Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • মে ২২, ২০২২

বিদ্রোহী নজরুল : নজরুলের বিদ্রোহী

অচেতনকে  চেতন করার জন্য অর্ফিয়ুসের বাঁশির মতো বাঁশি বাজবে ৷ শ্যামের মোহনবাঁশির সুরে মানবজীবন মুগ্ধ ও আকর্ষিত হবে

তড়িৎ চৌধুরী
বিদ্রোহী নজরুল : নজরুলের বিদ্রোহী

ঢাকায় নজরুল

‘আমি শুধু রাজার অন্যায়ের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করি নাই. সমাজের, জাতির, দেশের বিরুদ্ধে আমার সত্য – তরবারির তীব্র আক্রমণ সমান বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে, …. আমি যে ভগবানের প্রিয়, সত্যের হাতের বীণা, আমি যে কবি, আমার আত্মা যে সত্যদ্রষ্টা ঋষির আত্মা ৷ ‘

( রাজবন্দীর জবানবন্দী ৷ কাজী নজরুল ইসলাম | )

‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রথমে অনুচ্চারিত তুমি, তুমি আবর্তিত হয় আমি রূপে, শেষে আমি হয় আমাদের প্রতিভূ ৷ ছোট ছোট আমি মিলে এক বৃহৎ আমি তৈরি হয় ৷ ব্যক্তি আমি বিশ্ব আমিতে পরিণত হয় ৷

‘ বল বীর ৷ ‘ ওগো সাহসী ছেলে, তুমি বল যে চিরদিন মাথা উঁচু করে বাঁচবে ৷ চেয়ে দ্যাখো, তোমার শির ক্রমশ উঁচু হয়ে উঠছে ৷ হিমালয় পর্বত অতিক্রম করে, মহাকাশ ভেদ করে. চন্দ্র সূর্য-সহ সৌরমণ্ডলের সব গ্রহ তারা অতিক্রম করে ; স্বর্গলোক, বিষ্ণুলোক এবং খোদার সিংহাসন ছুঁয়ে তুমি হয়ে উঠেছ বিশ্ববিধাতার বিস্ময় বালক ৷ তোমারই কপালে রয়েছে মহাদেবের ত্রিনয়ন , যা ক্রোধে রুদ্ররূপে জ্বলে ওঠে ৷ এই প্রজ্বলিত ত্রিনয়নই তোমার রাজতিলক, তোমার শ্রীমণ্ডিত জয়ের প্রদীপ্ত মশাল ৷ অতএব হে বীর, শুরু হোক তোমার সংগ্রাম | বীরবিক্রমে মাথা উঁচু করে এগিয়ে চলো —চরৈবেতি ৷

নবলব্ধ এই দুরন্ত, উদ্ধত ও হিংস্র শক্তিই মহাপ্রলয়ের স্রষ্টা; যা নিয়ে আসে ধ্বংসের বার্তা ৷ নটরাজ শিব যেমন মহাকালের বেশে বিশ্ব ধ্বংসের উদ্দেশে তাণ্ডব নৃত্য করেছিলেন;  বিশ্ববিধাতার বিদ্রোহী সুত সেই মদমত্ততা নিয়ে ঘূর্ণিঝড়ের মতো আছড়ে পড়ে। পৃথু কন্যা পৃথ্বীর অভিশাপে ধরিত্রী যেমন শস্যহীন হয়েছিল , আজ তুমিও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব ছারখার কর ৷ বাধা – বন্ধন – নিয়ম শৃঙ্খলা – আইন কানুন ভেঙে তুমি হয়ে ওঠো ভয়াল মাইন বা টর্পেডোর মতো অব্যর্থ অস্ত্র। হয়ে ওঠো ভীমের মতো শক্তিশালী৷ ঝড়ের আকাশে মেঘের ঘনঘটা ও উন্মাদনা দেখে মনে হয় ধূম্রবর্ণ জটাধারী স্বয়ং ধূর্জটি যেন নটরাজ হয়ে তাণ্ডব নৃত্য করছেন ৷ হে বিদ্রোহী, তোমার ঘূর্ণিঝড়ের দাপটে পথের সামনে যাই পড়ছে তা ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে ৷

