- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- আগস্ট ৫, ২০২৬
দুর্নীতি-প্রশ্নফাঁস, দেশজুড়ে তরুণদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ ! ঝাড়খণ্ডে নিয়োগব্যবস্থার আমূল সংস্কার চেয়ে চাকরিপ্রার্থীদের তীব্র আন্দোলন
সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশ রক্ষা, পরীক্ষা দুর্নীতি, কর্মসংস্থান-সহ একাধিক প্রশ্নে একের পর বিক্ষোভ, আন্দোলনের সাক্ষী থাকছে দেশ। সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লিতে ‘নিট’ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সরকার ও সিস্টেমবিরোধী ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশের মাত্রা বেড়েছে কয়েকগুণ। যন্ত্রর মন্ত্ররে ধারাবাহিক আন্দোলনের চাপে প্রথমবারের জন্য পদ থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হয়েছেন মোদি ক্যাবিনেটের কোনো মন্ত্রী। কিন্তু তাতেই যে নতুন প্রজন্মের রাস্তার লড়াইয়ের সমাপ্তি ঘটছে না তাও ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। দিল্লি, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, উত্তরাখণ্ড-র পর এবার পরীক্ষায় দুর্নীতি, প্রশ্নফাঁস, নিয়োগে ইচ্ছাকৃত দেরি সহ বহু বিষয় সামনে এনে লড়াইয়ের ময়দানে ঝাড়খণ্ডের চাকরিপ্রার্থী ও ছাত্ররা।
চাপে পড়ে কোনো একটি পরীক্ষা বাতিল করলে, বা কেউ ইস্তফা দিলে সমস্যার সমাধান হবে না, এমনই মত ঝাড়খণ্ডের আন্দোলনরত চাকরিপ্রার্থীদের। তাঁদের দাবি, বছরের পর বছর ধরে প্রশ্নফাঁস, নিয়োগে অনিয়ম, ফলপ্রকাশে বিলম্ব এবং দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত যে নিয়োগ ব্যবস্থা, সেটির আমূল সংস্কার না হলে একই দুর্ভোগ ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে। তাই ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশন-এর সিজিএল-সহ বিতর্কিত সমস্ত নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছ তদন্ত এবং সংস্কারের দাবিতেই তাঁরা রাস্তায় নেমেছেন। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, প্রতিবার বিতর্কের পরে সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এসেছে, কোচিং সেন্টারের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু চাকরিপ্রার্থীদের বাস্তব পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। বছরের পর বছর প্রস্তুতি, তারপর প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ, পরীক্ষা বাতিল, আবার নতুন করে প্রস্তুতি— অন্তহীন চক্রে আটকে গিয়ে বহু তরুণ-তরুণীর কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়েছে। তাঁদের মতে, এ শুধু একটি পরীক্ষার সংকট নয়; গোটা প্রজন্মের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
সাম্প্রতিক সময়ে নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে দেশজুড়ে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি তুলেছিল, সে ঘটনাও ঝাড়খণ্ডের আন্দোলনকারীদের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে সোনম ওয়াংচুকের দীর্ঘ অনশন, পরে কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি মেনে নেওয়ার ঘটনাকেও তাঁরা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন। তাঁদের বক্তব্য, প্রশ্নফাঁস ও নিয়োগ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক গণআন্দোলনই শেষ পর্যন্ত সরকারকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করতে পারে। আন্দোলনকারীদের দাবি, তাঁরা শুধু একটি পরীক্ষার পুনর্মূল্যায়ন চান না। তাঁরা চান এমন একটি নিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যেখানে একজন পরীক্ষার্থী নিশ্চিতভাবে জানতে পারবেন— তিনি নিজের অযোগ্যতার কারণে পিছিয়ে পড়েছেন, না কি অন্য কারও দুর্নীতি ও প্রতারণার শিকার হয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ন্যূনতম বিশ্বাসও ভেঙে পড়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
