Advertisement
  • ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
  • আগস্ট ১১, ২০২২

শিকড়ের টানে চিত্রপটে বিবাহ আসর

ভিটে হারানোর যন্ত্রণা ভুলে শিকড়ে শিল্পিত বিবাহ আসর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
শিকড়ের টানে চিত্রপটে বিবাহ আসর

চিত্র সংবাদ সংস্থা

কোসোভোর দনে-এলযেবিনিয়ে গ্রামে বসল এক অদ্ভুত বিয়ের আসর।অলঙ্কার আর পোশাকের আড়ম্বরতা নয়। তাদের বিবাহআসর ছিল শিল্পময়। ক্যানভাস যেমন নানা রঙে সেজে তৈরি করে নান্দনিক পরিসর, তেমনি নিজের জন্মভূমির আদি শিল্পরীতির ছোঁয়ায় সেজে ছিল নবযুগলের পরিণয় অনুষ্ঠান।

যুদ্ধ দেশ কেড়েছিল দুজনেরই। দুজনের পরিবার বাধ্য হয়েছিল ভিটেমাটি ত্যাগে।পাত্রী মেলিসার জন্মভূমি ছিল মেক্সিকো আর পাত্র মেলসিডের কোসোভোয়। একসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রিত দুই পরিবারের মধ্যে বাড়তে থাকে সখ্য, আর সেখান থেকেই মেলিসা আর মেলসিডের কাছাকাছি আসা।

২০১৩, প্রেমিকের সঙ্গে, তাদের জন্মস্থান দনে-এলযেবিনিয়েতে, একটি বিবাহ অনুষ্ঠানে আসেন মেলিসা গুরেরো। আর সেখানেই জানতে পারেন কোসোভোর আদি পরিণয় রীতির কথা। দনে-এলযেবিনিয়ের গ্রামে, বিয়ের গোটা অনুষ্ঠানই যেন এক শিল্প প্রদর্শনী। অত্যাধুনিক, বহুজাতিক মেকাপের পসরায় নয়, বরং জৈব রঙে আর ঢঙে সেজে ওঠে নববধূর মুখ। হ্যাঁ, মুখই এখানে চিত্রপট, তার সঙ্গে মানানসই পোশাক আর অলঙ্কার।সঙ্গত যোগায় লোক বাদ্য। আক্ষরিক অর্থেই এ যেন এক ইন্সস্টলেশন আর্ট।দুদিন ধরে চলে এই বিয়ের পর্ব, বলা ভালো শিল্পিত বিবাহ আসর।

নয় বছর আগের সেই বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ফিরেই, প্রেমিক মেলসিডের কাছে আবদার করেন মেলিসা, শৈশবের দেশ হারানোর যন্ত্রণাকে লালিত করে নয়, বরং সেখান থেকে জন্ম হোক সুন্দর শিল্পিত অনুভূতির। তাই কোনো অভিজাত হোটেল বা দ্বীপের ডেস্টিনেশন উইডিং নয়, তাদের যৌথ জীবনের সূচনা হোক দনে-এলযেবিনিয়েতেই, দুহাজার বছর পুরনো, বিয়ের প্রাচীন লোক প্রথা মেনে।
২০২২ এর অগস্টে মেলিসা তার স্বপ্ন বাস্তব করতে সফল হলেন। মাথা থেকে পা পর্যন্ত বসনিয়ার প্রথাগত বিয়ের পোশাক পড়ে; মুখে সাদার উপর লাল, নীল, রুপালি এবং সোনালি রঙের নিপুণ কারুকার্য এঁকে তিনি বিয়ে করলেন কোসোভোর সেই বসনিয়ান পরিবারের সদস্য মেলসিড রেজেপিকে। নিজেদের বিয়ের এরকম শিল্পিত অচথ অনাড়াম্বর আয়োজন প্রসঙ্গে মেলিসা জানিয়েছেন, ২০১৩ সালে এখানকার একটি বিয়ে দেখে তার মনে হয়েছিল এখানকার মত এত অন্তরঙ্গতার সঙ্গে পৃথিবীর আর কোথাও বিয়ে হয় না।

 

