শতাংশই প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। বর্তমানে বিবেচনাধীন রয়েছে ৩৬৪টি আবেদন। ১২ আগস্ট রাজ্যসভায় কেন্দ্রীয় জনজাতি বিষয়ক মন্ত্রকের দেওয়া তথ্যেই এই পরিসংখ্যান উঠে এসেছে।
পুরুলিয়ার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পাঠানো ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বনাধিকার আইনে মোট ৩৯ হাজার ৭৬৬টি আবেদন জমা পড়েছিল। তার মধ্যে মাত্র ৮ হাজার ৬০টি আবেদনের ভিত্তিতে অধিকারপত্র দেওয়া হয়েছিল। খারিজ হয়েছিল ৩১ হাজার ৭০১টি আবেদন। অর্থাৎ, প্রায় ৮০ শতাংশ আবেদনই প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। ওই সময় মাত্র পাঁচটি আবেদন বিবেচনাধীন ছিল। এই পরিসংখ্যানের পর থেকে জেলায় নতুন করে কত আবেদন জমা পড়েছে, কতগুলি মঞ্জুর হয়েছে কিংবা কতগুলি পুনর্বিবেচনার আওতায় এসেছে, তার হালনাগাদ জেলা-ভিত্তিক হিসাব কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের কাছে নেই। মন্ত্রক জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রকাশিত রাজ্যভিত্তিক তথ্যের পাশাপাশি জেলা ও জনগোষ্ঠীভিত্তিক পৃথক পরিসংখ্যান তাদের কাছে সংরক্ষিত নেই।
আবেদন খারিজের ক্ষেত্রে জমির দখলের সময়সীমা সংক্রান্ত সমস্যা, প্রয়োজনীয় নথির অভাব, একই জমিতে একাধিক আবেদন কিংবা জমিটি বনভূমির অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার মতো কারণের কথা বিভিন্ন রাজ্যের তরফে জানানো হয়েছে। কিন্তু কোনো আবেদন খারিজ হলেই সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলির অধিকার সংক্রান্ত দাবি শেষ হয়ে যায় না। আইন অনুযায়ী, আবেদন খারিজের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় আপিল ও পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। ফলে বিপুল সংখ্যক আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরে সংশ্লিষ্ট মানুষ সেই সুযোগ কতটা পাচ্ছেন, প্রত্যাখ্যানের কারণ তাঁদের কাছে কতটা স্পষ্ট করা হচ্ছে এবং প্রশাসনিক স্তরে তাঁদের অভিযোগের নিষ্পত্তি কী ভাবে হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, বনাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষকে কেবল বন দখলকারী হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। বন ও পাহাড়ের সঙ্গে তাঁদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং জীবনযাপনের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে। বন সংরক্ষণের নামে স্থানীয় মানুষকে উচ্ছেদ না করে তাঁদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে বনসম্পদ রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ, জনজাতি সমাজের কাছে বন কেবল কাঠ, খনিজ কিংবা বাণিজ্যিক সম্পদের উৎস নয়। খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি, জীবিকা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মানবাজারের সমাবেশে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে পঞ্চম তফসিল এবং পেসা আইন কার্যকরের প্রশ্নও। ১৯৯৬ সালে প্রণীত পঞ্চায়েত (তফসিলি এলাকায় সম্প্রসারণ) আইন বা পেসা মূলত সংবিধানের পঞ্চম তফসিলভুক্ত আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় গ্রামসভার ক্ষমতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তৈরি হয়েছিল। এ আইনের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রথাগত শাসনব্যবস্থা, প্রাকৃতিক সম্পদের উপর অধিকার এবং উন্নয়ন প্রকল্প সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে গ্রামসভার ভূমিকা শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে। বিশেষত জমি অধিগ্রহণ, খনিজ সম্পদ এবং স্থানীয় উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে গ্রামসভার মতামত ও ভূমিকার গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রশ্নটি জটিল। কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অন্ধ্রপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, গুজরাত, হিমাচল প্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা, রাজস্থান এবং তেলঙ্গানা — এই ১০টি রাজ্যে পঞ্চম তফসিলভুক্ত এলাকা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সে তালিকায় নেই। ফলে রাজ্যের জনজাতি অধ্যুষিত এলাকাগুলিকে পঞ্চম তফসিলের আওতায় আনা এবং তার ভিত্তিতে পেসা আইনের অধিকার কার্যকরের দাবি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, জনজাতি এলাকার উন্নয়ন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় স্থানীয় মানুষের মতামতকে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। গ্রামসভাকে প্রকৃত ক্ষমতা দিতে হবে। কোনো খনি, শিল্প কিংবা