- এই মুহূর্তে দে । শ
- আগস্ট ৫, ২০২৬
আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতির চাপের মাঝেও ‘রেপো রেট’-এ হাত দিল না রিজার্ভ ব্যাঙ্ক
সুদের হারে আপাতত কোনো বদল নয়। আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং মূল্যবৃদ্ধির ঊর্ধ্বমুখী চাপের মধ্যেও রেপো রেট ৫.২৫ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখল ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (আরবিআই)। বুধবার, মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) বৈঠকের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে আরবিআই গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা জানান, আপাতত সুদের হারে পরিবর্তনের পরিবর্তে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। তবে একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পূর্বাভাস কিছুটা বাড়ানো হয়েছে, আবার মূল্যস্ফীতির বার্ষিক অনুমানও সামান্য কমানো হয়েছে।
৩ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি কমিটির ৬২তম বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়েছে, নীতিগত রেপো রেট ৫.২৫ শতাংশেই থাকবে। পাশাপাশি আগের মতোই ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান বজায় রাখার সিদ্ধান্তও বহাল রেখেছে কমিটি। অর্থাৎ, আগামী দিনে সুদের হার বাড়ানো বা কমানোর ক্ষেত্রে কোনো পূর্বনির্ধারিত অবস্থান না নিয়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথই খোলা রাখা হয়েছে। আরবিআই জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে দেশের প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধির হার ৬.৭ শতাংশ হতে পারে। জুন মাসের মুদ্রানীতিতে যেখানে ৬.৬ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, তার তুলনায় এটি সামান্য বেশি। একই সঙ্গে খুচরো মূল্যস্ফীতির বার্ষিক পূর্বাভাস ৫.১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। তবে এই আশাবাদের মাঝেও সতর্কবার্তা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। তাদের অনুমান, চলতি অর্থবর্ষের তৃতীয় ত্রৈমাসিকে, অর্থাৎ অক্টোবর-ডিসেম্বর পর্বে মূল্যস্ফীতি ৫.৯ শতাংশে পৌঁছতে পারে। তার পরে ধীরে ধীরে চাপ কমবে।
ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে আরবিআইয়ের অনুমান, প্রথম ত্রৈমাসিকে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার থাকবে ৭ শতাংশ। দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে তা কমে ৬.৪ শতাংশ হতে পারে। তৃতীয় ত্রৈমাসিকে ৬.৫ শতাংশ এবং চতুর্থ ত্রৈমাসিকে ৬.৮ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৭-২৮ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে বৃদ্ধির হার ৭.৩ শতাংশে পৌঁছতে পারে বলেও জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও ত্রৈমাসিক পূর্বাভাস দিয়েছে আরবিআই। তাদের হিসেবে, দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে সিপিআই মূল্যস্ফীতি ৪.৭ শতাংশ, তৃতীয় ত্রৈমাসিকে ৫.৯ শতাংশ এবং চতুর্থ ত্রৈমাসিকে ৫.৫ শতাংশ হতে পারে। পরবর্তী অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে তা ৫.৩ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। গোটা অর্থবর্ষে কোর ইনফ্লেশন ৪.৩ শতাংশের আশপাশে থাকবে বলেও অনুমান।
নীতিগত সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা বলেন, সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি মূলত খাদ্য ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফল। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে ওঠানামা এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিই মূল কারণ। গত জুনে খুচরো মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪.৪ শতাংশে পৌঁছেছিল। টানা ১৬ মাস ৪ শতাংশের নীচে থাকার পরে সেটিই ছিল প্রথমবার আরবিআইয়ের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছিল। তবে মুদ্রানীতি কমিটির মতে, প্রথম ত্রৈমাসিকের প্রকৃত মূল্যস্ফীতি তাদের পূর্বাভাসের তুলনায় ৩০ বেসিস পয়েন্ট কম ছিল। অর্থাৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি হলেও তার সম্পূর্ণ প্রভাব এখনো খুচরো বাজারে পড়েনি।
আরবিআইয়ের বিশ্লেষণ বলছে, মে ও জুন মাসে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি প্রায় সব ক্ষেত্রেই ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে জ্বালানির উপর। তার ফলেই রেস্তরাঁ-সহ বিভিন্ন পরিষেবা ক্ষেত্রেও ব্যয় বেড়েছে। যদিও খাদ্য ও জ্বালানিকে বাদ দিলে কোর ইনফ্লেশন মে এবং জুন— দু’মাসেই ৩.৯ শতাংশে স্থির ছিল। মূল্যবান ধাতুর দাম বাদ দিলে সেই হার আরও কম, মাত্র ২.৩ থেকে ২.৫ শতাংশ। আরবিআইয়ের মতে, এর অর্থ চাহিদাজনিত মূল্যচাপ এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রয়েছে। প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও আশাবাদী রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা, ব্যক্তিগত ভোগব্যয়, নির্মাণ ও মূলধনী পণ্য ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যাঙ্ক ঋণের প্রবাহ অর্থনীতিকে গতি দিচ্ছে। পরিষেবা রফতানির ধারাবাহিক সাফল্য এবং পণ্য রফতানির পুনরুদ্ধারও বৃদ্ধিকে সমর্থন করছে বলে জানিয়েছে আরবিআই।
তবে ঝুঁকির কথাও স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছে মুদ্রানীতি কমিটি। এল নিনো পরিস্থিতির প্রভাবে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বৃষ্টির ঘাটতি এবং অসম বণ্টন কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতির উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। যদিও ফসলের বৈচিত্র্য, জলবায়ু সহনশীল বীজ এবং জল সংরক্ষণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ সেই ঝুঁকি কিছুটা কমাতে পারে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। শহুরে অর্থনীতি অবশ্য পরিষেবা খাতের শক্তিশালী চাহিদা, জিএসটি-সংক্রান্ত সংস্কার এবং কর্মসংস্থানের স্থিতিশীলতার জেরে তুলনামূলকভাবে মজবুত থাকবে বলেই অনুমান।
মুদ্রানীতি কমিটির মতে, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখন অনিশ্চয়তায় ঘেরা। মৌসুমি বৃষ্টির গতিপ্রকৃতি, এল নিনোর প্রভাব, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, আন্তর্জাতিক তেলের বাজার এবং বিশ্ব বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন আগামী দিনে অর্থনীতির উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই মূল্যস্ফীতির প্রকৃত প্রবণতা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা না পাওয়া পর্যন্ত, সুদের হার নিয়ে কোনো নতুন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছে না আরবিআই। ভবিষ্যতের প্রতিটি পদক্ষেপই অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করেই নেওয়া হবে বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা।
‘রেপো রেট’ অপরিবর্তিত থাকায় আপাতত ঋণের ইএমআই-তে পরিবর্তন হবে না। গৃহঋণ, গাড়ির ঋণ কিংবা সোনার ঋণ— সব ক্ষেত্রেই বর্তমান কিস্তির অঙ্ক বহাল থাকবে। একই সঙ্গে স্থায়ী আমানত (এফডি) এবং সঞ্চয়ী আমানতের সুদের হারেও আপাতত পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই, যদি না পৃথক ভাবে কোনো ব্যাঙ্ক নিজস্ব সিদ্ধান্তে সুদের হার সংশোধন করে। অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতিনির্ধারকদের এ অবস্থান দেশে ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, অন্যদিকে সুদের হার অতিরিক্ত বাড়িয়ে বিনিয়োগ ও ভোগব্যয়কে নিরুৎসাহিত করা যাবে না। আবার সুদের হার কমিয়ে দিলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও বাড়তে পারে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ বলে মনে করছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক।
❤ Support Us





