Advertisement
  • খাস-কলম পা | র্স | পে | ক্টি | ভ
  • এপ্রিল ১৫, ২০২৩

জ্বলে ওঠো অবিভাজ্য আগুন, ভস্ম হোক সাপের খোলস

দ্বৈত পরিচিতি বা সংশয় নিয়ে নয়, বাঙালি অদ্বৈত হয়েই বাঁচতে চায়, জয় করতে চায় সবরকমের ক্ষুদ্রতাকে। বিভাজকের সমূহ চক্রান্তকে। এখানে সে অনন্য। অদ্বিতীয় তার মনোভঙ্গি আর ভাষা।

বাহার উদ্দিন
জ্বলে ওঠো অবিভাজ্য আগুন, ভস্ম হোক সাপের খোলস

বৈশাখি অনুভূতির তীব্রতা বাড়ছে।  বাড়ছে তাকে অনুশাসনের আওতায় নিয়ে এসে গৃহবন্দী করবার কৌশলও, যা কখনো রাষ্ট্রের, কখনো শাসকের, কখনো  বা তাদেরই ইঙ্গিতে গড়ে ওঠা আগাছাদের। এরকম বদ ফিকির দিয়ে কি রোখা গেছে, রুখতে পারে কৃষিভিত্তিক জনপদ আর  ফসল তোলার চিরকালীন প্রতীকি মহোৎসবকে ? মিশর থেকে ইরান, অবিভক্ত পাঞ্জাব থেকে নদীমাতৃক বঙ্গীয় সমতট, অসম, পার্বত্য অরুণাচলে যুগ যুগ জুড়ে নানা ভঙ্গিমায়, শস্যময়তার বিশুদ্ধ মুহুর্ত–উর্বরতা আর তারুণ্যের রূপ ধারণ করে গণভাব জাগিয়ে ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম-শহরে, নদীতটে, চড়াই উৎরাই সমপটে। এর সঙ্গে ধর্মযোগ আনুষ্ঠানিক অনুষঙ্গ মাত্র। তার আচারে, উপাচারের বাহুল্য ক্ষণস্থায়ী, যা ক্রমশ বদলায় কিন্তু বদলাতে পারে না মূল উপলক্ষ্যের অভিমুখ, যার অন্য নাম বিশ্ব মানব হয়ে ওঠার সাধনা কিংবা উৎসবের মর্মছোঁওয়া বিশ্বাস। পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসে, রাষ্ট্র আর  শাসকের সংশয় ও সন্দেহ বাঙালির উৎসবময়তাকে বার বার বিভ্রান্ত করতে চেয়েছে। ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থতার চিত্রে তার সমঝোতা রচনার চেষ্টাও কম নয়। এরকম রচনাকে সমাজের বিবেক আর বুদ্ধি বলেছে মিশ্র ফসল, মিশ্র সংস্কৃতি। মিশ্রের ভেতরে  আর বাইরে  যে তরঙ্গ ছড়িয়ে আছে, যা সুপ্ত, আবার ঘা পেলেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সমূহ অস্তিত্ব–সে অভ্যাসে কোনো বদল নেই। তাকে ক্ষমতামত্ত অথবা মূঢ় শক্তি যখন কক্ষচ্যুত করার চেষ্টা করেছে ভয়ে কিংবা প্ররোচিত হয়ে, রেহাই পায়নি সে, ভাবাবেগ আর সমবেত চেতনার উপর্যুপরি আঘাতে, প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়ায় জঞ্জালে মুখ লুকোতে বাধ্য হয়েছে ।