‘ আমি নৃত্যগাগল ছন্দ / আমি আপনার তালে নেচে যাই , আমি মুক্ত জীবনানন্দ ৷ ‘
নটরাজের তাণ্ডব নৃত্যে নেই শুধু ধ্বংস ৷ আছে সুর, ছন্দ, তাল, লয় ৷ সব মিলিয়ে এই নৃত্যে পরিস্ফুট হয় মুক্ত জীবনের আনন্দ, মুক্ত জীবনানন্দ ৷
‘শিবতাণ্ডব স্তোত্রম ‘ -এর প্রথম আটটি স্তবকের সারসংক্ষেপ –
‘তাণ্ডব নৃত্যকালে শিবের জটাজালের অরণ্যমধ্যে পবিত্র গঙ্গাধারা বাহিত জলে নৃত্যাঙ্গন পবিত্র, কণ্ঠদেশে ভুজঙ্গ মালার মতো দোদুল্যমান, চারদিকে  ডমরুধ্বনির ডমড ডমড ডমড শব্দ | হে শিব, হে তাণ্ডব নর্তক মহাদেব, আমাদের মধ্যেও এই পবিত্র নৃত্য প্রবাহিত করো।
শিবের জটাকটাহ চারদিকে  ঘুরছে, দুলছে, ললাটে প্রজ্বলিত অগ্নি থেকে ধগদ ধগদ ধগদ ধ্বনি ছড়িয়ে যাচ্ছে ৷ এই তাণ্ডব নৃত্য আমার অস্তিত্বে সঞ্চারিত হোক ৷
ধরাধরেন্দ্র নন্দিনী, জগন্মাতা পার্বতী-ও শিবের সহচরী ৷ এই  তাণ্ডব নৃত্যে দিক দিগন্ত কম্পমান। এই নৃত্যের ঢেউ আমার হৃদয় স্পর্শ করে আনন্দ লহরী সৃষ্টি করুক।
আকাশ  যেন নববধূ, শিবের উত্তরীয় বাতাসে ভাসমান | আমার হৃদয় ওই দৈবী ক্রীড়ায় অনাস্বাদিত — উত্তেজনাময় ৷
শিবের  মস্তকে  অমৃত বিতরণকারী কিশোর চন্দ্র, কপালে প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা, তৃতীয় নয়ন থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে আলোর দ্যুতি ৷ আমরাও যেন বৃহৎ কপালী শিবের কাছ থেকে এই অমৃতবারি লাভ করি ৷
তাণ্ডব নৃত্যের পদসঞ্চালনে পৃথিবী (উমার) কোলে নানা চিত্র পরিস্ফুটমান | শিব-পার্বতীই সেই শিল্পী . যাঁরা স্রষ্টা। এই তাণ্ডবনৃত্যে আমার মন বিমোহিত।
নবমেঘের  গর্জনকে স্তব্ধ করেছে  তাঁর তাণ্ডবনৃত্যের ধ্বনি ৷ অমাবস্যা  রজনীর অন্ধকার তাঁর কণ্ঠে আবদ্ধ | হে গঙ্গাধর, হে হস্তীধারক,  হে চন্দ্রধর, হে বিশ্বধারক, অনুগ্রহ করে শ্রীকে প্রবাহিত কর, মাধুর্য ও কল্যাণ চতুর্দিকে পরিব্যাপ্ত হোক ৷ ‘
তাই তাণ্ডবনৃত্য শুধু  ধ্বংস নয়,
নিয়ে আসে সৃষ্টির বাণী। জীবনের জড়তা নাশ করে সঞ্চার করে মুক্তি – মুক্ত জীবনের আনন্দ |
রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরের রাগ ‘ছায়ানট’ ও ‘হাম্বীর ‘ এবং রাত্রি তৃতীয় প্রহরের রাগ ‘হিন্দোল ‘| এই রাগগুলি কেবল নিরাশা তথা অন্ধকারের রাগ নয় ৷ কারণ রাত যতই বিলম্বিত হোক, একসময় নিশাবসান হয় ৷ ভোরের আলো নিয়ে আসে নতুন দিন ও নতুন সৃষ্টির বার্তা ৷ আর তাই হিন্দোল রাগ একাধিকবার ব্যবহৃত হয়৷ ‘ আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল’ এবং ‘আমি চপলা  চপল হিন্দোল ‘| আর তাই বাধা বন্ধনহীন জীবনের আনন্দে বীর বিদ্রোহী ফিং দিয়া দেয় তিন দোল ৷