মুখচিত্রের আদিকথা

দুহাজার বছর পুরনো এক প্রথা, যেখানে মানব মুখই হয়ে ওঠে ক্যানভাস। তাও জীবনের এক গুরত্বপূর্ণ সূচনায়, বিয়ের আসরে।স্থানীয়দের দাবি, আবিশ্বে, কোসোভোর, দনে-এলযেবিনিয়ের এই গ্রামই সেই শিল্পরীতির একমাত্র ধারক এবং বাহক।
এই শিল্পরীতিতে মূলত তিনটি রঙ ব্যবহার হয়। সোনালি, লাল এবং নীল। সোনালি, সমৃদ্ধি এবং আনন্দকে চিহ্নিত করে; লাল, প্রাচুয্যের প্রতীক; আর নীল নবদম্পতির ওপর থেকে কু নজর এড়ায়। বিয়ের দিন প্রথমে পাত্রীর চুল বেঁধে তাকে শুইয়ে দেওয়া হয় একটি পালঙ্কে। তারপর তার মুখে সাদা রঙের প্রলেপ দিয়ে তার উপর তিনটি রঙ-এর, তিনটি সূর্য আঁকা হয়। সেই সূর্যের বিচ্ছুরিত কিরণের আল্পনায় ভরে ওঠে বধূর মুখ। প্রায় দু-ঘন্টা ধরে চলে এই কারু শিল্প । এই সময় বধূকে কথা বলা, চোখ খোলা এবং খাওয়া-দাওয়া বন্ধ রাখতে হয়। আঁকবার কাজ শেষ হলে তাকে ঘোড়ার পিঠে করে নিয়ে যাওয়া হয়ে বিয়ের মন্ডপে।

বলা হয়, এই প্রথার আরম্ভ হয়েছিল, বিয়েতে উপস্থিত অন্যান্য অতিথী, বিশেষ করে মহিলাদের কু-নজর থেকে বধূকে বাঁচাতে। নববধূকে দেখে কারোর মনে হিংসে অথবা অন্য কোনো কুরুচি যাতে না জন্মায় সে জন্যই মুখ রাঙানোর এই রীতির সূচনা। কিন্তু দুঃখের বিষয়ে, এটি একটি মৃতপ্রায় শিল্প। দনে-এলযেবিনিয়ের জনসংখ্যা ক্রমশ কমছে। আধুনিক জীবনধারণের সুযোগ সুবিধা পেতে বেশীরভাগই শহরমুখী বা অন্য দেশে পাড়ি দিয়েছেন।
জুন-জুলাই মাসে সব থেকে বেশি বিয়ে হয় এই গ্রামে, দেশ-বিদেশ থেকে গ্রামে ফিরে আসেন এখানকার আদি বাসিন্দারা। মেলিসার স্বামী মেসিড জানিয়েছেন, একবার এই গ্রামে জন্মালে, একে ছেড়ে যাওয়া খুব কঠিন। তবুও এই ধরনের পরম্পরাগত ভাবে বিয়ে করতে চাওয়া পাত্র-পাত্রীর সংখ্যা খুবই কম। বর্তমানে, এই গ্রামে কেবল একজন মহিলা শিল্পী আছেন, যিনি প্রথাগত কারুশিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন। ৬০ বছরের আজিজা সেফিতাজিক, গ্রামের নতুন প্রজন্মের মধ্যে প্রাচীন এই শিল্পরীতিকে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছিলেন তিনি । তিনি বলেছেন, আমি শুধু চাই যে এই প্রথা আমার মৃতুর পরেও বেঁচে থাকুক।

মজার বিষয়, এই রীতির সঙ্গে, ভারতীয়দের বিবাহ আসরের অদ্ভূত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। উপমহাদেশে বিয়ের দিন নববধূ এবং বড়ের কপালে চন্দন দিয়ে অল্পনা আঁকার প্রচলোন আছে, রয়েছে মেহেন্দি পরার রীতি।এ ছাড়াও জন্ম অনুষ্ঠান,অন্নপ্রাসন এমনকী মূত্যুতেও মুখমণ্ডলে চন্দন দিয়ে আলপনা আঁকার রীতি আছে। শরীরকে চিত্রপট হিসেবে ব্যবহার করার লোকরীতি আছে, উপমহাদেশের বিভিন্ন গ্রামেও । বোসনিয়ার ওই প্রথার মতই এখানকার আদিবাসীরা বিশ্বাস করেন যে তাদের শরীরচিত্রের কারুকার্যগুলি খারাপ দৃষ্ট ও লক্ষণ থেকে মুক্তি দেয় এবং সৌভাগ্য আনে। তাদের মধ্যে অনেকেই তাদের প্রিয়জনের নাম বা ঈশ্বরের নাম, তাদের প্রতি স্নেহ বা ভক্তি দেখানোর জন্য নিজের শরীরে গেঁথে রাখেন। তবে সেই শরীরচিত্র প্রথার ঘটেছে রূপান্তর। আগে যা ছিল লোকজীবনের অঙ্গ এখন তা ট্যাটুর মাধ্যমে স্টাইল স্ট্যাটাস।


❤ Support Us
error: Content is protected !!