Advertisement
  • দে । শ
  • জুলাই ৯, ২০২২

বেসামাল বন্যায় বিধ্বস্ত বরাক। খণ্ডচিত্রে গ্রাম-শহরের ক্ষতচিহ্ন ।

বাহার উদ্দিন
বেসামাল বন্যায় বিধ্বস্ত বরাক। খণ্ডচিত্রে গ্রাম-শহরের ক্ষতচিহ্ন ।

বন্যায় বরাক উপত্যকা এবার বিধ্বস্ত হয়ে গেল। ১৯২৭ সালের পর এরকম ভয়াবহ বিপর্যয় আর দেখা যায়নি। শহরে জল, গ্রামের পর গ্রাম জলের তলায় আটকে রইল। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা তিনবার আকাশপথে উড়তে উড়তে বানের তাণ্ডব দেখে গেছেন । বহু জায়গায় ত্রাণ পৌঁছেছে, বহু এলাকায় সরকারি, বেসরকারি উদ্যোগে সংগৃহীত খাদ্য বস্তু পৌঁছয়নি। ত্রাণ বন্টনকে ঘিরে পক্ষপাত আর বিভাজনের অভিযোগ উঠছে। বরাকের দুর্ভাগ্য, কোনো ইস্যুতেই স্থানীয় মানুষ এক হতে পারেন না।

ভোট, না-ভোট পীড়িত মাতৃভাষা—এরকম হরেক ঘটনা আর সমস্যাকে খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে মানুষ বিচার করতে পারে না। একই ধারা ১৯৪৭ থেকে চলছে। দেশভাগ, গণভোটের রায়ে পূর্ববঙ্গের সঙ্গে শ্রীহট্টের অন্তর্ভুক্তি বরাকের তিন জেলার বিচ্ছিন্নতা সাম্প্রদায়িক বুদ্ধিহীনতাকে অধিকতর জটিল করে তোলে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বিশেষ করে বন্যা রোধের প্রক্রিয়াও পথ হারায়। প্রায় প্রতিবছর বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল, হাওর, বিল তাৎক্ষণিকের হামলায় থই থই, অগভীর সমুদ্রের চেহারা নেয়।

এবছর বন্যার প্রকোপে শিলচরের মতো উঁচু শহর, সীমান্তবর্তী করিমগঞ্জ, বদরপুর প্রভৃতি শহর অপ্রতিরোধ্য স্রোতে বানবন্দী হয়ে পড়ে। বরাক উপত্যকা নদীমাতৃক, পাহাড়ময় এলাকা। অনেকটা কাশ্মীরের মতো তার অবস্থান। লুসাই পাহাড়, হিমালয়ের পর্বতশ্রেণী বড়াইল-মাঝখানে ছোট ছোট পাহাড়ের কোলে-পিঠে বিশাল থলের মতো ছড়িয়ে আছে সমতল। বর্ষায় জল, প্রবল বেগ হাকিয়ে মিজোরাম, মনিপুর, নাগাল্যান্ড মেঘালয়ের পাহাড়ি ভূখণ্ড থেকে সমতলে নেমেই প্রথমে হামলা চালায় উপত্যকার এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায়। জলের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শিথিল। সেকেলে আর জঘন্য দুর্নীতিতে অবরুদ্ধ শিকার । বন্যা একই সঙ্গে লাগোয়া সিলেটেও উপচে পড়ে দুদেশের সীমান্তকে মুছে দেয়।

১৯২৯ সালের বন্যায় আসামের শিলচর এবং জানিগঞ্জ বাজার । চিত্র সৌজন্য: কালীপ্রসন্ন ভট্টাচার্যের, শিলচড়ের কড়চা

এবার ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের পরিস্থিতির প্রত্যাবর্তন ঘটল তুলনাহীন। শিলচরও করিমগঞ্জ পুরোপুরি জলমগ্ন হয়ে পড়ল। বাঁধভাঙা স্রোতের তোড়ে মানুষ, গবাদি পশু, বন্য পশুর অবস্থানের তফাত রইল না। সব অঞ্চলের ছবিতে ক্যামেরা ঢুকতে পারে নি। রাস্তাঘাট সপ্তাহের পর সপ্তাহ জুড়ে কিনারাহীন নদী হয়ে গেল। ওপর থেকে প্রবল বর্ষণ, নীচে রাশি রাশি জলের অট্টহাসিতে চাপা পড়ে গেল বানভাসীদের আর্তনাদ। মানুষ মরল, গবাদি পশু মরল, শস্যক্ষেত ডুবল, জঙ্গল ডুবল। একসময় ভয়ঙ্করের আক্রোশ সরিয়ে উঠল ভাগ্যহত বরাকবাসীর দুর্দশার ক্ষতচিহ্ন। জলীয় তান্ডব আর স্রোতের ধ্বংস লীলার এই দুঃস্বপ্ন, এই দুর্বিসহ দিন যাপন বরাকবাসী সহজে ভুলবে বলে মনে হয় না। ১৩৩৬-র বন্যার মতো, এবারের জনস্রোত জনস্রুতির উৎস হয়ে থাকবে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!