বৈপরীত্যই উন্মাদনার লক্ষণ ৷ উন্মাদনার কোনো ব্যাকরণ নেই। একমাত্র উন্মাদই মনে যা চায় তাই করতে পারে। ইচ্ছে হলে শত্রুকেও মিত্র জ্ঞানে ঘনিষ্ঠভাবে গলা জড়িয়ে ধরতে  পারে, আবার শত্রুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়াই করে মৃত্যুর শক্তিও পরীক্ষা করতে পারে । এই বিপরীত শক্তির বলেই কবির বিদ্রোহী মহামারীর মতো ভয়ঙ্কর ও সংহারক ৷ উন্নত শির এই  বিদ্রোহী পৃথিবী মন্থন করে হয়ে উঠবে শাসকের ত্রাস।
চিরদুরন্ত , দুর্মদ ও দুর্দম বিদ্রোহীর প্রাণের পেয়ালা মদ্য পরিপূর্ণ পাত্রের মতো প্রাণরসে টইটম্বুর ৷ তাঁর প্রাণশক্তি যজ্ঞের আগুনের মতো পবিত্র। তরুণ বিদ্রোহী সাগ্নিক ব্রাহ্মণের মতো বিদ্রোহের অগ্নি সর্বদা প্রজ্বলিত রাখায় আগ্রহী ৷  আবার এই বিদ্রোহী ঋষি জমদগ্নির মতো ন্যায়ের পূজারি ৷ পবিত্রতার প্রতিভূ কবির বিদ্রোহীও  যজ্ঞ, অগ্নি ও পুরোহিতের সঙ্গে  একসূত্রে গাঁথা ৷ সৃষ্টি ও ধ্বংস, লোকালয় ও শ্মশানের প্রসঙ্গে কবির ঘোষণা ‘আমি অবসান, নিশাবসান’৷ সবকিছুর ওপর জীবনই সত্য ৷ জীবন-মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে দেবরাজ ইন্দ্রের সতী সাধ্বী পত্নী শচীর পুত্র জয়ন্তের মধ্যে বিরাজমান চন্দ্রের সৌন্দর্য ও সূর্যের দীপ্তি (হাতে চাঁদ ভালে সূর্য )  নিয়ে আগুয়ান  অকুতোভয় বিদ্রোহীর একহাতে বাঁশি, অন্যহাতে রণশিঙা ৷ বাঁকা বাঁশির অধিকারী বাঁকা শ্যাম, যাঁর বাঁশির  সুরে মোহিনী মায়া  তথা আকর্ষণী শক্তি বিরাজমান ৷ আর রণশিঙায় আছে ধ্বংসের আগমনী | বাঁশির সুরে জীবন, আর শিঙাধ্বনি মৃতুর দূত । নীলকণ্ঠ মহাদেবের মতোই বিদ্রোহীও জীবনের হলাহল পান করে কৃষ্ণকণ্ঠ ৷ সকল ব্যথা, যন্ত্রণা সহ্য করেও মহাদেব যেমন তীব্রবেগী গঙ্গার স্রোত  শিরে ধারণ করেও, জনকল্যাণে একটি মাত্র ধারাকে গঙ্গানদী রূপে মুক্ত করে দেন; বিদ্রোহীর লক্ষ্যও সব জ্বালা যন্ত্রণা  সহ্য করে পৃথিবীকে মনুষ্য বাসোপযোগী করে তোলা ৷
বিদ্রোহীও সন্ন্যাসীর মতো  নির্লিপ্ত, সুরের পূজারি, রণসংগীত বা মার্চিং সঙে উদ্বেল। যুবরাজ হয়েও যাঁর রাজবেশ সন্ন্যাসীর মতো পবিত্র গৈরিক ৷ বিদ্রোহী যেন ‘সুখে দুঃখে বিগতস্পৃহ ‘ | বিদ্রোহীর আকাঙ্ক্ষিত জীবন বেদুইনের মতো উদ্দাম ও বাধা-বন্ধনহীন | মঙ্গোলীয় বীর চেঙ্গিস খানের মতো বিদ্রোহীও মাথা উঁচু করে বাঁচার আকাঙ্ক্ষী | চেঙ্গিস কান যেমন নিজেকে ভগবান রূপে প্রচার করতেন, তেমনই বিদ্রোহীর বক্তব্য ‘ আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে  কুর্ণিশ ‘ |
