Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • নভেম্বর ১২, ২০২৫

প্রায় ৫ হাজার উপজাতি পরিবারকে জমির পাট্টা বিতরণ অসমে। অবৈধ বনাঞ্চল দখল আর অনুপ্রবেশ কড়া বার্তা হিমন্তর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
প্রায় ৫ হাজার উপজাতি পরিবারকে জমির পাট্টা বিতরণ অসমে। অবৈধ বনাঞ্চল দখল আর অনুপ্রবেশ কড়া বার্তা হিমন্তর

বীরসা মুন্ডার জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ‘জানজাতীয় গৌরব বর্ষ’ উদ্‌যাপন চলছে গোটা দেশে। সে আবহেই মঙ্গলবার কামরূপ জেলার ছয়গাঁওয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে ৪,৬৭৩ জন আদিবাসী পরিবারকে জমির মালিকানার সনদ তুলে দিলেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। রাজ্যের জনজাতি সমাজের জীবনের এ এক আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে উঠল। অসম সরকারের এ উদ্যোগ, বনাধিকার আইন, ২০০৬-এর আওতায়, বহু প্রজন্ম ধরে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বসবাসকারী গারো, রাভা, বোরো এবং কার্বি সম্প্রদায়ের পরিবারগুলিকে জমির অধিকার দিয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত জানান, ‘স্বাধীনতার ৭৮ বছর পর বনাঞ্চলে বসবাসকারী আমাদের উপজাতি ভাই-বোনেরা আজ নিজেদের জমির বৈধ মালিকানা পেলেন— এটা আমাদের জন্য গর্বের দিন।’ তিনি আরো বলেন, ‘২০০৫ সালে সংসদে বনাধিকার আইন পাশ হয়। ২০২১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর আমি নির্দেশ দিয়েছিলাম, বনাঞ্চলে যে সমস্ত উপজাতি পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাস করছে, তাদের সবাইকে যেন জমির অধিকার দেওয়া হয়। আজ তারই ফল এই উদ্যোগ।’ তাঁর দাবি, ‘আমরা যে জমির সনদ দিচ্ছি, সেটি কাগজে-কলমে অধিকার নয়, এটি তাঁদের আত্মমর্যাদার স্বীকৃতি। বহু প্রজন্ম ধরে এই বন তাঁদের ঘর, আজ থেকে সেটি তাদের আইনি ঠিকানাও।’

গারো, রাভা, বোরো এবং কার্বি— অসমে এই চারটি উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষদের নাম উঠে এল মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে। এঁরা বহু দশক ধরে কামরূপের লখরা, বণ্ডাপাড়া, কুলশি, লোহারঘাট, বামুণিগাঁও, বোকো ও সিংরা অঞ্চলে বনাঞ্চলের ভিতরেই ঘর বেঁধে বাস করছেন। বন অধিকার আইন, ২০০৬-এর বিধান অনুযায়ী তাঁদের জমির অধিকার সরকারি ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো মঙ্গলবারের অনুষ্ঠানে। মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণ জুড়ে উঠে আসে রাজ্যের ‘মিশন বসুন্ধরা’ প্রকল্পের প্রসঙ্গও। সে প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে প্রায় দেড় লক্ষ উপজাতি পরিবার জমির পাট্টা পেয়েছিল, কিন্তু অনেকেই আবেদন করেননি— কারণ তাঁদের পৈতৃক জমি ছিল। মুখ্যমন্ত্রীর ভাষায়, ‘আগে যেখানে সর্বোচ্চ সাত বিঘা পর্যন্ত জমির পট্টা দেওয়া যেত, আমরা এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি, উপজাতি পরিবারগুলিকে সর্বোচ্চ ৫০ বিঘা পর্যন্ত জমির বৈধ মালিকানা দেওয়া হবে। এটা কোনো দয়া নয়, তাঁদের অধিকার।’

