Advertisement
  • দে । শ
  • আগস্ট ১৮, ২০২৬

পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণায় অনশন ভাঙলেন দেবেন্দ্র, তবু থামছে না ঝাড়খণ্ডের আন্দোলন ! সিবিআই তদন্তের দাবিতে অনড় পড়ুয়ারা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণায় অনশন ভাঙলেন দেবেন্দ্র, তবু থামছে না ঝাড়খণ্ডের আন্দোলন ! সিবিআই তদন্তের দাবিতে অনড় পড়ুয়ারা

ঝাড়খণ্ডে পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণা হওয়ার পরেও কাটল না জট। বরং সরকারের সিদ্ধান্তের পর আন্দোলনের অভিমুখ আরও স্পষ্ট হয়েছে। পরীক্ষা বাতিলের দাবি মেনে নেওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকে ধন্যবাদ জানালেও আন্দোলন প্রত্যাহারের কোনো ইঙ্গিত দেননি বিক্ষোভকারী পড়ুয়ারা। তাঁদের বক্তব্য, ‘টিডিপিএল’-এর মাধ্যমে পরিচালিত পরীক্ষাগুলি বাতিল করা তাঁদের অন্যতম দাবি ছিল ঠিকই, কিন্তু মূল দাবি— নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগের তদন্তে সিবিআই-কে দায়িত্ব দেওয়া, যা এখনো পূরণ হয়নি। ফলে, সে দাবি না মানা পর্যন্ত অবস্থান-বিক্ষোভ চলবে বলেই জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

আন্দোলনের ২৪তম দিনে পড়ুয়াদের সঙ্গে সরকারের টানাপড়েনের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী সোরেন জানান, ‘জেএসএসসি’, জেপিএসসি পরীক্ষা বাতিল করা হবে। পাশাপাশি ‘টিডিপিএল’ সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত সমস্ত পরীক্ষাও বাতিলের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সরকারের এ সিদ্ধান্তে এক দিকে আন্দোলনকারীদের মধ্যে সাময়িক স্বস্তি তৈরি হলেও, সব দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন জারি রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা। পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণা হতেই ১৬ দিন ধরে চলা অনশন প্রত্যাহার করলেন ছাত্রনেতা দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো। পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তের জন্য সরকারের প্রশংসা করে তিনি বলেছেন, ‘এমন একটি সাহসী পদক্ষেপের জন্য আমি ঝাড়খণ্ড সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। পরীক্ষা বাতিল করাটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ।’ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের স্নাতক স্তরের পরীক্ষার নিয়োগপ্রক্রিয়া অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। দেবেন্দ্রের মতে, ‘সরকারের পক্ষে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়তো সহজ ছিল না। কারণ, ওই পরীক্ষার নিয়োগপ্রক্রিয়া অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল। কাজে যোগ দেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। অনেক পড়ুয়া সম্ভবত নিজেদের আসন নিশ্চিত করে ফেলেছিল। তবুও এই সঙ্কটময় পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার এই সাহসী পদক্ষেপ করেছে।’ সোমবার রাতে ঝাড়খণ্ড সরকারের দুই মন্ত্রী ইরফান আনসারি এবং দীপিকা পাণ্ডে সিংহ অনশনরত দেবেন্দ্র এবং তাঁর সঙ্গে থাকা অন্য ছাত্রনেতাদের সঙ্গে দেখা করার পরই অনশন তুলে নেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়। দেবেন্দ্রের সঙ্গে অনশনে ছিলেন উম্মে হাবিবা এবং রাহুল ক্রান্তিও। তাঁরাও অনশন প্রত্যাহার করেছেন।

অন্যদিকে, ইতিমধ্যেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকরিতে যোগ দেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, মেধার ভিত্তিতে পরীক্ষা পাশ করে তাঁরা সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। সাত মাসের চাকরি বাতিলের আশঙ্কায় তাঁরা ইতিমধ্যেই রাস্তায় নেমেছেন। সোমবার রাতে সরকারের ঘোষণা সামনে আসার পর কয়েকশো ‘সফল প্রার্থী’ মানববন্ধন করেন। তাঁদের দাবি, আন্দোলনের চাপে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যাতে নিয়ম মেনে নিয়োগ পাওয়া প্রার্থীদের চাকরি চলে যায়। সফল প্রার্থীদের একাংশের অভিযোগ, ‘জনতার চাপের রাজনীতি’-র কাছে প্রশাসনিক ব্যবস্থা পরাজিত হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা কোনো অনিয়মের সুবিধা নিয়ে চাকরি পাননি। কঠোর পরিশ্রম করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাই পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁদের হুঁশিয়ারি, ‘আমরা আদালতে যাব। সেখানেই ন্যায়বিচার পাব।’

