- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- জুলাই ২৯, ২০২৫
চাঁদা-জুলুমে টালমাটাল ‘বৈষম্য বিরোধী’ আন্দোলনের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি, ছাত্র-নেতাদের গ্রেফতারি ঘিরে উত্তাল বাংলাদেশ
বাংলাদেশের রাজপথে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর উত্থান ছিল বিস্ময়কর। অথচ বছর কাটতে না কাটতেই সে আন্দোলন কঠিন প্রশ্নের মুখে। শুদ্ধিকরণ শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছাঁটাই করেছে নিজেদের প্রায় সব শাখা সংগঠন। চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত ‘সমন্বয়ক’দের গ্রেপ্তারে ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ জুড়ে নানা মহল।
গত শনিবার রাতে ঢাকার অভিজাত গুলশান এলাকায় প্রাক্তন সাংসদ শাম্মী আহমেদের বাড়িতে চাঁদা দাবি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে ৫ জন। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঢাকা নগর কমিটির আহ্বায়ক ইব্রাহিম হোসেন মুন্না, সদস্য সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব এবং বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের নেতা আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ। অভিযোগ, তাঁরা ৫০ লক্ষ টাকা দাবি করেন, যার মধ্যে ১০ লক্ষ টাকা আগে আদায়ও করে নেন। এরপরই গোপনে পুলিশে খবর দেন শাম্মী আহমেদ। পুলিশের হানায় ধরা পড়ে অভিযুক্তেরা। ধৃতদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও হুমকির মামলা দায়ের করে আদালতে তোলা হলে ৭ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশের আদালত। এ ঘটনার পর রাতেই অভিযুক্তদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। তা সত্ত্বেও বিতর্কের আগুন দাবানলের মতোই ছড়িয়েছে দেশজুড়ে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দলের বর্তমান সভাপতি রিফাত রশিদ রোববার সন্ধ্যায় ঘোষণা করেছেন, দুর্নীতির অভিযোগে সমস্ত শাখা কমিটি বাতিল করা হচ্ছে। শুধু কেন্দ্রীয় কমিটি থাকছে। তিনি বলেছেন, ‘এ সিদ্ধান্ত কঠিন হলেও, সময়ের দাবি। এটাই আমাদের রাজনৈতিক সততার প্রমাণ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সংগঠন প্রকাশ্যে অপরাধ স্বীকার করে এত বড়ো পদক্ষেপ নিয়েছে।’ তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে প্রবল ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। আন্দোলনের প্রাক্তন নেত্রী উমামা ফাতেমা ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এই প্রথম ধরা পড়েছে ঠিকই, কিন্তু এদের আসল চরিত্র অনেক দিন ধরেই আমরা জানি। প্রশাসনের বদলি, পদোন্নতি, টেন্ডার, সবেতেই দাপট দেখিয়েছে এরা। আর তাঁদের রক্ষা করেছে দলের বড়ো নেতারা।’ তাঁর অভিযোগ, ‘আমি দলের মুখপাত্র হওয়ার পর দেখতে পাই, অনেকেই আন্দোলনের নামে ব্যবসা করছে। সংগ্রামের প্ল্যাটফর্মকে ‘টাকা কামানোর মেশিন’-এ পরিণত করেছে।’
চাঁদাবাজির ঘটনায় মূল অভিযুক্ত আবদুর রাজ্জাক সম্পর্কে বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছেন এনসিপি-র যুগ্ম সদস্যসচিব মাহিন সরকার। তিনি বলেছেন, ‘আবদুর রাজ্জাক ইউনূস সরকারের পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য। এমন একজন ব্যক্তি ছাত্র রাজনীতির ছায়ায় অর্থ রোজগারের খেলায় মত্ত হয়ে উঠেছিল।’ এই প্রথম নয়, গত এক বছরে বারবার ঢাকার উত্তরা, গুলশান-সহ একাধিক বর্ধিষ্ণু এলাকায় ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’ নেতাদের বিরুদ্ধে লাগাতার চাঁদাবাজি ও দখলদারি অভিযোগ উঠছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, ‘এসএম প্লাজা এলাকায় চাঁদাবাজির অফিস খুলে বসেছে কিছু লোক। এদের পেছনে আছে জাতীয় রাজনীতির কর্তামুণ্ডরা।’ বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সোমবার শাহবাগে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘যে তরুণদের ঘিরে আমরা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, তারাই আজ চাঁদাবাজির অভিযোগে ধরা পড়ছে! এক বছরেই এমন ভরাডুবি হবে, ভাবিনি।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের পর যারা হাসিনাকে দেশছাড়া করল, সেসব উজ্জ্বল তরুণদের মধ্যেই কি আবার নতুন ফ্যাসিস্ট তৈরি হচ্ছে?’ ফখরুলের আশঙ্কা, ‘দেশকে নতুন করে গড়ার সুযোগ ছিল, অথচ দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকেই ফিরিয়ে আনার রাস্তা তৈরি হচ্ছে।’ পাশাপাশি তিনি বলেন, ‘বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব তারেক রহমান চেষ্টা করছেন দেশকে নতুন করে গড়তে। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে সে আশাও দুরাশা হয়ে দাঁড়াবে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা একটি মঞ্চ যেভাবে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি আর দলীয় ছত্রছায়ায় অপরাধে জড়িয়েছে, তা গোটা রাজনৈতিক পরিকাঠামোকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। রাজনৈতিক অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক মনে করেন, ‘শুধু কমিটি ভেঙে দিলে কিছু হবে না। আইনগত ব্যবস্থা না নিলে রাজনৈতিক পরিচয়কে হাতিয়ার করে অপরাধ বাড়বে, বাড়তেই থাকবে।’
❤ Support Us






