Advertisement
  • খাস-কলম ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
  • ডিসেম্বর ৮, ২০২৩

জাস্টিন ট্রায়েট এর “এনাটমি অব ফল”, সম্পর্কের এক নিরপেক্ষ দর্শন

অমিত মুখোপাধ্যায়
জাস্টিন ট্রায়েট এর “এনাটমি অব ফল”, সম্পর্কের এক নিরপেক্ষ দর্শন

ফ্রান্সের জাস্টিন ট্রায়েট এর “এনাটমি অব ফল”(২০২৩), কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের দ্বিতীয় দিনে দর্শকমনে সাড়া ফেলেছে। অসময়ে শীতের বৃষ্টি রাতের শোয়ে ১৫১ মিনিটের দীর্ঘ সৃষ্টি উপভোগে বাধা হতে পারে নি। ছবিটি এ বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবে Palme d’Or এবং Palm Dog Award পেয়েছে ইতিমধ্যেই।

ঔপন্যাসিক সান্ড্রা ভয়টার সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে তার স্বামী, লেখক স্যামুয়েল মালেস্কি জোরে বাজনা চালিয়ে দেন। আওয়াজে বাধা পেয়ে মাঝ পথেই থমকে যায় সান্ড্রার কথপোকথন।পরের দৃশ্যেই  লেখক এবং লেখিকার আংশিক অন্ধ পুস্ত ড্যানিয়েল তার গাইড-কুকুর স্নুপকে নিয়ে ঘুরে বাড়ি ফেরার সময় দেখে বাড়ির ড্রাইভওয়েতে বাবা স্যামুয়েল পড়ে আছেন। ময়নাতদন্তে দেখা যায় স্যামুয়েল পড়ার আগেই একটি বড়ো আঘাত পেয়েছেন মাথায়।আর তাতেই তার মৃত্যু।

রুজু হয় হত্যার মামলা ।ড্যানিয়েলের মায়ের পক্ষে মামলা লড়েন তার পুরনো বন্ধু ও আইনজীবী ভিন্সেন্ট।এরপর দীর্ঘ একবছর ধরে চলে বাদি বিবাদি পক্ষের তীব্র আইনি চাপানোতর ।মাঝে নানা তথ্য ও ঘটনা দর্শকদের সামনে আসতে থাকে।জানা যায় পিতা স্যামুয়েলের গাফিলতিতেই পুত্র ড্যানিয়েল দৃষ্টি শক্তি হারায় ।উঠে আসে লেখক স্যামুয়েল মালেস্কির এস্পিরিন ওষুধের প্রতি আসক্তির কথা ।সামনে আসে সান্ড্রার হাতে ছড়ে যাবার দাগ। স্যামুয়েলের পড়ে যাওয়ার হিসেব না-মেলা রক্তের দাগ ইত্যাদি।তবে এসব তথ্য ও প্রমাণকে ছাপিয়ে যায় লেখক স্যামুয়েলের এক অদ্ভুত অভ্যাস। তিনি দাম্পত্য কলহ রেকর্ড করে রাখতেন। সেই রেকর্ডই তার বিরুদ্ধে প্রমান হিসেবে ব্যাবহৃত হয় এই মামলায়। পাল্টা তথ্যে উঠে আসে ঔপন্যাসিক সান্ড্রার চুরি করার অভ্যাস, স্বামীর লেখার অংশ চুরি করে নিজের নামে চালানোর প্রচেষ্টা, দাম্পত্য কলহে স্বামীকে আঘাত এবং অবসাদে স্বামীকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ । আদালতে দুই পক্ষের লড়াইয়ের মধ্যেই উঠে আসে আরেক তথ্য প্রমাণ । যেখানে স্যামুয়েল ছেলের জন্য গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল । বাড়ি মেরামত করতে গিয়ে বাদারে ধার হয় প্রচুর ।লেখা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একসময় তিনি ডুবে যান হতাশায়।এর বিপক্ষে সান্ড্রার নামেও ওঠে কিছু মিথ্যা প্রমানের অভিযোগ ।

এর পরেই আসে সিনেমাটির আসল চমক। দু’পক্ষের যুক্তি আর সাখ্য প্রমানে  কিছুতে যখন সত্য উৎঘাটিত হচ্ছে না, তখন ছেলে ড্যানিয়েল দ্বিতীয় বার সাক্ষ্য দিতে চায়।তার জবানবন্দীতেই উন্মোচিত হয় নতুন তথ্য, সেই যুক্তিতে বিচারপতিও অবাক হয়ে যান। সে বলে, মাই বাবার হত্যাকারী এই তত্ত্ব প্রমাণের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে এই মামলায়।সে বলে, তার বাবা একবার বলেছিল কুকুর স্নুপের মারা যাবার সম্ভাবনার কথা। সে বাবার ড্রয়ার থেকে ওষুধের বাক্স বার করে ও অতীতে কুকুরের ঝিমনোর স্মৃতি মনে রেখে এস্পিরিনের বেশি ডোজ দেয়। তাতে স্নুপ মারা যাবার দশা হয়। সে বলে, আসলে বাবা তাকে বাবার মৃত্যুর কথাই বলেছিল, আত্মহত্যার কথা চিন্তা করেই হয়ত।

এরপরই মুক্তি পায় মা। কিন্তু যেহেতু এক সপ্তাহ মা-ছেলের আলাদা থাকার কথা, সান্ড্রা গাড়ি থেকে ছেলের অনুমতি চায় !  অসাধারণ শেষের দৃশ্যের পরম্পরা: মা বলে হোটেলে খেয়ে ফিরতে দেরি হলো, আসলে মা ছেলের সামনে আসতে ভয় পাচ্ছিল। ঘুম থেকে ওঠা ছেলেও বলে সে-ও মাকে ভয় পাচ্ছিল ! মা এগিয়ে এলে বিছানায় বসা ছেলে মাকে জড়িয়ে ধরে, এমন ভঙ্গিতে, যে ছেলেই মায়ের মাথা নেয় কোলে, ভূমিকার বদল হয়ে যায় ! আসে কুকুর স্নুপ, সে-ও মায়ের পাশে যেন জোর করে শুয়ে পড়ে !

দাম্পত্য আজ কোথায় দাঁড়িয়ে, গোপনীয়তা কোথায় নেমেছে, সন্তান কতটা সহ্য করে, এ সব ছাপিয়ে মাথা তোলে সেই কথা, ছোটোদের আর ছোটো ভেব না, তারা সময়ের অসহ্য কামড় খেয়ে, পক্ষপাতহীন চিন্তা ও পরিণত বুদ্ধিতে পরাস্ত করতে পারে বড়োদের !

চলচ্চিত্র উৎসবের দ্বিতীয় দিনে আরো কিছু অসাধারণ ছবি দেখানো হয় আজ, যার মধ্যে ফ্রান্সের কুয়েন্তিন দুপিয়েক্স এর “ডালি”, যা সালভাদর ডালির মজার জীবন নিয়ে, অস্ট্রেলিয়ার ব্রুস বেরেস্ফোর্ড এর “ব্রেকার মোরান্ট”, যা এক যুদ্ধের মাঝে নিরাপরাধ মানুষদের হত্যা করার মতো গম্ভীর বিষয় নিয়ে করা।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!