পয়লা বৈশাখের নানারকম ক্রিয়াকর্মকে ঘিরেও নির্বোধের পরাজয় আমরা দেখেছি। তাদের আরো বড়ো কলঙ্কিত গ্লানি হয়তো সামনে। অব্যাহতি নেই। বাঙালির চিরায়ত সংজ্ঞা আর ইহজাগতিক শুভবুদ্ধির সম্মুখে আগন্তুক রাজনীতির বিদ্বেষের হিসেব-নিকেষের বিলকুল প্রশ্রয় নেই। সমগোত্রীয়তাবোধে একনিষ্ঠ জাতির বিশ্ব মানব হয়ে উঠবার চেষ্টায় কোথাও বিরতি নেই। সে অক্লান্ত। তৃপ্তিবোধে আক্রান্ত নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রুগ্ন হলেও চিত্ত সম্পদে ভরাট তার ভাণ্ডার। এটা তার বেঁচে থাকার আরেক স্বাস্থ্যময় লক্ষণ।

দ্বৈত পরিচিতি বা সংশয় নিয়ে নয়, বাঙালি অদ্বৈত হয়েই বাঁচতে চায়, জয় করতে চায় সবরকমের ক্ষুদ্রতাকে। বিভাজকের সমূহ চক্রান্তকে। এখানে সে অনন্য। অদ্বিতীয় তার মনোভঙ্গি, শারীরিক ভাষাও। পয়লা বৈশাখকে ঘিরেও সত্য, চিরসত্য তার ব্যবহারিক বাস্তব, একইভাবে সীমান্তহীন তার  বিশ্বাস ও আত্মবিশ্বাসের অবিভাজ্য আগুন। এর দুটি উদাহরণ। এক, নববর্ষ কাছে এলেই উজবুক প্রশ্ন উঠতে থাকে, বঙ্গাব্দ বা বর্ষবরণের উৎস কী ? কোন কালে তার আরম্ভ ? আমাদের উত্তর একটাই,  কৃষিজীবী, ব্যবসাজীবী মানুষই এই মহৎপর্বের প্রথম কারিগর এবং মহাকালের গর্ভেই তার জন্ম। তার উদ্ভাবক সেকালের অশোক, বল্লাল সেন, গঙ্গারিডির মহানায়ক কিংবা আকবর যে কেউ হতে পারেন।  তাতে কিস্‌সু যায় আসে না, নবান্ন ঘেঁষা পার্বণ ও পর্ব  যেমন অতীতের,  তেমনি একালের। মোদ্দা কথা নিঃসময়ের।

সম্প্রতি বাংলাদেশে, নববর্ষকে রুখতে একধরনের  বেয়াদব নৃত্য  দেখা গেল। আমাদের সবার সৌভাগ্য, অমঙ্গলের চক্রান্তের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে  ইতিহাস ছোঁওয়া শাহবাগের প্রদীপ্ত প্রজন্ম। গুজব আর হুমকিকে নস্যাৎ করে ঢাকা আর বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর মেতে উঠেছে  সমবেত বর্ষবরণে।

তবে, অতীতের অভিজ্ঞতা যেহেতু  বড্ড তিক্ত। সাম্প্রতিক হালচালও অতিশয় দুর্বিনীত। তাই  যে কোনো আশঙ্কার মোকাবিলায় বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ আর ছাত্রজনতা ঐক্যবদ্ধ । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর চারুকলা পর্ষদের অঙ্গনে বিচিত্র ভঙ্গির আলপনার জাগৃতি বাঙালির ঘোষিত অঙ্গীকারকেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, বার বার। অঙ্গীকারটি কেবল বাংলাদেশের নয়, তার চেহারা বহুমুখী এবং অখণ্ড বাঙালির,  যেমন তার আবহমান ঐতিহ্যের, তেমনি আধুনিক লেবাস আর মননের।

বিদেশি বহু সমাজবিজ্ঞানী একাধিকবার বলেছেন, বাংলাদেশকে জানতে হলে নববর্ষের ঢাকা আর একুশে ফেব্রুয়ারির মধ্যরাতের সঙ্গী হতে হবে। বিশ্বের সমস্ত লোকায়ত পার্বণের শীর্ষে বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠানের অবস্থান সমাজতত্ত্ব আর লৌকিক চালচিত্রের উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। এই চালচিত্রকে এবার আরো ছড়িয়ে দেওয়ার দাঢ্য অঙ্গীকার ঘোষণা করে নব প্রজন্ম।

