Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • এপ্রিল ৩০, ২০২৫

বাংলাদেশে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় অবশেষে জামিন পেলেন সন্নাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাস

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বাংলাদেশে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় অবশেষে জামিন পেলেন সন্নাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাস

বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেফতার হওয়া বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র এবং পুণ্ডরীক ধামের অধ্যক্ষ চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে অবশেষে জামিন দিয়েছে বাংলাদেশের হাইকোর্ট। গ্রেফতারের ৫ মাস পর জামিন পেয়েছেন তিনি। গত ২৫ নভেম্বর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। মুহাম্মদ ইউনূসের দেশে সংখ্যালঘু সন্নাসীর গ্রেফতারিতে গর্জে উঠেছিল ভারত। আজ বাংলাদেশ হাইকোর্টের বিচারপতি মো. আতোয়ার রহমান ও বিচারপতি মো. আলী রেজার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন।

গত বছরের ২৫ অক্টোবর, চট্টগ্রামে চিন্ময়কৃষ্ণ দাস নেতৃত্বে বিশাল এক ধর্মীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবেশে নানা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইস্যুতে বক্তব্য রাখেন তিনি। তাঁর বক্তৃতা ও কার্যক্রম নিয়ে বাংলাদেশ জুড়ে প্রবল বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এরপর, ৩১ অক্টোবর, তার বিরুদ্ধে জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় আরো ১৮ জনকে আসামি করা হয়। এই মামলার অভিযোগ ছিল, ওই সমাবেশে জাতীয় পতাকা অবমাননা করা হয়েছে, যা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। এরপর, ২২ নভেম্বর, ২০২৪-এ বাংলাদেশের রাজধানীর অদূরে রংপুরে, চিন্ময়ের নেতৃত্বে আরো একটি বৃহৎ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবেশের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় তার বিরুদ্ধে আরও তদন্ত শুরু হয়। ২৫ নভেম্বর, চিন্ময়কৃষ্ণ দাসকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর, ২৬ নভেম্বর, জামিনের আবেদন করা হলেও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তা নামঞ্জুর করেন এবং চিন্ময়কে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরপর লাগাতারভাবে তাঁর জামিনের জন্য আবেদন করা হলেও তা নামঞ্জুর হয়ে আসছিল। শুনানির নির্ধারিত দিনে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর পক্ষে আইনজীবীরা আদালতে উপস্থিত হতে পারেননি। তাদের অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ভয়ভীতি ও হুমকির অভিযোগ। অভিযোগ, চিন্ময়ের আইনজীবীদের বিভিন্নভাবে বাধা দেওয়া হয়েছিল, যাতে তারা আদালতে সঠিকভাবে তাঁর পক্ষে সওয়াল করতে না পারেন। জামিন আবেদন নাকচ হওয়ার পর চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, যা দ্রুতই সহিংসতায় রূপ নেয়। সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন কয়েকজন এবং এক ব্যক্তির মৃত্যুর অভিযোগও ওঠে—যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে।

সর্বশেষ, ৪ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট জামিন প্রশ্নে রুল জারি করেছিল, যাতে বলা হয়, চিন্ময়কে কেন জামিন দেওয়া হবে না, তা জানাতে হবে। এই সংক্রান্ত শুনানি হওয়ার কথা ছিল ২৩ এপ্রিল। কিন্তু সে দিন আদালত জানায়, ৩০ এপ্রিল শুনানি হবে। এই রুলের ওপর শুনানিতে আজ হাইকোর্ট চিন্ময়ের জামিন মঞ্জুর করেন। চিন্ময়ের গ্রেপ্তারি ও জামিন না দেওয়া নিয়ে সরব হয় নয়াদিল্লি। কলকাতা, মুম্বই, পুণে সহ দেশব্যাপী সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিনের দাবিতে প্রতিবাদ মিছিল আর বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশে চট্টগ্রামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আর চিন্ময়ের অনুসারীদের মধ্যে একাধিক সংঘর্ষ হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। ৫ মাসেরও বেশি সময় কারাগারে থাকার পর, অবশেষে তাঁর জামিন মঞ্জুর হয়। তাঁর অনুসারীরা সামাজিক মাধ্যমে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় আনন্দ ও আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এদিন, হাইকোর্টে শুনানির সময় উভয় পক্ষের আইনজীবীরা তাদের যুক্তি উপস্থাপন করেন। চিন্ময়ের পক্ষে আইনজীবী অপূর্ব কুমার ভট্টাচার্য এবং প্রবীর রঞ্জন হালদার জামিনের পক্ষে সওয়াল করেন, অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনিক আর হক ও মুহাম্মদ আবদুল জব্বার ভুঞা জামিন না দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেন। তবে শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন মঞ্জুর করে।

উল্লেখ্য, গত বছর বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। ব্যাপক গণআন্দোলনের জেরে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতা হারায় এবং পরে তিনি দেশত্যাগ করেন। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, যা বর্তমানে বাংলাদেশ পরিচালনা করছে। সরকার পরিবর্তনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন ও হয়রানি আরো বাড়ার অভিযোগ উঠেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। এরকম সময়ে, ইস্কন সন্নাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেপ্তারি, জামিনের আবেদন খারিজ হওয়া নতুন করে উদ্বেগ ও ক্ষোভের পরিবেশ সৃষ্টি করে। চিন্ময়ের মুক্তির দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে ওঠে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষ মিছিল, মানববন্ধন ও গণস্বাক্ষর কর্মসূচি আয়োজন করেন। বাংলাদেশের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক স্তরেও বিতর্কের সৃষ্টি করে। ভারতেও এই ইস্যুতে পড়শি দেশকে কড়া বার্তা দেয়। প্রতিবাদকারীরা দাবি করেন, চিন্ময়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে করা হয়েছে। চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের মামলায় বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা, রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনার সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করেন, এই ধরনের মামলার মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিরোধিতা করার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। অন্যদিকে, কিছু রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা মামলাটিকে দেশীয় নিরাপত্তা আর জাতীয় সম্মান রক্ষার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে আজকের রায়, বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে বর্তমান বাস্তবতা আর সংকটকে গভীরভাবে প্রতিফলিত করে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!