- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- জুলাই ১২, ২০২৫
পদের অপব্যবহার করে দুর্নীতির অভিযোগ। বাংলাদেশে গ্রেফতার বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক আবুল বারকাত
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে এক সময়ের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, দেশের প্রগতিশীল সমাজচিন্তার অন্যতম মুখ, জনতা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক, ড. আবুল বারকাতকে বৃহস্পতিবার মাঝরাতে নাটকীয় ভাবে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
অভিযোগ, অভিযোগ, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালীন, ‘ আনন্টেক্স গ্রুপ’ নামের একটি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় জড়িত ছিলেন বারকাত। ঢাকার পুলিশ সূত্রে খবর, প্রায় ২৯৭ কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুর করে তা আত্মসাতের ঘটনায় জড়িত ছিলেন তিনি। তবে অভিযোগ আরো গভীর। দুর্নীতি দমন কমিশন বলছে, অস্তিত্বহীন কারখানা, ভুয়ো জমির কাগজ, অতিরিক্ত দামে জমি ক্রয় দেখিয়ে এবং কল্পিত বাড়ির নথি দিয়ে তৈরি হয় ভুয়ো কাগজপত্র। সেসবের ভিত্তিতেই বরাদ্দ দেওয়া হয় কোটি কোটি টাকার ঋণ। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে এক সুপরিকল্পিত জালিয়াতির ছক। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলায় ৩০ জনের নাম রয়েছে, নাম রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমানেরও। রয়েছেন জনতা ব্যাংকের তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং ‘ আনন্টেক্স গ্রুপ’-এর ব্যবস্থাপনায় যুক্ত বেশ কিছু কর্মকর্তা।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার নাসিরুল ইসলাম শুক্রবার জানিয়েছেন, ‘আমরা আবুল বারকাতকে গ্রেফতার করেছি। তাঁকে দুর্নীতি দমন কমিশন কাছে হস্তান্তর করা হবে।’ এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু এখনই জানাতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। ১০ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকার ধানমন্ডি থেকে অধ্যাপক বারকাতকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, ২০-২৫ জন ব্যক্তি হঠাৎ করেই মাঝরাতে বাড়িতে ঢুকে তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে চলে যান। কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা বা অন্য কোনো কাগজ হয়নি বলে দাবি অধ্যাপকের পরিবারের।
এই ঘটনায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের নানা মহলে। বারকাতের পরিবার দাবি করেছে, তাঁদের কোনোকিছুই বিন্দুমাত্র জানানো হয়নি। আবুলের মেয়ে আরুণি বারকাত, যিনি নিজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা, বলেছেন, ‘আমরা মিডিয়ার খবরে প্রথম জানতে পারি যে বাবার নামে মামলা হয়েছে। কেউ আগে কিছু জানায়নি। তদন্ত হলে আমরা নিশ্চয়ই সহযোগিতা করতাম।’ আবেগে ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, ‘আমার বাবা ৪০ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। জীবনে শুধু মানুষের জন্য কাজ করেছেন। এমন একজন মানুষকে বিনা প্রমাণে, এভাবে গ্রেফতার করাটা অত্যন্ত দুঃখজনক।’ শুক্রবার দুপুরে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বারকাতকে হাজির করা হলে তদন্তকারীরা তাঁকে ৩ দিনের রিমান্ডে চেয়ে আবেদন করে। বারকাতের আইনজীবি রিমান্ডের বিরোধিতা করেন। শুনানি পরে হবে জানিয়ে, আপাতত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে ঢাকার বিশেষ আদালত।
উল্লেখ্য, আবুল বারকাত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে ছিলেন। ছিলেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি। অভিযোগ, তাঁর নেতৃত্বাধীন সময়ে ‘আনন্টেক্স গ্রুপ’-এর নামে হাজার কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়, যার বড়ো অংশ আর ব্যাঙ্কের কাছে ফেরত আসেনি। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, ঋণ নেওয়ার পেছনে ছিল নানা অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার। এই গ্রেফতারিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। আওয়ামী বিরোধী দলগুলির মতে, ‘শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠজনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, একাধিক গ্রেপ্তারি প্রমাণ করে, আগের সরকারের আমলে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে।’ আবার অনেকে বলছেন, ‘এই গ্রেফতার বর্তমান সরকার আইনের কীভাবে অপব্যবহার করছে তার জ্বলন্ত প্রমাণ।’ এদিকে, এই ঘটনার সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘটে চলা নানা ঘটনাকে জুড়ে দেখছেন কিছু বিশ্লেষক। গত ২৮ জুন ঢাকার প্রেস ক্লাবের সামনে একাধিক সংখ্যালঘু সংগঠনের উদ্যোগে বিক্ষোভ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বক্তারা বলেন, ‘১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ একটি অসাম্প্রদায়িক, মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। আজ সেই স্বপ্ন বিপন্ন।’ তাঁরা অভিযোগ করেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সুযোগ নিয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তি সংখ্যালঘুদের উপর হামলা চালাচ্ছে, মামলা দিচ্ছে, উপাসনালয় ভাঙচুর করছে।’ বক্তারা এই প্রেক্ষাপটে সকল প্রগতিশীল শক্তিকে একজোট হওয়ার ডাক দেন। সে সভায় বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক আবুল বারকাত, ড.ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের তীব্র সমালোচনায় মুখর ছিলেন সেদিন তিনি, তার জেরেই কি তড়িঘড়ি গ্রেফতার হতে হলো তাকে, প্রশ্ন উঠছে।
❤ Support Us






