- এই মুহূর্তে দে । শ
- এপ্রিল ২, ২০২৬
বিদেশি অনুদান আইনের সংশোধন ঘিরে তীব্র বিতর্ক । মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ‘চাপ সৃষ্টি’, ‘ব্ল্যাকমেল’-এর অভিযোগ বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের
বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইন (এফসিআরএ) সংশোধনী বিল, ২০২৬ ঘিরে ফের উত্তপ্ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহল। একদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তা ও বিদেশি অর্থের অপব্যবহার রুখতেই এই সংশোধন, অন্যদিকে আইনি বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী ও বিরোধীদের একাংশের অভিযোগ, এটি কার্যত নাগরিক সমাজ ও ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার। পরিস্থিতি এমনই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিলটি আপাতত লোকসভায় স্থগিত রাখলেও বিতর্ক থামার কোনো লক্ষণ নেই।
বিরোধীদের দাবি, বিজেপির ‘দেশ সুরক্ষা’-র যুক্তির আড়ালে একের পর এক বিধিনিষেধ চাপিয়ে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলির উপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা হচ্ছে। ভোটমুখী কেরালার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। ‘ক্যাথলিক বিশপস কনফারেন্স অফ ইন্ডিয়া’ প্রকাশ্যে সংশোধনী বিলের বিরোধিতা করে জানিয়েছে, এতে সংখ্যালঘু শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উপর ‘অযাচিত হস্তক্ষেপ’-এর পথ প্রশস্ত হবে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, নির্বাচনী সমীকরণ মাথায় রেখেই সরকার আপাতত বিলটি স্থগিত রেখেছে, যাতে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত রাজ্য কেরালায় কোনো ভোটবাক্সে কোনো প্রতিকূল প্রভাব না পড়ে।
এই প্রেক্ষিতে সিপিআই(এম) সাংসদ জন ব্রিটাস সংসদে দাবি করেছেন, নতুন সংশোধনী কার্যকর হলে সামান্য প্রশাসনিক বা প্রযুক্তিগত ত্রুটির ভিত্তিতেও এনজিওগুলির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ, এমনকি সম্পত্তি বাজেয়াপ্তির মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। তাঁর আরও অভিযোগ, এফসিআরএ সংক্রান্ত মৌলিক তথ্য— যেমন লাইসেন্স বাতিলের সংখ্যা, কারণ বা রাজ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান ইত্যাদি সংসদে বারবার জানতে চাইলেও তা ‘গোপনীয়’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নও এই সংশোধনীর সমালোচনা করে বলেছেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত, নয়া আইন সংশোধন সমাজকল্যাণমূলক সংগঠনগুলির কাজের পরিসর অনেকখানি সংকুচিত করে দিতে পারে।
অন্যদিকে, কেন্দ্র সরকারের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু দাবি করেছেন, বিদেশি অর্থের অপব্যবহার রুখতেই এ পদক্ষেপ জরুরি। তাঁর বক্তব্য, কিছু রাজনৈতিক মহল ইচ্ছাকৃতভাবে গুজব ছড়াচ্ছে যে ধর্মীয় সংগঠনগুলির কার্যকলাপ রুখতেই সরকার এই আইন আনছে। বাস্তবে, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। তবে বিরোধ ও সমালোচনার সুর সবচেয়ে তীব্র হয়েছে আইনি ও মানবাধিকার মহলে। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী কামিনী জয়সওয়াল অভিযোগ করেছেন, এনজিওগুলিকে কার্যত ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। তাঁর অভিযোগ, ‘যারা সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস দেখায়, তাদেরই টার্গেট করা হচ্ছে। এটি নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং চাপ সৃষ্টি করে ও ব্ল্যাকমেল করে সমালোচনার কণ্ঠরোধের কৌশল।’ সাংবাদিক ও সমাজকর্মী আকার প্যাটেলও দাবি করেছেন, নতুন সংশোধনী মূলত মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, পরিবেশ ও সংখ্যালঘু অধিকারের মতো ক্ষেত্রগুলিতে কাজ করা সংগঠনগুলিকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাঁর মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি ধারাবাহিক নীতিগত কাঠামোর অংশ, যার লক্ষ্য নাগরিক সমাজকে দুর্বল করা।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালে ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইন্ডিয়া’ তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়, যখন তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা হয় এফসিআরএ লঙ্ঘনের অভিযোগে। সে ঘটনার পর থেকেই এ আইন নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়। অন্যদিকে, সরকারের তরফে বারবার বলা হয়েছে, বিদেশি অনুদানের অপব্যবহার প্রতিরোধে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স’ (এফএটিএফ)-এর নির্দেশিকার প্রসঙ্গও টেনে সরকার দাবি করেছে, সন্ত্রাসে অর্থায়ন রুখতে লক্ষ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
তবে পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক বছরে ‘এফসিআরএ’ লাইসেন্স বাতিলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একাধিক রিপোর্ট অনুযায়ী, হাজার হাজার সংগঠন ইতিমধ্যেই বিদেশি অনুদান গ্রহণের অধিকার হারিয়েছে। মানবাধিকার ও পরিবেশ সংক্রান্ত সংস্থাগুলির উপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বলে অভিযোগ। এই পরিস্থিতিতে আরও একটি বিতর্কিত প্রশ্ন সামনে এসেছে—নিয়ন্ত্রণের এই কঠোরতা কি শুধুমাত্র এনজিওগুলির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ? বিরোধীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক দলগুলির বিদেশি অনুদান নিয়ে একই ধরনের স্বচ্ছতার অভাব থাকলেও তাদের ক্ষেত্রে এমন কঠোরতা দেখা যায় না।
❤ Support Us







