- দে । শ
- জুন ২৩, ২০২৬
পুলিশি ‘এনকাউন্টার’-এ ভরত তিওয়ারির মৃত্যু । অভিযানের বৈধতা নিয়ে তুঙ্গে বিতর্ক, তদন্তে আদালত ?
বিহারের ভোজপুর জেলায় পুলিশের তথাকথিত ‘এনকাউন্টার’-এ ২৮ বছর বয়সী সমাজকর্মী ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর ভরত ভূষণ তিওয়ারির মৃত্যু ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বন্যা, নদীভাঙন, উচ্ছেদ এবং স্থানীয় প্রশাসনিক নানা সমস্যার বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব এই যুবকের মৃত্যুকে ঘিরে উঠছে একাধিক প্রশ্ন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিষয়টি এখন আদালতের নজরেও এসেছে এবং শুরু হয়েছে বিচার বিভাগীয় তদন্ত।
ভরত তিওয়ারি ভোজপুর জেলার শাহপুর এলাকার বিলৌটি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার জনস্বার্থমূলক নানা সমস্যা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত বক্তব্য রাখতেন। বিশেষ করে ফেসবুককে তিনি স্থানীয় মানুষের সমস্যার কথা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন। এর ফলে এলাকায় তাঁর যথেষ্ট পরিচিতি ও প্রভাব তৈরি হয়েছিল। বিভিন্ন সময় শাসকদল বিজেপি ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনাও করতে দেখা গিয়েছিল তাঁকে।
পুলিশ সূত্রে দাবি, ঘটনার আগে ভরত তিওয়ারি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে একাধিক আক্রমণাত্মক পোস্ট করেছিলেন। এমনকি কিছু সরকারি আধিকারিককে উদ্দেশ্য করে হুমকিমূলক মন্তব্য করার অভিযোগও ওঠে। পুলিশের দাবি, এই কারণেই তাঁর উপর নজরদারি শুরু করা হয়েছিল।
সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৫ জুনের পর ভরতের কয়েকটি পোস্ট প্রশাসনের নজরে আসে। একটি পোস্টে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে লিখেছিলেন যে, বিহার সরকার তাঁকে এনকাউন্টারে হত্যা করতে পারে। এর পরদিন পুলিশ তাঁকে ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’ বলে দাবি করে । এরপর ১৭ জুন তাঁকে গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে অভিযান চালানো হয়।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, শাহপুর এলাকার একটি চাষের জমিতে অভিযানের সময় ভরতের কাছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ছিল এবং তিনি পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে তিনি গুরুতর জখম হন। পরে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
তবে ঘটনার অন্য একটি দিক সামনে এনেছে ভরত তিওয়ারির পরিবার ও সমর্থকরা। এনকাউন্টারের কিছুক্ষণ আগে করা একটি ফেসবুক লাইভ ভিডিওতে দেখা যায়, ভরত একটি ফাঁকা মাঠে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখছেন এবং একসময় নিজের পিস্তলটি পুলিশের দিকে ছুড়ে দিচ্ছেন। ভিডিওকে সামনে রেখে পরিবারের দাবি, তিনি আত্মসমর্পণ করেছিলেন এবং অস্ত্রও ফেলে দিয়েছিলেন । তবু তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়।
পরিবারের অভিযোগ, এটি কোনও বৈধ পুলিশি অভিযান নয়, বরং একটি ‘ফেক এনকাউন্টার’। স্থানীয়দের একাংশও প্রশ্ন তুলেছেন— যদি ভরত সত্যিই আত্মসমর্পণ করে থাকেন এবং নিরস্ত্র অবস্থায় ছিলেন, তাহলে তাঁকে কেন গুলি করা হলো ? সরকারের সমালোচনা করার কারণেই কি তাঁকে প্রাণ হারাতে হয়েছে ?
বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয় চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ সামনে আসার পর । চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত এক চিকিৎসকের দাবি অনুযায়ী, ভরত তিওয়ারির শরীরে চার থেকে পাঁচটি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে । এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর পুলিশের বলপ্রয়োগের মাত্রা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে ।
ঘটনার পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়া, মানবাধিকার কর্মী, স্থানীয় সংগঠন এবং রাজনৈতিক মহলে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে । প্রশ্ন উঠতে থাকে — এটি কি সত্যিই আইনসম্মত পুলিশি অভিযান, নাকি ক্ষমতার অপব্যবহার ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনা ?
ক্রমবর্ধমান বিতর্কের মুখে বিহার সরকার বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে । অবসরপ্রাপ্ত এক বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্ত হতে পারে বলে জানা গিয়েছে । পাশাপাশি কয়েকজন পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে । তদন্তের দায়িত্বও উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে । কিছু রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, বিহার পুলিশও প্রাথমিকভাবে তদন্তে ‘গুরুতর ত্রুটি’ থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে ।
এদিকে, ঘটনার স্বাধীন তদন্ত এবং সিবিআই তদন্তের দাবিতে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছে । বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের দোরগোড়ায় পৌঁছালেও শীর্ষ আদালত অবিলম্বে শুনানির আবেদন গ্রহণ করেনি । তবে নিয়মিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছে । একইসঙ্গে পাটনা হাইকোর্টেও এ বিষয়ে আবেদন করা হয়েছে ।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— ভরত ভূষণ তিওয়ারির মৃত্যু কি সত্যিই নিয়মমাফিক পুলিশি এনকাউন্টারের ফল, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে অন্য কোনও সত্য ? সেই উত্তর মিলবে তদন্তকারী সংস্থার রিপোর্ট, বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধান এবং আদালতের পর্যবেক্ষণের পরই ।
❤ Support Us





