Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • এপ্রিল ৪, ২০২৬

বহরমপুরে ভোট প্রচারে উত্তেজনা, অধীর চৌধুরীকে ঘিরে ধাক্কাধাক্কির অভিযোগ তৃণমূলের বিরুদ্ধে। সাগরদিঘির প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে কংগ্রেসের অন্দরেই বিদ্রোহ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বহরমপুরে ভোট প্রচারে উত্তেজনা, অধীর চৌধুরীকে ঘিরে ধাক্কাধাক্কির অভিযোগ তৃণমূলের বিরুদ্ধে। সাগরদিঘির প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে কংগ্রেসের অন্দরেই বিদ্রোহ

ভোটের আবহে ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক মাটি। শনিবার সকালেই বহরমপুরে নির্বাচনী প্রচার ঘিরে যে অশান্তির ছবি সামনে এল, তা এই উত্তেজনারই বহিঃপ্রকাশ। বহরমপুর পুরসভার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে প্রচারে গিয়ে কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরীকে ঘিরে ধাক্কাধাক্কি, বচসা এবং হেনস্থার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীদের বিরুদ্ধে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুহূর্তের মধ্যে থমথমে হয়ে ওঠে গোটা এলাকা।

স্থানীয় সূত্রে খবর, সকালেই দলীয় কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে প্রচারে বেরিয়েছিলেন অধীর। ওয়ার্ডের ভিতরে প্রচার চলাকালীনই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। অভিযোগ, তৃণমূল কর্মীরা তাঁর পথ আটকে দাঁড়ান। প্রথমে কথার লড়াই, তারপর ক্রমশ পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। বচসা গড়ায় ধাক্কাধাক্কিতে। উপস্থিত সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক মুহূর্তের জন্য কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় পরিস্থিতি। কংগ্রেসের তরফে আরও গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, ওই ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর ভীষ্মদেব কর্মকার-এর উপস্থিতিতেই তাঁদের কয়েকজন কর্মীকে মারধর করা হয়।

যদিও এই অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন ভীষ্মদেব। তাঁর বক্তব্য, প্রতিদিনের মতো তাঁরাও ওই এলাকায় প্রচারে ছিলেন। একই রাস্তায় দুই দলের মিছিল মুখোমুখি পড়ে যাওয়াতেই এই অশান্তির সূত্রপাত। তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনাস্থলে উপস্থিত কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের সরিয়ে দিয়ে অধীর চৌধুরীকে আগে এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। সে সময়ই হুড়োহুড়ির মধ্যে ধাক্কাধাক্কির পরিস্থিতি তৈরি হয়। ঘটনা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে অধীর চৌধুরী নিজেও তৃণমূল কর্মীদের আচরণের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন। তিনি জানান, এদিন তিনি নিয়মমাফিক প্রচারে বেরিয়েছিলেন, কিন্তু তৃণমূল কর্মীরা এসে ধাক্কাধাক্কি শুরু করে। ‘এটাই ওদের স্বভাব’—এমন মন্তব্যও শোনা যায় তাঁর মুখে। যদিও দলের কর্মীদের মারধরের অভিযোগ নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন বলেই জানিয়েছেন। তবে স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন, তাঁর দলের কর্মীদের ওপর হামলা হলে তার পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বহরমপুর জুড়ে যে উত্তেজনা ছড়িয়েছে, তার রেশ কাটতে না কাটতেই সামনে এসেছে কংগ্রেসের অন্দরমহলের আরও বড়ো সংকট। সাগরদিঘি বিধানসভা কেন্দ্রকে ঘিরে দলের ভিতরেই তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে। প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে শুরু হয়েছে প্রকাশ্য বিদ্রোহ। দলের একাংশ সরাসরি অভিযোগ তুলেছে, স্থানীয় নেতৃত্বকে উপেক্ষা করে বহিরাগত প্রার্থী চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা সংগঠনের ভিতরে ক্ষোভ বাড়িয়ে তুলেছে। সাগরদিঘি আসনের জন্য কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে বহরমপুরের প্রাক্তন বিধায়ক তথা মুর্শিদাবাদ জেলা কংগ্রেস সভাপতি মনোজ চক্রবর্তীকে। কিন্তু দলের একাংশের দাবি, তাঁর সঙ্গে ওই কেন্দ্রের প্রত্যক্ষ কোনো সংযোগ নেই। ফলে তাঁকে বহিরাগত হিসেবেই দেখছেন স্থানীয় কর্মীরা। দলের এহেন সিদ্ধান্তে তাঁরা কার্যত ক্ষুব্ধ।

