- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- আগস্ট ৫, ২০২৬
আসন পুনর্বিন্যাস, মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশ করাতে মরিয়া বিজেপি, ১৭ আগস্ট থেকে বিশেষ অধিবেশন!
বর্ষাকালীন অধিবেশন বিরোধীদের বিক্ষোভের জেরে বারবার অচলাবস্থার মুখে পড়লেও, এরমধ্যেই সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার প্রস্তুতি শুরু করেছে কেন্দ্র সরকার। এ পর্বে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিতে পারে এমন দু-টি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাশ করানোর প্রস্তুতি শুরু করেছে কেন্দ্র। সূত্রের দাবি, ১৩ আগস্ট বর্ষাকালীন অধিবেশন শেষ হওয়ার পর ১৭ আগস্ট থেকেই তিন দিনের একটি বিশেষ অধিবেশন ডাকার পরিকল্পনা করছে বিজেপি। সে অধিবেশনেই ‘ডিলিমিটেশন’ বা লোকসভা কেন্দ্রগুলির সীমানা পুনর্বিন্যাস এবং মহিলা সংরক্ষণ সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করানোর চেষ্টা হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি ঘোষণা হয়নি।
সূত্রের খবর, এ বার বর্ষাকালীন অধিবেশন শেষ হলেও সংসদকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘প্রোরোগ’ বা মুলতবি নাও করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী খুব অল্প সময়ের নোটিসেই সংসদ পুনরায় আহ্বান করা সম্ভব হবে। সূত্রের খবর, প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত হলেই বিশেষ অধিবেশন ডেকে বিলগুলিকে ভোটাভুটির জন্য তোলা হবে। ফলে এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য সংখ্যার অঙ্ক মেলানো। এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত তিন দিনের বিশেষ অধিবেশনেও একই উদ্যোগ নিয়েছিল বিজেপি। তখন সংবিধানের ১৩১তম সংশোধনী বিলের আওতায় ‘ডিলিমিটেশন’ এবং মহিলা সংরক্ষণ সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলি একসঙ্গে আনা হয়েছিল। কিন্তু লোকসভা এবং রাজ্যসভা— কোনো কক্ষেই প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় বিলটি পাশ করানো সম্ভব হয়নি।
তবে গত কয়েক মাসে রাজনৈতিক সমীকরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে করছে কেন্দ্র। বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার জেরে সংসদের দু-কক্ষেই বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র অবস্থান আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে। সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে লোকসভায় ৩৬০ জন এবং রাজ্যসভায় ১৬৪ জন সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। সে লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সরকারের ব্যবধান এখন অনেকটাই কমেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট মহলের। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল ও তৃণমূলে ভাঙনের পর সংসদে বিজেপির অবস্থান আরও মজবুত হয়েছে বলেও মনে করছে কেন্দ্র। একই সঙ্গে, ইন্ডিয়া জোটের শরিক কংগ্রেসের সঙ্গে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনের রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়ার প্রেক্ষাপটে ডিএমকের ২২ জন লোকসভা সাংসদের সম্ভাব্য সমর্থনের দিকেও নজর রয়েছে বিজেপির।
‘ডিলিমিটেশন’ প্রশ্নে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির আপত্তি দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে তামিলনাড়ু-সহ একাধিক রাজ্যের অভিযোগ, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়া রাজ্যগুলির লোকসভায় প্রতিনিধিত্ব কমে যেতে পারে, অথচ জনসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে এমন রাজ্যগুলি তুলনামূলক বেশি আসন পেতে পারে। সে আশঙ্কাকেই সামনে রেখে দীর্ঘদিন ধরে ডিএমকে এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে আসছে। ফলে সংসদে বিলটির ভাগ্য নির্ধারণে স্ট্যালিনের দলের অবস্থান কি হবে, তা নিয়ে জল্পনা থাকছেই। প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধনী বিল অনুযায়ী, ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে লোকসভা কেন্দ্রগুলির সীমানা ও আসন বণ্টনের পুনর্বিন্যাস করা হবে। কেন্দ্রের যুক্তি, সংসদে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন কার্যকর করতে এই পুনর্বিন্যাস জরুরি। তবে বিরোধী দলগুলির একাংশের অভিযোগ, ‘ডিলিমিটেশন’ কার্যকর হলে জনসংখ্যার ভিত্তিতে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মধ্যে সাংসদ সংখ্যা নিয়ে ভারসাম্য বদলে যেতে পারে, যার রাজনৈতিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হবে।
তবে, সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, বিরোধীদের অন্যতম প্রধান আপত্তি দূর করতেই এবার বিলের খসড়ায় আসন বৃদ্ধির নীতি আরও স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হতে পারে। আলোচনায় রয়েছে, জনসংখ্যার তারতম্য থাকলেও সব রাজ্যে নির্দিষ্ট হারে লোকসভা আসন বৃদ্ধির বিষয়টি লিখিতভাবে উল্লেখ করা হতে পারে। এমনকি সব রাজ্যের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ হারে আসন বৃদ্ধির কাঠামো বিলে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনাও সরকারি মহলের আলোচনায় রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো সরকারি খসড়া প্রকাশ করা হয়নি বা বিজেপি আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো প্রস্তাবের কথা স্বীকারও করেনি।
এই আবহেই বুধবার সংসদের অচলাবস্থার মধ্যেও কেন্দ্রীয় সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রায় ৫০ মিনিটের ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরাও। কংগ্রেস সূত্রের দাবি, সম্ভাব্য ডিলিমিটেশন বিল নিয়ে বিরোধী শিবিরের অবস্থান জানতে চেয়েছিল কেন্দ্র। যদিও বৈঠকের পর কংগ্রেস স্পষ্ট করে দিয়েছে, বিতর্কিত এ বিলকে সমর্থনের কোনও ইঙ্গিত তারা দেয়নি। কংগ্রেসের সমর্থন না মিললেও অন্য বিরোধী দলগুলির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি কয়েক জন বিরোধী সাংসদের সম্ভাব্য ক্রস ভোটিং কিংবা ভোটদানে বিরত থাকার সম্ভাবনাকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংসদে বিলটি উত্থাপনের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত সংখ্যা নিশ্চিত করার লড়াই চলবে এবং প্রতিটি ভোটই এই বিলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে, এখন নজর সংখ্যার অঙ্কে। প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে পারলে ১৭ আগস্ট থেকেই সংসদের বিশেষ অধিবেশন বসতে পারে। আর সে অধিবেশনেই দেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচনী মানচিত্র এবং সংসদে মহিলা প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সাক্ষী হতে পারে ভারতীয় রাজনীতি।
❤ Support Us