ইসলাম ধর্মমতে দেবদূত হজরত ইসরাফিল যেদিন শিঙায় ফুঁ দেবেন, সেদিনই শুরু হবে কেয়ামৎ বা মহাপ্রলয় ৷ একই সময়ে শিবের পিনাকেতে  বাজবে  টংকার, শোনা যাবে ডমরুধ্বনি, ধনুক  (পিনাক ) ও ত্রিশূল নিয়ে  শিব মহাপ্রলয়ের ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠবেন। শ্রীকৃষ্ণও সুদর্শন চক্র নিয়ে ধ্বংসযজ্ঞে যোগ দেবেন ৷ তাঁর শঙ্খ পাঞ্চজন্যের ধ্বনিতে মুখরিত হবে দিগ্বিদিক। শ্রুত হবে প্রণবধ্বনি ওঙ্কার, যার অর্থ ‘চিরনতুন ‘ -এর আবির্ভাব হোক ৷  ব্রহ্মজ্ঞানী ব্রহ্মর্ষি বিশ্বামিত্রের শিষ্য খ্যাপা দুর্বাসার ক্রোধাগ্নির মতো বিদ্রোহীর দাবানল দাহে ঘনিয়ে আসবে দহনকাল ৷ মহাপ্রলয়ের কালে দ্বাদশ সূর্যকে রাহু গ্রাস করবে, পৃথিবীতে নেমে আসবে চির অন্ধকার ৷ কভু অশান্ত , কভু প্রশান্ত এই তরতাজা তরুণের হাতেই বিধির দর্প চূর্ণ হবে। প্রবল বায়ুর উচ্ছ্বাস ও সমুদ্রের কল্লোল ধ্বনিতে বিদ্রোহী সত্তা হবে ‘ উজ্জ্বল ‘ ও ‘প্রোজ্জ্বল ‘ | তারপর ‘উচ্ছল জল-ছল -ছল’ বিদ্রোহীর মনে লাগে ঢেউয়ের দোলা, আসে প্রেমের আহ্বান ৷
কারণ ধ্বংসেই সব শেষ হয় না ৷ ধ্বংসের পর সৃষ্টি | ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’  কুমারীর আলুলায়িত কেশরাশির আহ্বান, তন্বী নয়নের কটাক্ষ, ষোড়শী কন্যার হৃদকমলের সুবাসে অবগাহন করে বিদ্রোহী ধন্য | কিন্তু প্রেমে তো শুধু মিলনই নেই। আছে বিরহ, হাহাকার ও শূন্যতা ৷ প্রেম বঞ্চিতা উদাসিনীর হাহাকার, স্বামীহারা বিধবার বুকের দীর্ঘশ্বাস, কিংবা ব্যর্থ প্রেমিকার জ্বালা ও যন্ত্রণাও উপেক্ষণীয় নয়৷ ঘর  হারিয়ে ব্যথা সম্বল করে যারা পথে নেমেছে, সেই অবমানিত পথিকের মৰ্মবেদনা এবং বিষ জ্বালায় জর্জরিত হয়েও প্রিয়ার কাছেই ফিরে আসতে হয় ৷ হৃদয়ে ব্যথা ও কাতর  অভিমান  সত্ত্বেও কুমারীর কম্পমান প্রথম অধর পরশ, প্রিয়ার সলাজ চকিত চাহনি, চুড়ির কাঁকনধ্বনি, যৌবন-ভিতু পল্লীবালিকার আঁচলের স্নিগ্ধ হাওয়া প্রেমিকের মনে নিয়ে আসে  উত্তরের শীতল বায়ুর  মধুর স্পর্শ, মলয়ানিলের পরশ, পূরবীর সন্ধ্যারাগের উদাসীনতা, বাঁশি ও বীণার কবোষ্ণ ঐকতান,  মরুভূমির ঝরনার ঝর ধ্বনি বা বৃক্ষের শ্যামল ছায়ার স্নিগ্ধতা। প্রেমের পরশপাথরের ছোঁয়ায় বিদ্রোহীও  আত্মহারা, আনন্দে উদ্বেল , নিজেকে মনে হয় পাগলপারা এবং সহসাই নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ হয় — ‘আমি সহসা আমারে চিনেছি , আমার খুলিয়া গিয়াছে / সব বাঁধ!’