প্রদেশ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ও মুখপাত্র হাসানুজ্জামান বাপ্পা, প্রদেশ নেতা শিলাদিত্য হালদার এবং প্রদেশ যুব কংগ্রেসের সহ-সভাপতি আশিক ইকবাল— তিন নেতা প্রকাশ্যে দলের প্রার্থী নির্বাচনের বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের যুক্তি, সাগরদিঘি একটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা। সেখানে এমন প্রার্থী নির্বাচন রাজনৈতিক বিচারে ভুল পদক্ষেপ। একই সঙ্গে তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন, অন্য কেন্দ্রগুলিতে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অসংগতি দেখা যাচ্ছে। যেখানে হিন্দু ভোটারের সংখ্যা বেশি, সেখানে মুসলিম প্রার্থী দেওয়া হয়েছে—যা তাঁদের মতে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং কৌশলগত ভুল।

বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের অভিযোগ এখানেই থেমে থাকেনি। তাঁদের দাবি, এই ধরনের প্রার্থী নির্বাচন আসলে সাগরদিঘি আসনটি তৃণমূল কংগ্রেসের হাতে তুলে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত প্রয়াস। আরও বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা, অধীর চৌধুরী না কি তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপির সঙ্গে গোপন আঁতাতে জড়িয়ে পড়েছেন। যদিও এ অভিযোগের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ সামনে আসেনি, তবু তা ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। সাগরদিঘি ব্লক কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক সাহিদুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, অধীর চৌধুরী ইচ্ছাকৃতভাবেই এই আসন তৃণমূলকে ‘উপহার’ দিতে চাইছেন। মনোজ চক্রবর্তীকে প্রার্থী করা সে পরিকল্পনারই অংশ বলে দাবি তাঁর। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করা হলে তাঁরা ভোট বয়কটের পথেই হাঁটতে বাধ্য হবেন।

একই সুর শোনা গিয়েছে প্রদেশ নেতা হাসানুজ্জামান বাপ্পার গলাতেও। তাঁর দাবি, মুর্শিদাবাদ জেলায় কংগ্রেসের ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ার পিছনে অধীর চৌধুরীর নেতৃত্বই দায়ী। তাঁর কথায়, ‘অধীরের নেতৃত্বেই জেলায় কংগ্রেস প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।’ পাশাপাশি দলের শৃঙ্খলা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিক্ষুব্ধ নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণার দায়িত্ব অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির হলেও সেই নিয়ম মানা হচ্ছে না। বরং একতরফাভাবে প্রার্থী ঘোষণা করা হচ্ছে। শিলাদিত্য হালদার আরও এক ধাপ এগিয়ে অভিযোগ করেছেন, মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রে মনোজ চক্রবর্তীকে প্রার্থী করলে কংগ্রেস লড়াইয়ে থাকতে পারত। পাশাপাশি রঘুনাথগঞ্জ কেন্দ্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, রঘুনাথগঞ্জ ও সাগরদিঘি তৃণমূলকে এবং মুর্শিদাবাদ বিজেপিকে ‘ছেড়ে দেওয়ার’ পরিকল্পনা চলছে, যা তাঁরা কোনোভাবেই মেনে নেবেন না।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!