- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ১৫, ২০২৬
অরুণাচলের টানা বৃষ্টির জেরে অসমে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, মৃত ৪। ছয় জেলায় জলবন্দি ৩৭ হাজারের বেশি মানুষ
বর্ষার শুরুতেই ভয়াবহ বন্যার কবলে অসম। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে রাজ্যের বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। সোমবার যেখানে বন্যাকবলিত মানুষের সংখ্যা ছিল ১০ হাজারেরও কম, মঙ্গলবার তা বেড়ে পৌঁছেছে ৩৭ হাজারেরও বেশি। একই সঙ্গে বেড়েছে প্রাণহানির সংখ্যাও। ‘অসম স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি’ (এএসডিএমএ)-র সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, বন্যাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪। প্রশাসনের আশঙ্কা, প্রতিবেশী অরুণাচল প্রদেশে অব্যাহত ভারী বৃষ্টির কারণে আগামী কয়েক দিনেও পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে অসমের ৬টি জেলা বানভাসি। শোণিতপুর, ডিব্রুগড়, লখিমপুর, ধেমাজি, জোরহাট ও শিবসাগর জেলার মোট ১২টি রাজস্ব চক্রের অন্তর্গত ৯৯টি গ্রাম জলমগ্ন হয়ে রয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৩৭,০৩২। এর মধ্যে সবচেয়ে বিপর্যস্ত জেলার লখিমপুর, জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৩৫,৬৯৬ জন। শোণিতপুরে ১,১৭৮ জন এবং ধেমাজিতে ১৫৮ জন বন্যা কবলিত।
মঙ্গলবার বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার পর্যন্ত ছয় জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৯,৬০০। মাত্র এক দিনের মধ্যে সে সংখ্যা প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পাওয়া প্রশাসনের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। বন্যার জলের বিস্তার, উজান থেকে নেমে আসা প্রবল জলধারাই দ্রুত অবনতির অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। প্রাণহানির ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ‘এএসডিএমএ’ সূত্রে জানা গিয়েছে, সর্বশেষ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে শোণিতপুর জেলার চরিদুয়ার রাজস্ব চক্র এলাকায়। সোমবার রাতে এক ব্যক্তি নিখোঁজ হয়ে যান। মঙ্গলবার তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। এর আগে চরাইদেও জেলায় এক জন ও ধেমাজি জেলায় দুই জনের মৃত্যু হয়েছিল। সব মিলিয়ে চলতি মরসুমে বন্যাজনিত মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চার।
বন্যার ধাক্কায় শুধু জনজীবন নয়, বিপর্যস্ত কৃষিক্ষেত্রও। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১,১০৩.৯৪ হেক্টরেরও বেশি কৃষিজমি জলের তলায় চলে গিয়েছে। ধান-সহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বহু কৃষক ইতিমধ্যেই তাঁদের মৌসুমি ফসল হারানোর মুখে। পাশাপাশি গবাদি পশুর ক্ষেত্রেও ক্ষয়ক্ষতির খবর মিলেছে। বন্যার জলে দুটি পশু ভেসে গিয়েছে, আরও ১৬,১৩৯টি পশুপাখি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। আবাসন ও পরিকাঠামোর ক্ষেত্রেও ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট। ৭২টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা ভেঙে গিয়েছে বা জলের তলায় চলে গিয়েছে। শোণিতপুর জেলার চরিদুয়ার এলাকায় জিয়াভরালি নদীর স্রোতে চারটি রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে বন্যার জলে নির্মীয়মাণ চেলেক-ধুনাগুড়ি সড়কের তিনটি অংশ ভেসে যাওয়ায় ওই অঞ্চলের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ জোরদার করেছে। রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলিতে ২০টি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র খোলা হয়েছে। প্রায় ৬,৯৮৪ জন মানুষ সেখানে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাচ্ছেন। যদিও এখনো পর্যন্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ ত্রাণশিবির চালু করা হয়নি। গত ২৪ ঘণ্টায় ‘স্টেট ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স’ (এসডিআরএফ) শোণিতপুর জেলায় উদ্ধার অভিযান চালিয়ে ১৬ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে। নৌকার সাহায্যে তাঁদের জলবন্দি এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। বন্যার পাশাপাশি নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে নদীভাঙন। চিরাং জেলার নাঙ্গালভাঙ্গা গ্রাম ও সংলগ্ন অঞ্চলে নাঙ্গাল ভাঙ্গা নদীর জলস্তর বৃদ্ধির ফলে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। একাধিক পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন।
অন্যদিকে, ‘এনএইচপিসি’-র বাঁধের গেট খোলার পর সুবনশিরি নদীর জলস্তর দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। তার ফলে মাজুলি-লখিমপুর সীমান্তবর্তী ২০টিরও বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বিস্তীর্ণ এলাকা জলের তলায় চলে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। অনেক জায়গায় নৌকাই এখন একমাত্র যাতায়াতের ভরসা।শিবসাগর জেলার জলাবদ্ধ এলাকাগুলিতে জমে থাকা জল দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য প্রশাসন কাঁচা নালা খনন এবং হিউম পাইপ বসানোর কাজ শুরু করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কিছুটা স্বস্তি দিতেই এ উদ্যোগ বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
যদিও সরকারি বুলেটিনে বলা হয়েছে যে অধিকাংশ প্রধান নদী এখনও বিপদসীমার উপরে বইছে না, তবু অরুণাচল প্রদেশে অব্যাহত ভারী বৃষ্টি পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। উজান থেকে আরও জল নামলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। সে কারণে নিচু এলাকার বহু বাসিন্দাকে ইতিমধ্যেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে রাজ্য প্রশাসন। বিভিন্ন জেলায় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে বলে দাবি হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সরকারের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অসমে বর্ষার মরসুম এখনো অনেকটাই বাকি। তার আগেই এই বন্যা পরিস্থিতি রাজ্য প্রশাসনের কাছে বড়ো চ্যালেঞ্জ। জলস্তর বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে, উজানের বৃষ্টি না কমলে আগামী দিনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।
❤ Support Us