গত কয়েক দিন ধরে রাঁচির জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়ামে চাকরিপ্রার্থী ও ছাত্রছাত্রীদের অবস্থান-বিক্ষোভ চলছিল। আন্দোলনেরই অন্যতম মুখ ৩৩ বছরের দেবেন্দ্র নাথ মাহাতো। ১৪তম জেপিএসসি সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষা, জেএসএসসি সিজিএল-সহ একাধিক নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেছিলেন। তাঁর দাবি, গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ তদন্ত, কমিশনের সংস্কার, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। দেবেন্দ্র নাথ মাহাতোর দাবি, ‘আমাদের এত বছরের পরিশ্রম, ত্যাগ আর লড়াই যেন বৃথা না যায়। সরকার যোগ্যতার মর্যাদা দিক, স্বচ্ছ নিয়োগ নিশ্চিত করুক। আমাদের দাবি এর বেশি কিছু নয়।’ তাঁরা টানা অনশন, দ্রুত অবনতিশীল শারীরিক অবস্থার মধ্যেই বুধবার সোনম ওয়াংচুকের বিশেষ বার্তা আসে। সে অনুরোধ অগ্রাহ্য করতে পারেননি ছাত্রনেতা মাহাতো। অনশনের চতুর্থ দিনে তিনি জল ও নুন গ্রহণ করছেন বলে জানা যাচ্ছে। তবে আন্দোলন থেকে একচুলও যে তিনি সরেননি তা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। তাঁর দৃঢ় বক্তব্য, রাজ্য সরকার দাবি না মানা পর্যন্ত অন্নগ্রহণ করবেন না। ফলে জেপিএসসি এবং জেএসএসসি-র নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে যে ক্ষোভ ইতিমধ্যেই রাজ্য জুড়ে ছড়িয়েছে, তা আরও বৃহত্তর মাত্রা পেয়েছে।
সোনম ওয়াংচুককে রাঁচিতে এসে আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ানোর আবেদনও জানান মাহাতো। তিনি বলেন, যেভাবে দিল্লির যন্তর মন্তরে ছাত্র আন্দোলনের সময় ওয়াংচুক সরাসরি উপস্থিত ছিলেন, ঠিক তেমনই ঝাড়খণ্ডের আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। মাহাতোর দাবি, ওয়াংচুক আশ্বাস দিয়েছেন, আন্দোলন সফল না হওয়া পর্যন্ত তিনি ছাত্রদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবেন, নৈতিক সমর্থন অব্যাহত রাখবেন। সেই প্রতিশ্রুতির পরই তিনি জল গ্রহণে রাজি হন। আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেও। দিল্লির যন্তর মন্তরে নিট প্রশ্নফাঁস-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখ হিসেবে পরিচিত দীপকে জানান, ঝাড়খণ্ডের ছাত্র আন্দোলনের প্রতি তাঁদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।
রাঁচির আন্দোলনস্থলে এই মুহূর্তে একসঙ্গে একাধিক সংগঠন সক্রিয়। দেবেন্দ্র নাথ মাহাতো ঝাড়খণ্ড লোকতান্ত্রিক ক্রান্তিকারী মোর্চা-র ব্যানারে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অন্যদিকে, জেপিএসসি-জেএসএসসি সংস্কার মঞ্চের উদ্যোগে আরও পাঁচ জন, যাঁদের মধ্যে দুই জন মহিলা, মঙ্গলবার রাত থেকে অনির্দিষ্টকালের অনশনে বসেছেন। ফলে অনশনকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয়। ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা আন্দোলনকারীদের অধিকাংশই মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। কেউ বহু বছর ধরে পরীক্ষার ফলের অপেক্ষায় রয়েছেন, কেউ আবার নতুন করে প্রস্তুতি শুরু করবেন কি না, সেই সিদ্ধান্তই নিতে পারছেন না। অনিশ্চয়তার এ চক্র তাঁদের জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ কেড়ে নিয়েছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া এক যুবকের কথায়, ‘আমরা শুধু কয়লাখনিতে কাজ করার জন্য জন্মাইনি। আমরাও পড়াশোনা করি, স্বপ্ন দেখি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঝাড়খণ্ডের তরুণদের ভাগ্যে কি শুধু খনি শ্রমিকের জীবনই লেখা থাকবে? উন্নয়নের সুযোগ আমাদের কেন মিলবে না?’