এ আবহেই মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন সরকারের সিদ্ধান্তের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, অনিয়মের অভিযোগের জেরে ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের স্নাতক স্তরের পরীক্ষা এবং ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধু সাম্প্রতিক পরীক্ষাই নয়, ২০১৪ সাল থেকে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় ওঠা ছোটো-বড়ো সমস্ত ত্রুটির অভিযোগও খতিয়ে দেখা হবে। সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, ‘টিএসআর ডেটা প্রসেসিং লিমিটেড’-এর মাধ্যমে পরিচালিত সমস্ত পরীক্ষা বাতিল করা হবে। পাশাপাশি পরীক্ষা পদ্ধতিতে সংস্কারের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে। প্রবীণ আইএএস আধিকারিক অমিতাভ কৌশলকে সে কমিটির নেতৃত্বে রাখা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী সোরেন।

নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগের তদন্তের ক্ষেত্রেও আইনি পদক্ষেপের কথাও জানিয়েছেন তিনি। সংসদের সদ্যসমাপ্ত বাদল অধিবেশনে পাস হওয়া প্রশ্নফাঁস রোধে সংশোধিত আইন অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।ঝাড়খণ্ডে পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থা নিয়ে বিতর্কও নতুন নয়। কালো তালিকাভুক্ত একটি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ‘টিএসআর ডেটা প্রসেসিং লিমিটেড’কে ঘুষের বিনিময়ে ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ পরীক্ষার দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। সে মামলায় কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান খিয়াংতেকে ঝাড়খণ্ড পুলিশের অপরাধ দমন শাখা গ্রেফতার করেছে বলেও জানানো হয়েছে। ফলে নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে অনিয়মের অভিযোগের সঙ্গে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিতর্কও ক্রমশ জড়িয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই সোমবার হেমন্ত সোরেনকে চিঠি লিখেছিলেন রাহুল গান্ধী।ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন এবং ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাঁচীতে চলা পড়ুয়াদের আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বিক্ষোভকারীদের দাবিকে ‘ন্যায়সঙ্গত’ বলে উল্লেখ করেন। জোটসঙ্গী হেমন্তকে রাহুলের পরামর্শ ছিল, আন্দোলনরত পড়ুয়াদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী নিজে কথা বলুন। রাহুলের এই চিঠির পরেই সরকারের তরফে নতুন পদক্ষেপের ঘোষণা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্দোলনকারীদের একাংশ। যদিও সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরও তাঁদের সম্পূর্ণ সন্তুষ্টি আসেনি। কারণ, কেন্দ্রীয় তদন্তের দাবিতে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি রাজ্য সরকার। ফলে এখনই আন্দোলনের আগুন নিভছে না ঝাড়খণ্ডে।আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মেনে নেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু গোটা বিষয়টির তদন্ত না হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। ‘জেপিএসসি জেএসএসসি সংস্কার মঞ্চ’-এর নেতা রবীন্দ্র পাসওয়ান বলেন, ‘সিবিআই তদন্তের দাবি এখনো পূরণ হয়নি। সেই নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। ২৪ দিন পর অবশেষে আমাদের দাবি শোনার জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। আমরা একটি বড়ো লড়াই জিতেছি। তবে এখনো অনেক কিছু করা বাকি। সিবিআই তদন্তের নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অনশন, বিক্ষোভ চলবে।’ অর্থাৎ, পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তকে তাঁরা আন্দোলনের ‘আংশিক সাফল্য’ হিসাবেই দেখছেন। সরকারের ঘোষণাকে চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে মানতে নারাজ তাঁরা।আন্দোলনকারীদের আরও বক্তব্য, শুধুমাত্র পরীক্ষা বাতিল করলেই নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় ওঠা সমস্ত প্রশ্নের উত্তর মিলবে না। কী ভাবে পরীক্ষা পরিচালিত হয়েছিল, মেধাতালিকা তৈরিতে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, সংশ্লিষ্ট সংস্থার ভূমিকা কী ছিল—এ সমস্ত প্রশ্নের নিরপেক্ষ নিবিড় তদন্ত প্রয়োজন। মঞ্চের আর এক নেতা পীযূষ কুমার সিংহও জানিয়েছেন, সরকারের ঘোষণার পরই আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। আগে সরকারি সিদ্ধান্তের খুঁটিনাটি যাচাই করে দেখতে চান তাঁরা। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো বয়সের ঊর্ধ্বসীমা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। তাঁদের দাবি ছিল ২০১৮ সালকে কাট-অফ বছর হিসেবে বিবেচনা করা হোক। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয় বলেই দাবি তাঁদের।ধারাবাহিক ঘটনায়, একদিকে পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তকে নিজেদের আন্দোলনের সাফল্য বলে দাবি করছেন বিক্ষোভকারী পড়ুয়ারা, অন্যদিকে সেই একই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি পথে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ চাকরিপ্রার্থীরা। দুই পক্ষের দাবির সংঘাতে ঝাড়খণ্ডে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সরকারের সামনে এখন মূলত দুটি বড়ো প্রশ্ন। এক, আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হবে কি না। দুই, ইতিমধ্যে পাশ করে চাকরিতে যোগ দেওয়া প্রার্থীদের নিয়োগের ভবিষ্যৎ কী হবে। এই দুই প্রশ্নের উত্তর না মেলা পর্যন্ত ঝাড়খণ্ডে নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে চলমান আন্দোলন থামার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!