পরিকাঠামো প্রকল্পের ফলে একটি গ্রামের জমি, বন, জলাশয় বা জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হলে, সে গ্রামের মানুষের বক্তব্য শোনার ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রকল্পের নথি স্থানীয় ভাষায় প্রকাশ করা, পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি। সমাবেশের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয় কুড়মি জনগোষ্ঠীর তফসিলি জনজাতি বা ‘এসটি’ মর্যাদার দাবি। এ দাবির বিরোধিতায় সরব হয়েছেন একাধিক জনজাতি সংগঠনের প্রতিনিধি। তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক স্বার্থে অ-মূলনিবাসী জনগোষ্ঠীকে তফসিলি জনজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে। এর ফলে ইতিমধ্যেই তফসিলি জনজাতির স্বীকৃতিপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীগুলির সাংবিধানিক অধিকার, সংরক্ষণ এ বং সুযোগ-সুবিধার উপর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।
‘ভারত জাকাত মাঝি পরগণা মহল’-এর নেতৃত্বের বক্তব্য, তাঁরা কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নন। কিন্তু তফসিলি জনজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সাংবিধানিক নিয়ম ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের যথাযথ যাচাই হওয়া প্রয়োজন। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাব কিংবা নির্বাচনী সমীকরণের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। ভুয়ো এসটি শংসাপত্র তৈরি ও বিলি করার অভিযোগ তদন্তে কমিশন গঠন এবং দায়ী আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও তুলেছেন তাঁরা। অন্যদিকে, কুড়মি নেতৃত্বের বক্তব্য, নিজেদের ঐতিহাসিক ও সামাজিক পরিচয়ের স্বীকৃতি চাওয়ার অধিকার তাঁদেরও রয়েছে। সংবিধানের আওতায় থেকেই তাঁরা তফসিলি জনজাতির মর্যাদার দাবি জানাচ্ছেন। ফলে বিষয়টি শুধু দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধের প্রশ্ন নয়, বরং তফসিলি জনজাতির তালিকা নির্ধারণের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, ঐতিহাসিক নৃতাত্ত্বিক পরিচয় এবং সংরক্ষণের সুযোগ বণ্টনের সঙ্গেও জড়িত। কেন্দ্রীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে দাবির বিচার করা। কোনো জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার খর্ব না করে বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
জল-জঙ্গল-জমির অধিকারের পাশাপাশি মাতৃভাষায় শিক্ষার দাবিও এ সমাবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষত সাঁওতালি ভাষার প্রসার, অলচিকি লিপিতে শিক্ষার সুযোগ এবং পৃথক সাঁওতালি শিক্ষা পর্ষদ গঠনের দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, জনজাতি শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে হলে প্রাথমিক স্তর থেকেই মাতৃভাষায় পঠনপাঠনের ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু পাঠ্যবই প্রকাশ করলেই হবে না, প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো এবং উচ্চশিক্ষায় মাতৃভাষার সুযোগও তৈরি করতে হবে। সাঁওতালি ভাষা ২০০৩ সালে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু সাংবিধানিক স্বীকৃতি পাওয়ার পরেও শিক্ষাক্ষেত্র, প্রশাসনিক কাজকর্ম ও দৈনন্দিন জীবনে ভাষাটির ব্যবহার কতটা বিস্তৃত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সাঁওতালি ছাড়াও কুড়মালি, মুন্ডারি, হো-সহ বিভিন্ন ভাষার নিজস্ব সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে। সেই ভাষাগুলির সংরক্ষণ ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও রাষ্ট্রের।
সব মিলিয়ে মানবাজারের সমাবেশে জনজাতি মানুষের অধিকার আন্দোলনের একাধিক ধারাকে একই মঞ্চে আনার চেষ্টা দেখা গেল। এক দিকে খনি ও শিল্পের বিস্তারের ফলে জমি, পাহাড় ও বনাঞ্চল হারানোর আশঙ্কা, অন্য দিকে বনাধিকার আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রশ্ন। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং তফসিলি জনজাতির পরিচয় রক্ষার বিতর্ক। উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সে উন্নয়নের মূল্য যদি দিতে হয় কোননো জনগোষ্ঠীর বসতভিটে, জীবিকা, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় বিসর্জন দিয়ে, তবে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। মানবাজারের মহাসমাবেশ সে প্রশ্নই নতুন করে সামনে আনল। শুধু দেড় লক্ষ মানুষের জমায়েতের দাবি নয়, এ সমাবেশের প্রকৃত তাৎপর্য নির্ভর করবে আগামী দিনে আন্দোলনের দাবিগুলি কতটা সংগঠিত রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক চাপে পরিণত হয়, তার উপর।
❤ Support Us