বাংলাদেশ ছাড়াও, বৈশাখি মহাপর্ব –সামাজিক উৎসব চেতনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে এবার। আসামের বিহু আর পাঞ্জাবের বৈশাখি যেন বহু অঙ্গে , বহু রঙ্গে সেজে উঠেছে। যেসব বিভাজক বহুত্ব আর বৈচিত্র্যের সংস্কৃতিকে রুখতে চায় নানা কায়দায়, নানা অছিলায়, তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিষ্পর্ধা জাগিয়ে তুলছে সামাজিক ঐক্য। একথা বাংলাদেশে, পশ্চিমবঙ্গে আরো বেশি সত্য। এই সত্যের মোকাবিলায় কবন্ধ,অন্ধ, মূঢ় ও উগ্ররা বর্ষবরণের প্রাক্কালে যে ষড়যন্ত্র আর উস্কানিমূলক হুমকি দিচ্ছিল, তা সম্ভবত আপাতত থমকে গিয়ে ভেস্তে গেল বিষক্রিয়া ছড়িয়ে দেওয়ার ভৌতিক মহড়া।

ঢাকায় এই ধরনের হুমকি নতুন নয়। আশির দশকের গোড়ার দিকে এরশাদের আমলে সমবেত আলপনার  নকশা তৈরিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল সরকার। বাংলাদেশ আমল দেয়নি। আত্মবিশ্বাস আর ভাবাবেগের সমস্ত শানিত শক্তি নিয়ে রাস্তায় বসে আলপনা এঁকেছেন ছাত্র ও শিক্ষকরা। তখন থেকে শুভ নববর্ষ আরো তেজিয়ান হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে নগরজীবন আর লোকজীবনের ঐক্যিক চেহারায় জাতীয় সংকল্প ঘোষণা করে বাংলাদেশ। সে সংকল্পের জমি বেড়েছে, শক্তি বেড়েছে, বেড়েছে তার সমাবেশও।  সম্প্রতি মঙ্গলবোধের বর্ণময় শোভাযাত্রা রুখতে যে হুমকি দিয়েছিল অদৃশ্য নির্বোধ, তাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বাঙালির বৌদ্ধিক আর  আবেগতাড়িত তারুণ্য এবং বাড়িয়ে দিল বৈশাখের সমারোহে মিছিলের, সদর্থক কৌতূকের মহিমা।

জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম নিহিত শক্তি তার ভাবাবেগ, তার ঘোষিত আর স্বপ্নজারিত অঙ্গীকার। নদীমাতৃক আর কৃষিভিত্তিক দেশের রাজনৈতিক সংজ্ঞায়নে, লক্ষ্যের অভিমুখে লোকায়ত পর্বকে যে অশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা তার কেবল সুপরিকল্পিত, পরিপূর্ণ বাঙালিয়ানা অর্জনেরই নয়, তার বিশ্বমানব হয়ে ওঠার সাধনাকেও নিরন্তর খোরাক জোগাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও একথা সমানভাবে সত্য। বর্ষবরণ নিছক কোনো পার্বণ নয়, লৌকিক ও নাগরিক সংস্কৃতির যৌথ আর মহামানবিক  অনুশীলন। তাই আহারে, বিহারে, ধমনীর তরঙ্গে বেজে ওঠে– এসো হে, বৈশাখ। এসো, এসো। প্রসঙ্গত, আর একটি কথা, পয়লা বৈশাখকে কি বাঙালির জাতীয় উৎসব ভাবতে পারি না আমরা ? এরকম দাবি কেন উচ্চারিত হয় না ? দাবিটি ভেবে দেখা দরকার।


❤ Support Us
error: Content is protected !!