আত্মস্বরূপ উপলব্ধির ফলেই ‘অচেতন চিতে চেতন’ -এর পাশাপাশি ‘মানব বিজয় কেতন’ -এর মাধ্যমে ‘মানব আমি ‘ র জয় ঘোষিত হয়৷ স্বর্গ  মর্ত্যকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসার জন্য , আগ্নেয়গিরি  বা সমুদ্রগর্ভের প্রলয়াগ্নির মতো দৃপ্ত তেজে বিজয় পতাকা লাঞ্ছিত বিদ্রোহী বীরের রথ এগিয়ে চলে ৷ হিন্দু ও মুসলমান জাতির সমন্বয়ের প্রতীক স্বর্গের পক্ষীরাজ ঘোড়া – তাজী বোররাক এবং দেবরাজ ইন্দ্রের ঘোড়া উচ্চৈঃশ্রবা বিদ্রোহীর রথের যুগল বাহন ৷ আকাশের বিদ্যুৎ চমকের মতো, ভূমিকম্পের মতো প্রচণ্ড শক্তিমান খেয়ালি বিদ্রোহী কখনও নাগরাজ বাসুকির ফণা জাপটে ধরে, কখনও ফেরেস্তা জিব্রাইলের আগুনের ডানা জড়িয়ে ধরে, আবার কখনও শিশুর মতো বিশ্ব মায়ের আঁচল দাঁত দিয়ে কুটিকুটি করে।
অচেতনকে  চেতন করার জন্য অর্ফিয়ুসের বাঁশির মতো বাঁশি বাজবে ৷ শ্যামের মোহনবাঁশির সুরে মানবজীবন মুগ্ধ ও আকর্ষিত হবে ৷ বশীকরণের পাশাপাশি বিদ্রোহীর অন্তরে যখন ক্রোধাগ্নি জ্বলে উঠবে, তখন সপ্তম নরকের ভয়ানক আগুনও ম্লান হয়ে নিভে যাবে।
শ্রাবণের বন্যা যেমন বিপুল অঞ্চল ধ্বংস করেও ধরণীকে উর্বরা  করে , তেমনই ঐশ্বর্যলক্ষ্মী ও বাগদেবীকে স্বর্গ থেকে ছিনিয়ে আনার ফলে মানবজীবন হবে সমৃদ্ধ ও ঋদ্ধ ৷ বিদ্রোহীর  শক্তির সঙ্গে তুলনীয় হল উল্কার তীব্রতা, শনির ক্রোধ, ধূমকেতুর জ্বালা, ‘বিষধর কাল – ফণি’র  মৃত্যুবাণ৷ অসুর নাশিনী দুর্গা বা চণ্ডীর ছিন্নমস্তা রূপের মতো বিদ্রোহীও ভয়ঙ্কর ৷ তা সত্ত্বেও বিদ্রোহী ‘জাহান্নামের আগুনে ‘ বসে ‘ পুষ্পের হাসি’ হাসতে সক্ষম৷
পঞ্চভৌতিক উপাদানে তৈরি মাটির মানুষ হলেও বিদ্রোহীর মৃত্যু নেই। বিদ্রোহী ‘অজর অমর অক্ষয় ‘ | বিদ্রোহী -ই ঈশ্বর | জীবনের অন্তিম সত্য ৷ ‘ আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে / সব বাঁধ ‘ | দশাবতারের অন্যতম অবতার পরশুরামের মতোই বিদ্রোহীর কুঠারের আঘাতে বিনষ্ট হবে রাজতন্ত্র ও রাজতন্ত্রের ধারক ৷
কৃষ্ণ অগ্রজ বলরামের লাঙলের সাহায্যে নতুন ফসলের জন্য পৃথিবী কর্ষিত হবে, উৎপাটিত হবে জীর্ণ  ও পুরাতন আগাছা।
‘জাগো জনশক্তি ! হে আমার অবহেলিত পদপিষ্ট কৃষক, আমার মুটে – মজুর ভাইরা! তোমার হাতের এ লাঙল আজ বলরাম স্কন্ধে জলের মতো ক্ষিপ্ত তেজে গগনের মাঝে উৎক্ষিপ্ত হয়ে উঠুক , এই  অত্যাচারীর বিশ্ব উপড়ে ফেলুক –  উল্টে ফেলুক | আন তোমার হাতুড়ি, ভাঙ্গ ঐ উৎপীড়কের প্রাসাদ – ধূলায় লুটাও অর্থপিশাচ  বল – দর্পীর শির’৷ ( রুদ্রমঙ্গল ৷ কাজী নজরুল ইসলাম) |
‘মহা     বিদ্রোহী রণ – ক্লান্ত
আমি    সেই দিন হব শান্ত
যবে   উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল ,
আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না.
অত্যাচারীর   খড়্গ কৃপাণ ভীম
রণ – ভূমে রণিবে না – ‘ |

♦–♦♦–♦♦–♦


❤ Support Us
error: Content is protected !!