এই ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের সিজিএল পরীক্ষা। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, কখনো পরীক্ষা আয়োজন, কখনো ফল প্রকাশ, আবার কখনো অনিয়মের অভিযোগে পরীক্ষা বাতিল— বছরের পর বছর একই বিতর্ক ঘুরে ফিরে এসেছে। ফলে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে কমিশনের ওপর আস্থা ক্রমশ কমে গিয়েছে। একই সঙ্গে টিডিপিএল সংস্থা এবং অভিযুক্ত অভয় তিওয়ারিকে ঘিরেও একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের অভিযোগ, ব্লক সাপ্লাই অফিসার নিয়োগে অভয় তিওয়ারি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন। পরে একই ব্যক্তি পিজিটি পরীক্ষাতেও প্রথম হন বলে দাবি করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, একই পরিবারের একাধিক সদস্যের ধারাবাহিক সাফল্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একটি পরিবারের পাঁচ সদস্যের একই পরীক্ষায় সফল হওয়া স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের। পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত সিবিআই অথবা রাজ্যের বাইরের অবসরপ্রাপ্ত হাই কোর্টের বিচারপতিদের নিয়ে গঠিত একটি স্বাধীন কমিটির হাতে তুলে দিতে হবে বলে দাবি উঠছে।
তবে এ আন্দোলনের আসল শক্তি শুধু দুর্নীতির অভিযোগ নয়, এর পিছনে রয়েছে হাজার হাজার সাধারণ পরিবারের কঠিন বাস্তব। লাইব্রেরিতে দিনের পর দিন বসে পড়াশোনা করা বহু পরীক্ষার্থীর মাসিক খরচ সাড়ে তিন হাজার টাকারও কম। কারও বাবা নেই, কারও মা নেই। কেউ সকালে জমিতে কৃষিকাজ করেন, বিকেলে আন্দোলনের মঞ্চে এসে বসেন, রাতে আবার বই খুলে পরবর্তী পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। কেউ সঙ্গে করে স্টিলের মগে চা আনেন, কেউ ছাতু, মুড়ি বা চিঁড়ে খেয়েই দিন কাটান। তাঁদের জীবনে বিলাসিতা নেই; আছে শুধু একটি সরকারি চাকরির আশায় নিরন্তর সংগ্রাম। জেপিএসসি-জেএসএসসি সংস্কার মঞ্চের মুখপাত্র জীবন কুমার জানান, আন্দোলন আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। খুব শীঘ্রই কোর কমিটির বৈঠকে ‘তিরঙ্গা মার্চ’-সহ পরবর্তী কর্মসূচি চূড়ান্ত হবে। অন্যদিকে, ৬ আগস্ট বিধানসভা অভিযান, ৭ আগস্ট বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের পৃথক কর্মসূচি এবং ১০ আগস্ট রাজনৈতিক দলের বাইরে থাকা সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের স্বাধীন মিছিল— এই তিন দফা আন্দোলনেরও প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। অনশনকারী সবিতা কুমারী জানান, দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়েও কোনো ফল না মেলায় বাধ্য হয়েই তাঁরা অনশনের পথ বেছে নিয়েছেন। আর এক আন্দোলনকারী হাবিবার বক্তব্য, ‘আমরা শুধু আশ্বাস চাই না, বাস্তব পদক্ষেপ চাই। ন্যায়বিচার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।’
অন্যদিকে, রাজ্য সরকারের তরফেও পরিস্থিতির দিকে নজর রাখার বার্তা দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন বলেন, চাকরিপ্রার্থীদের উদ্বেগ সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। সমস্ত অভিযোগ সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার সাধারণ সম্পাদক বিনোদ পাণ্ডেও জানিয়েছেন, আন্দোলনকারীদের দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনা করতে খুব শীঘ্রই একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হতে পারে। হাতে থাকা প্রমাণের ভিত্তিতে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
ইতিমধ্যেই পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে ঝাড়খণ্ড পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ মামলায় ১৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রাক্তন জেপিএসসি চেয়ারম্যান এল. খিয়াংতেকেও একাধিক দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। রাঁচি, পালামু, হাজারিবাগ, বোকারো ও ধানবাদ— এই পাঁচ জেলায় মোট ১৮টি জায়গায় তল্লাশি চালিয়েছে তদন্তকারী দল। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে ২৫ থেকে ২৭ জুলাই নির্ধারিত জেপিএসসি সম্মিলিত সিভিল সার্ভিসেস মেইনস পরীক্ষাও ‘অনিবার্য পরিস্থিতি’-র কারণ দেখিয়ে স্থগিত করেছে কমিশন। ফলে প্রশাসনিক স্তর থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহল— সর্বত্রই চাপ বাড়ছে।
❤ Support Us