তিনি জানান, রাজ্যের বহু অঞ্চল এখনও অ-ক্যাডাস্ট্রাল জমি হিসেবে নথিবদ্ধ ছিল— অর্থাৎ সরকারি রেকর্ডে জমির সঠিক সীমা, পরিমাপ বা মালিকানা নির্ধারিত ছিল না। সরকার গত চার বছরে প্রায় ৬০০টি গ্রামকে ক্যাডাস্ট্রাল বা নথিভুক্ত জমির আওতায় এনেছে। ফলে বহু পরিবার জমির পাট্টা পাওয়ার যোগ্য হয়েছে। তাঁর গলায় গর্ব, ‘আজ প্রায় আট দশক পরে কামরূপের পূর্ব ও পশ্চিম বনবিভাগের বাসিন্দারা তাঁদের মাটির মালিক হয়েছেন। এটা শুধু প্রশাসনিক সাফল্য নয়, সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার মুহূর্ত।’ তবে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের অন্য দিক ছিল কঠোর। বনাঞ্চল দখল আর অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই হিমন্তবাবু কড়া সুরে বলেন, ‘অসম সরকার অবৈধ দখলদারদের বিষয়ে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি নিয়েছে। যেখান থেকে এসেছে, সেখানেই যাক। আমরা যতবার উচ্ছেদ করব, তারা যতবার ফিরে আসুক, প্রশাসন ক্লান্ত হবে না।’ তাঁর কথায় এমন দৃঢ়তা ছিল যে, উপস্থিত জনতার মধ্যে মিশে গেল শাসক হিসেবে তাঁর স্পষ্ট বার্তা— রাজ্যের বনভূমি কোনোভাবেই অবৈধভাবে দখল হতে দেওয়া হবে না। এ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘যদি কেউ বাংলাদেশ থেকে এসে থাকে, তাদের ফেরার রাস্তা খুলে দেব, কিন্তু আসার রাস্তা চিরতরে বন্ধ করে দেব।’ তিনি দাবি করেন, এ পর্যন্ত সরকার প্রায় ১ লক্ষ ৪৫ হাজার বিঘা বনভূমি দখলমুক্ত করেছে এবং আগামীতে অভিযান চলবে আরো জোরকদমে।

তবে, রাজ্যের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা কিন্তু এই উদ্যোগকে নিছক প্রশাসনিক পদক্ষেপ বলে দেখছেন না। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন সামনে রেখে, ছয়টি সম্প্রদায়ের তফসিলি জনজাতি মর্যাদার দাবি এখন অসম রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। তাই মুখ্যমন্ত্রীর এই জমি বণ্টন কর্মসূচি সেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে হিমন্তবাবু সংক্ষেপে বলেন, ‘২৫ নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করুন, এসটি মর্যাদা সংক্রান্ত আমাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।’ এছাড়াও রাভা হাসং স্বায়ত্তশাসিত পরিষদকে ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত করার দাবির বিষয়েও তিনি জানান, কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে, ডিসেম্বরেও বৈঠক হবে। তাঁর দাবি, ‘মানুষ প্রতিবাদ করে, যাতে সরকার শুনতে পায়। আমরা শুনছি, আলোচনাও চলছে।’

এ দিনের আবহে যেমন ছিল রাজনীতি, আত্মমর্যাদা, অধিকার আর ঐতিহ্যের সংরক্ষণ তেমনই ছিল সংস্কৃতির আবেশও। অনুষ্ঠানের শুরুতে মুখ্যমন্ত্রী বীরসা মুন্ডার প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করেন। তিনি বলেন, ‘বীরসা মুন্ডা শুধু ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেননি, ধর্মান্তরের বিরুদ্ধে, সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও লড়েছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, নিজের ভাষা ও বিশ্বাস টিকিয়ে রাখাই এক জনজাতির আত্মরক্ষার প্রথম শর্ত।’ মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের শিক্ষা মন্ত্রী বনজ পেগু, স্বাস্থ্য মন্ত্রী অশোক সিংহল, জলসম্পদ মন্ত্রী পীযূষ হাজরিকা, সাংসদ বিজুলি কলিতা মেধি, বিধায়ক সুমন হরিপ্রিয়া, হেমাঙ্গ ঠাকুরীয়া, নন্দিতা দাস প্রমুখ। রাভা হাসং স্বায়ত্তশাসিত পরিষদের প্রধান টংকেশ্বর রাভাও ছিলেন মঞ্চে। শেষ মুহূর্তে যখন মুখ্যমন্ত্রী মঞ্চ থেকে নামলেন, তখন উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের মধ্যে আনন্দের ঢেউ। তাঁদের চোখে জল, মুখে হাসি। কেউ বললেন, ‘এই জমি আমাদের পিতৃপুরুষের আশীর্বাদ।’ কেউ আবার আবেগে ভেসে বললেন, ‘আজ সত্যি আমরা নিজের ঘর ফিরে পেলাম।’ ছয়গাঁওয়ের এই বিকেল তাই শুধু জমি বণ্টনের অনুষ্ঠান নয়— ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান, অধিকার ফিরে পাওয়ার গর্ব, আর এক নতুন ইতিহাসের সূচনা।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!